কবিতাসাহিত্য

অকৃতজ্ঞ

বিচিত্র কুমার


তোমার হাতে ধরেছিলাম শিশিরের মতো,
যখন তুমি ছিলে শুকনো পাতার ধূলায় ঢাকা।
আমি ছিলাম অমলিন বাতাস,
তোমার দুঃখের ছাই উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম দিগন্তে।
তুমি বলেছিলে, “তোমার ঋণ শোধ করব একদিন,”
কিন্তু কথাগুলো ছিল মরুভূমির প্রতিশ্রুতির মতো—
যেখানে ফসলের বীজও মরে যায়।

তোমার পথে ছায়া দিয়েছি,
ঝড় এলে বুক পেতে দাঁড়িয়েছি বৃক্ষের মতো।
তোমার চোখে খুঁজেছিলাম কৃতজ্ঞতার আলো,
কিন্তু সেখানেও যেন ছিল কেবল মরুভূমির সূর্য।

তোমার ঘরে আলো জ্বালাতে নিজের প্রদীপ নিভিয়েছিলাম,
তুমি বলেছিলে, “তোমার এই দানে পৃথিবী জাগবে।”
কিন্তু এখন তোমার জানালা দিয়ে উঁকি দিলে
দেখি, তুমি আলো দিচ্ছ অন্যকে, আমাকে ভুলে।

তোমার ক্ষুধার্ত পেটে ভাত তুলে দিয়েছিলাম,
আমার শস্যক্ষেতের শেষ দানাটি বিলিয়ে।
তুমি বলেছিলে, “তুমি আমার জীবনদাতা,”
কিন্তু আজ তুমি আমাকে অপমান করো
পথের ভিখারির মতো।

তোমার দুঃখের চোখে নদীর মতো ভালোবাসা দিয়েছিলাম,
তুমি সেই নদী শুকিয়ে ফেলে গেলে
নির্মম চাষির মতো।

তোমার জন্য একসময় দাঁড়িয়েছিলাম পাহাড় হয়ে,
তোমার বিপদ ঠেকাতে।
আজ তুমি সেই পাহাড়ের পাথর ভেঙে
তোমার প্রাসাদ বানিয়েছ,
কিন্তু পাহাড়ের বুকে যে রক্ত ঝরেছে,
সেটা তুমি দেখ না।

তুমি যখন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নাও,
ভুলে যাও সেই গাছের মাটি খুঁড়েছিলে তুমি।
তুমি যখন পাখির গানে মুগ্ধ হও,
ভুলে যাও পাখিটিকে তুমি খাঁচায় বন্দি করেছিলে।
তুমি যখন জীবন সাজাও,
ভুলে যাও সেই হাতগুলো,
যে হাত তোমার শূন্যতাকে পূর্ণ করেছিল।

অকৃতজ্ঞতা জীবনের করুণতম অধ্যায়।
এ এমন এক কাহিনী,
যেখানে নায়কের মুখোশের আড়ালে
লুকিয়ে থাকে বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াল চেহারা।
তাই বলি, কৃতজ্ঞতা শেখো।
তোমার হাত ধরেছিল যে, তার দিকে ফিরেও তাকাও।
তোমার জন্য জ্বলে যে প্রদীপ, তার তেল শেষ হতে দিও না।
তোমার জন্য যারা নিঃস্ব হয়,
তাদের বুকে কাঁটা বিঁধিয়ে দিও না।

এই পৃথিবী একদিন দেবে তোমাকে জবাব,
তোমার প্রতিটি অকৃতজ্ঞতার কাহিনী তুলে ধরবে।
তখন বুঝবে, জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধন কৃতজ্ঞতার।
তোমার হাত ধরেছিল যারা,
তাদের হাতেই রেখে যাও তোমার শেষ প্রণাম।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension