
ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি ধন্বন্তরি নয়
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা এক বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধের কারণে ছিন্নভিন্ন একটি অঞ্চলের জন্য সুখবর। আশা করি, এটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত লেবানন ও ইসরায়েলি সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা শান্তি আসবে।
২৭ নভেম্বর বুধবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টায় এই চুক্তি কার্যকর হয়। তবে আগের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা উভয় পক্ষের সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এটি যুদ্ধের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধরনের অংশ, যেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। আমার গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধকালীন সহিংসতা হ্রাস করার জন্য যুদ্ধবিরতি সবচেয়ে কম নিকৃষ্ট বিকল্প হতে পারে। তবে এটি অবশ্যই ধন্বন্তরি কিছু নয়।
বিশেষ করে কম অস্পষ্ট ঘটনাগুলোর পরিণতি আরও ভালোভাবে বুঝতে আমি যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি ও শক্তির গতিবিদ্যা অধ্যয়ন করি। বর্তমান ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি সম্পর্কে আমার চারটি প্রশ্ন ও উদ্বেগ এখানে তুলে ধরছি।
এক. ৬০ দিন পরে কী ঘটতে পারে?
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ১৩টি পয়েন্ট রয়েছে। এর লক্ষ্য ৬০ দিনের জন্য ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে শত্রুতা বন্ধ করা। তাত্ত্বিকভাবে এটি দক্ষিণ লেবানন থেকে ভিটেহারা এক মিলিয়নের বেশি লোক এবং উত্তর ইসরায়েল থেকে ৬০ হাজারের বেশি লোককে তাদের ঘরে ফেরার সুযোগ দেবে।
উত্তরের ইসরায়েলবাসীর নিজ ঘরে ফিরে আসা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধের সুস্পষ্ট লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি। সেখানকার হাজার হাজার ইসরায়েলিকে এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে বিভিন্ন হোটেলে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারকে বিপুল অর্থের জোগান দিতে হয়। তাই এই চুক্তির পেছনে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রণোদনাও কাজ করেছে। তবে তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়সীমা ও যুদ্ধবিরতির দুর্বলতার কারণে উভয় পক্ষের বেসামরিক নাগরিকরা ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেয় কিনা, তা দেখার বিষয়।
এ ছাড়া দক্ষিণ লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ ব্যাপক, যা যুদ্ধবিরতির অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ের মধ্যে ভিটেহারাদের ফিরে আসা কঠিন করে তুলেছে। জো বাইডেন ও ইমানুয়েল মাঁখো বলেছেন, যুদ্ধবিরতি ‘স্থায়ী শান্তি’ পরিস্থিতির জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো ৬০ দিনের মেয়াদ শেষে কী ঘটবে, তা স্পষ্ট তুলে ধরেনি।
দুই. সংঘর্ষ সিরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে
বেশ কয়েকটি শর্তে যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর পুনরায় অস্ত্র হাতে নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ লেবাননের সব অননুমোদিত অবকাঠামো ও অস্ত্র উৎপাদন সুবিধা গুঁড়িয়ে দেওয়া।
হিজবুল্লাহর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরান সিরিয়ার মাধ্যমে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সরবরাহ করে। যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি বরং সিরিয়ার অভ্যন্তরে ইসরায়েলি বিমান হামলার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর লক্ষ্য ইরানি অস্ত্র সিরিয়া হয়ে হিজবুল্লাহর কাছে পৌঁছানো আটকে দেওয়া।
এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল যুক্তি দিতে পারে, ইরান থেকে হিজবুল্লাহকে পুনরায় অস্ত্র দেওয়ার অনুমতি না দিয়ে সে বরং যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো সিরিয়াসংলগ্ন লেবাননের উত্তর সীমান্তের এলাকাগুলো আক্রমণের নিশানা বানিয়েছে। সম্ভবত তারা এই পদক্ষেপকে ইরানের প্রভাব রুখে দেওয়ার উপায় হিসেবে দেখছে।
তিন. সেনা প্রত্যাহার নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ
সেনা প্রত্যাহার নিয়ে বিস্তারিত বিবরণের অভাব বহু ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন ১৭০১-এর ভিত্তিতে রচিত, যা হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে ২০০৬ সালের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল। এটি পরিহাসপূর্ণ যে, যুদ্ধবিরতির শর্ত এই রেজুলেশনের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়। অথচ ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি প্রস্তাব ভয়াবহভাবে উপেক্ষা করেছে। আর যুক্তিযুক্তভাবে রেজুলেশন ১৭০১
ইসরায়েল বা হিজবুল্লাহ কখনও সম্পূর্ণরূপে মেনে চলেনি।
এ সময়ের মধ্যে লেবাননের সেনা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী লিতানি নদীর দক্ষিণ অঞ্চলে ‘অস্ত্র বহন বা সৈন্য মোতায়েন করতে অনুমোদিত একমাত্র সংস্থা’ হয়ে উঠবে। আলজাজিরার প্রতিবেদন মতে, ইসরায়েল চায় কোনো ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার করার আগে হিজবুল্লাহ যেন ছত্রভঙ্গ হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবানন ছেড়ে যায়।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরতির আরেকটি শর্তমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সীমান্তের একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমারেখা অর্জনের জন্য ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা সমর্থন করবে। সীমান্তবিষয়ক আলোচনার সুস্পষ্ট উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতির ফলে এটি পরিবর্তন হতে পারে। এর অর্থ হতে পারে, ইসরায়েল ফলস্বরূপ নতুন অঞ্চল ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে।
চার. গাজা নিয়ে কী ঘটেছে?
নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলকে গাজায় হামাস যোদ্ধাদের ওপর এবং তার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ইরানের ব্যাপারে মনোযোগী হতে সক্ষম করে তুলবে। অন্য কর্মকর্তারা যুদ্ধবিরতিকে ‘খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছে’ বলে চিহ্নিত করেছেন, যা গাজা ও লেবাননের সংঘাতে হামাসের কোনো যুক্ততা নেই বলে তুলে ধরবে। হিজবুল্লাহ এর আগে জোর দিয়ে বলেছিল, গাজা যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না।
নতুন চুক্তিতে এই শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।
কেউ কেউ মনে করেন, হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হামাসের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। এরই মধ্য দিয়ে হামাসের কাছে জিম্মি থাকা অবশিষ্ট ইসরায়েলিকে মুক্তি দেওয়া হবে। তবে এটি এই সত্য উপেক্ষা করে যে, হামাস অতীতে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে ইচ্ছুক ছিল, যখন ইসরায়েলি সরকার শেষ মুহূর্তে নতুন শর্ত যুক্ত করে সে আলোচনা থামিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া কাতার উভয় পক্ষের ‘সম্পৃক্ততায় অনিচ্ছা’ ও ‘সততার অভাব’ এতটা হতাশ হয়েছিল, দেশটি সম্প্রতি তাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি গাজাযুদ্ধ বা সেখানকার পাশবিক ও ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। গাজাযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সেটাই দেখার বিষয়। ইসরায়েল কি আরও সংগঠিত হয়ে ছিটমহলের কিছু অংশ দখল করতে এগোবে, যা কেউ কেউ মনে করেছেন? নাকি হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হামাসকে এতটুকু বিচ্ছিন্ন করবে, যতটা তারা মনে করে, এখন তাদের এবং ফিলিস্তিনদের যা আছে তার চেয়ে কম হবে?
লেখক: মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো, এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তরিত



