খেলাপ্রধান খবর

উত্তপ্ত ম্যাচ জিতে আর্জেন্টিনা ফাইনালে

এভাবেই তো রূপকথার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখেন তিনি। প্রতিবার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দলকে যখন খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলেন, তখন যেন একটা জেনারেটরের মতো গর্জন করে বুক থেকে বের করে দেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্ত কান্না আর নীরব যন্ত্রণা। গতকালও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না। ৫৫ মিনিটের সেই গর্ডন-বজ্রপাতে যখন মনে হচ্ছিল আটলান্টার বুকে নীল-সাদার কফিনটা নেমেই গেছে, মেসির বুকের ওপর তখন চেপে বসেছিল এক হিমালয়সম পাথরের চাপ, এক অলীক স্নায়ুযুদ্ধ।

কিন্তু জাদুকর তো জানেন কীভাবে নিয়তির শৃঙ্খল ভাঙতে হয়! বুকের ওপর জমে থাকা সেই পাথরের কিছুটা তিনি সরালেন মাঝমাঠের সেনানী এনজো ফার্নান্দেজকে দিয়ে, আর বাকিটা সরিয়ে দিলেন ম্যাচের অন্তিমলগ্নে লাউতারো মার্তিনেসকে দিয়ে ওই মহাজাগতিক গোলটি করিয়ে। দুটি গোলেই জাদুকরি সেই ছোঁয়া, নেপথ্যের কারিগর সেই একজন– লিওনেল মেসি! অবশেষে থ্রি-লায়ন্সের রাজকীয় দর্প চূর্ণ করে, ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল তাঁর আলবিসেলেস্তেরা। আগামী ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিরুদ্ধে সেই মহাসংগ্রাম। আর মাত্র একটা ম্যাচ, স্প্যানিশ আর্মাডাকে রুখে দিতে পারলেই বুয়েনস আইরেসের রাজপুত্রের হাতে উঠবে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি। ফুটবল-বিধাতা কি তবে মেটলাইফের বুকেই তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্য এক মহাজাগতিক রাজ্যাভিষেকের মঞ্চ প্রস্তুত করে রেখেছেন?

জানা নেই, তবে এদিন ম্যাচের পর হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে ভেতরের সব চাপ যেন বের করে দিতে চাইছিলেন তিনি। কারা যেন বলেছিলেন, মেসি ইংল্যান্ডের সঙ্গে কখনও খেলেননি, তিনি ভালো খেলতে পারবেন না। তাদের সেই মুখকে চিরতরে বন্ধ করে দিতে পেরেছেন তিনি। এদিন ম্যাচের শুরু থেকে ঠোকাঠুকি লেগেই ছিল। মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে জুড বেলিংহ্যামকে প্রথম ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জটা ছুড়ে দিলেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। ম্যাচের বয়স যখন মাত্র ১০ মিনিট, তখনই মরগান রজার্স আর নিকোলাস ট্যাগলেফিগোদের আদিম আক্রোশের খেলায় রেফারিকে ততক্ষণে বাঁশিতে ফুঁ দিতে হয়েছে সাত-সাতবার!

১৮ মিনিটে মাঝমাঠে জুড বেলিংহ্যামের পা থেকে বল কেড়ে নিলেন স্বয়ং লিওনেল মেসি, কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই বেলিংহ্যাম তাঁর লম্বা পায়ে ফেরত নিলেন সেই বল। ২০ মিনিটে ইংলিশ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন বাঁ-প্রান্ত থেকে ডিফেন্স চেরা একটা পাস বাড়িয়েছিলেন মরগান রজার্সকে। রজার্স চমৎকারভাবে বল ঠেলে দেন রাইট-ব্যাক রিস জেমসের উদ্দেশে, কিন্তু জেমসের পা বলের তলায় চলে যাওয়ায় ক্রসটি আলোর মুখ দেখেনি। ২৪ মিনিটে যখন প্রথম হাইড্রেশন ব্রেক ডাকল, তখন গোলমুখে কোনো শট নেই, কিন্তু ফাউলের সংখ্যা ১১! ৩০ মিনিট পার হতেই ফাউলের খতিয়ান গিয়ে দাঁড়াল ১৬-তে; ইংল্যান্ডের ৭ আর আর্জেন্টিনার ৯। দুই দলের ডিফেন্স যেন চীনের প্রাচীরের চেয়েও নিরেট, কেউ ইঞ্চি ছাড়বে না।

অবশেষে ৩২ মিনিটে ডেডলক ভাঙার প্রথম চেষ্টা হলো; বক্সের ঠিক বাইরে বেলিংহ্যামকে এনজো ফার্নান্দেজ ট্রিপ করলে ফ্রি-কিক পায় ইংল্যান্ড। সেখান থেকে উড়ে আসা বলে হেড করলেন ডিফেন্ডার জন স্টোনস। দীর্ঘ ৩২ মিনিট অপেক্ষার পর এটাই ছিল ম্যাচের প্রথম কোনো গোলমুখী আক্রমণ! এরপর শুরু হলো কার্ডের ছড়াছড়ি; ৩৭ মিনিটে মেসিকে ম্যান-মার্কিং করতে গিয়ে অতি-আগ্রাসী চ্যালেঞ্জের দায়ে হলুদ কার্ড দেখলেন ইংলিশ মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন এবং ৪১ মিনিটে একইভাবে কড়া ট্যাকল করে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেসও বুক্ড হলেন। প্রথমার্ধের ওই কয়েকটা মিনিটই যা একটু ফুটবল হলো, বাকিটা তো কেবল রেফারি আর বুটের ঠোকাঠুকির এক পৈশাচিক কোলাজ! আসলে কোনোভাবেই গোল খাওয়া যাবে না– এই কৌশল থেকেই দুই দল এতটা রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে।

তবে দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা– দুই পক্ষ থেকেই গতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর সেখানেই স্কালোনির কিছু পরিবর্তন কাজে লাগে ভীষণভাবে। লিসান্দ্রো, মোলিনা আর সিমিওনির বদলে ওটামেন্ডি, ডি পল আর গঞ্জালো মন্তিয়েলকে নামান তিনি। তবে ম্যাচের ৮০ মিনিটে ট্যাগলিফিগোর বদলে লাউতারোকে নামিয়েই বক্সের মধ্যে গতি ফেরে আর্জেন্টিনার। সেই সঙ্গে জয়ের সম্ভবনাও বাড়ে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension