নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

নিউইয়র্কে ICE-এর বড় অভিযান: ৩০ দিনে গ্রেপ্তার ২,১৯৭

‘অপারেশন রটেন অ্যাপল’-এ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত অভিবাসীদের টার্গেট করার দাবি; মামদানি-হোকুলের অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা ফেডারেল সরকারের
 
শাহ্ জে. চৌধুরী :
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যজুড়ে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর ব্যাপক অভিযানে মাত্র ৩০ দিনে ২,১৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফেডারেল সরকার। ‘Operation Rotten Apple’ নামে পরিচালিত এই অভিযান চলে ২৭ জুলাই থেকে ২৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন মঙ্গলবার অভিযানের ফলাফল প্রকাশ করে জানান, গ্রেপ্তারদের মধ্যে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ফেডারেল কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযানের লক্ষ্য ছিল নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় থাকা অপরাধমূলক রেকর্ডসম্পন্ন এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে হেফাজতে নেওয়া।
গ্রেপ্তার ২,১৯৭ জন
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসব্যাপী অভিযানে মোট ২,১৯৭ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অভিযানে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক-সংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ফেডারেল কর্মকর্তারা কয়েকজন গ্রেপ্তার ব্যক্তির নির্দিষ্ট অপরাধের রেকর্ডও প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে ইউক্রেনের এক নাগরিকের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় এক নাগরিককে জার্মানিতে ধর্ষণের অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়েছে। কলম্বিয়ার এক নাগরিকের বিরুদ্ধেও শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত অভিযোগের ইতিহাস থাকার কথা কর্মকর্তারা বলেছেন।
তবে এসব অভিযোগ ও অপরাধের তথ্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবরণের ভিত্তিতে; প্রত্যেক ব্যক্তির বর্তমান আইনি অবস্থার বিষয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই এই প্রতিবেদনের আওতায় করা হয়নি।
‘অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান’—ফেডারেল সরকারের দাবি
সেক্রেটারি মুলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে অভিযানটির মূল লক্ষ্য ছিল এমন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের রেকর্ড রয়েছে এবং যারা অভিবাসন আইনের আওতায় ফেডারেল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের মুখোমুখি।
মুলিন নিউইয়র্কের তথাকথিত sanctuary policies-এরও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের কিছু নীতির কারণে ICE অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় হেফাজত থেকে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের সরাসরি নিতে পারছে না।
ফেডারেল কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানীয় নীতির কারণে ICE-এর আটকাদেশ থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছেন। তবে এই দাবির পরিমাণ ও ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
মেয়র মামদানি ও গভর্নর হোকুলের সমালোচনা
অভিযানের ঘোষণা দিতে গিয়ে মুলিন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং গভর্নর ক্যাথি হোকুলের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, নিউইয়র্কের sanctuary নীতির কারণে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ICE-এর মধ্যে সহযোগিতা সীমিত হয়েছে।
ফেডারেল প্রশাসনের বক্তব্য, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হলে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত অভিবাসীদের দ্রুত হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে নিউইয়র্কের sanctuary policy-এর সমর্থকদের বক্তব্য, স্থানীয় পুলিশকে ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সম্প্রসারিত ভূমিকা দেওয়া হলে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে অপরাধের অভিযোগ জানাতেও অনীহা বোধ করতে পারেন।
২৮৭(জি) চুক্তি নিয়ে সংঘাত
ICE ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আইনি বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে 287(g) agreement নিয়ে ফেডারেল সরকার ও নিউইয়র্কের স্থানীয়-অঙ্গরাজ্য প্রশাসনের অবস্থান ভিন্ন।
এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তারা ফেডারেল অভিবাসন enforcement-এর কাজে সহযোগিতা করতে পারেন।
নিউইয়র্কের নীতিনির্ধারকেরা এই সহযোগিতার পরিধি সীমিত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আর ফেডারেল প্রশাসন আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার দাবি জানিয়ে আসছে।
অভিবাসী কমিউনিটিতে বাড়ছে উদ্বেগ
ICE-এর নতুন অভিযান নিউইয়র্কের অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে কোনো সদস্যের অভিবাসন-সংক্রান্ত কাগজপত্র বা আইনি অবস্থান অনিশ্চিত, তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিবাসী অধিকারকর্মীরা বলছেন, গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, enforcement-এর ক্ষেত্রে সবার যথাযথ আইনি অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে ফেডারেল সরকার বলছে, তারা অভিবাসন আইন কার্যকর করার পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
অভিযান এখানেই শেষ নয়
ফেডারেল কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, নিউইয়র্কে ICE-এর enforcement কার্যক্রম আরও চলবে। এক মাসে ২,১৯৭ জনকে গ্রেপ্তারের এই অভিযান অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল অভিবাসন enforcement-এর ব্যাপকতা নতুন করে সামনে এনেছে।
একদিকে ফেডারেল সরকারের দাবি—অপরাধী ও অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিউইয়র্কের স্থানীয় নেতা ও অভিবাসী অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ—অভিযানের প্রভাব যেন সাধারণ ও অপরাধমুক্ত অভিবাসী পরিবারগুলোর ওপর না পড়ে।
নিউইয়র্কে ফেডারেল অভিবাসন enforcement বনাম sanctuary policy নিয়ে এই রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাত আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে।
৩০ দিনের অভিযানে ২,১৯৭ গ্রেপ্তারের ঘটনা নিউইয়র্কে অভিবাসন enforcement-এর নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে—যার প্রভাব শুধু অভিবাসন নীতিতেই নয়, অঙ্গরাজ্যের রাজনীতি, জননিরাপত্তা ও লাখো অভিবাসী পরিবারের জীবনেও পড়তে পারে।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension