নির্বাচিত কলাম

পরিবর্তনই ইতিহাসের ধারা

ড. মাহবুব উল্লাহ্
 
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তার জীবনের শেষদিকে একটি অসাধারণ ছবি এঁকেছিলেন। ছবিটি ছিল কাদার মধ্যে দুটো চাকা দেবে যাওয়া একটি গরুর গাড়ির। গাড়িটিকে কাদার গর্ত থেকে ঠেলে তোলার জন্য দু’জন সুঠামদেহী পুরুষ প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
 
ছবিটি একটি সহজবোধ্য চিত্রকলা হলেও এর প্রতীকী অর্থ ছিল খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। ছবিটি এদেশের কৃষকের অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতীক। সমস্যা যতই কঠিন হোক না, এদেশের কৃষক তা থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে কঠিন চেষ্টা থেকেও বিরত থাকে না। এই ছবিটি হল বাংলার কৃষকের অদম্য স্পৃহার দৃষ্টান্ত। শিল্পী জয়নুল আবেদিনের তুলির পরশে ছবিটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত প্রাণবন্ত। এই ছবিটি ব্যবহৃত হয়েছে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক টিওডর শ্যানিন সম্পাদিত Peasant and Peasant Societies গ্রন্থের প্রচ্ছদ চিত্র হিসেবে। ছবিটি ছিল জয়নুল আবেদিনের স্ত্রীর মালিকানায়।
 
অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ছিলেন টিওডর শ্যানিনের ছাত্র। তারই নির্দেশনায় ড. জিল্লুর তার পিএইচডি গবেষণা করেছেন। তিনি আমাকে বললেন মিসেস জয়নুলের কাছে নিয়ে যেতে। আমি শিল্পাচার্যের বাসাটি চিনতাম। ড. জিল্লুর আমাকে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলার সঙ্গে সঙ্গেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। ছবিটির একটি ক্যামেরা চিত্র ধারণ করা হল। গ্রন্থের প্রকাশক এই চিত্র ব্যবহারের জন্য মিসেস জয়নুলকে শ’দুয়েক পাউন্ড দিয়েছিল। পশ্চিমা গ্রন্থের প্রকাশকরা বিনামূল্যে কোনো কিছু নেয় না। কপিরাইটের ওপর তাদের আনুগত্য প্রশ্নাতীত।
 
নির্বাচনের পর বিএনপির অবস্থা ‘কাদায় আটকে পড়া গরুর গাড়ির’ মতো বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে বিএনপির সমালোচনা করলেও দলটির মহাসচিবের প্রশংসা করে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘তিনি (ফখরুল ইসলাম) সজ্জন মানুষ, তা ছাড়া মানুষ হিসেবেও ভালো।’ বিএনপি যদি শিল্পাচার্যের আঁকা ছবির মতো হয়ে থাকে তবে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আবহমান বাংলার কৃষকের শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হয়ে কাদায় দেবে যাওয়া গাড়িটিকে অবশ্যই টেনে তুলবে এর কর্মী ও নেতৃবৃন্দ। রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে এরকম ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।
 
১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেছিলেন। এই কর্মসূচি ছিল পূর্ববাংলার পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিসংবলিত একটি সুচিন্তিত এবং সুলিখিত রাজনৈতিক প্রস্তাব। এই কর্মসূচির ধারাগুলো এমন ছিল যে, এটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান একটি শিথিল কনফেডারেশনে পরিণত হতো। শেখ মুজিবুর রহমান কর্মসূচিটি প্রথম লাহোরে উত্থাপন করেন। তিনি লাহোরে গিয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিরুদ্ধে আয়োজিত পাকিস্তানের দক্ষিণপন্থী দলগুলোর এক সম্মেলনে যোগদান করতে। তিনি তাদের সঙ্গে একমত পোষণ না করে ৬ দফা কর্মসূচির কথা বলেন।
 
তখন পর্যন্ত এ কর্মসূচি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলাও হয়বনি, পাসও করা হয় নি। তিনি ঢাকায় ফিরে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিকে দিয়ে তার ৬ দফা কর্মসূচি পাস করিয়ে নেন। সেই সময় যারা এই কর্মসূচির সঙ্গে একমত হতে পারেন নি, তারা প্রখ্যাত আইনজীবী আবদুস সালাম খানের নেতৃত্বে ভিন্ন আওয়ামী লীগ গঠন করেন। কিন্তু তারা রাজনৈতিকভাবে শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেন নি। উল্লেখ্য, আইনজীবী আবদুস সালাম খান শেখ মুজিবের হয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে প্রধান ভূমিকায় লড়েছেন। তার সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে অনেক আইনজীবীই লড়াই করেছেন। এর ফলে একটি জাতীয় ঐক্যের সূচনা হয়।
 
৬ দফা কর্মসূচিকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য শেখ মুজিব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় জনসভা করেন এবং আগুনঝরা ভাষায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে জনমত গঠন করেন। তার এই উদ্যোগ বাধামুক্ত ছিল না। তিনি যেখানেই বক্তৃতা করতে গেছেন, সেখানেই তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। আবার জামিনও পেয়ে যান। এভাবে মামলা ও জামিনের নাটক কিছুদিন চলার পর তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করা হয়।
 
আটকাধীন অবস্থায় এক পর্যায়ে তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়। শেখ মুজিব কারারুদ্ধ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে তাদের কারাবন্দি করা হয়। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তেমন কেউ বাইরে ছিল না। আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ (বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি) সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বাতি জ্বালাতেন। কিন্তু ভয়ে কেউ আওয়ামী লীগের অফিসে আসত না। সেদিন কি আওয়ামী লীগ কাদায় দেবে যাওয়া গরুর গাড়ির মতো অবস্থায় পড়েছিল? না, মোটেই নয়।
 
১৯৬৮ সালে শেষ অবধি আওয়ামী লীগ দারুণ দুর্যোগের মধ্যে পড়েছিল। আমরা যারা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারাও দারুণ হতাশার মধ্যে দিনাতিপাত করছিলাম। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচন) মিস ফাতেমা জিন্নাহ আইয়ুব খানের সঙ্গে হেরে যাওয়ার পরই দেশব্যাপী তীব্র হতাশা দেখা দিয়েছিল। অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিল লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে হটানো যাবে না, হটানো সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠন এনএসএফের নৃশংস অত্যাচার ছিল অব্যাহত।
 
১৯৬৮-র ডিসেম্বরে হঠাৎ করে ব্যাপক আশার উদ্রেক ঘটে। মওলানা ভাসানী ৫ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানে জনসভা করেন এবং গভর্নর হাউস (বর্তমান বঙ্গভবন) ঘেরাও করেন। মওলানার জনসভায় রিকশা শ্রমিক নেতা আবদুস সেলিম শ্রোতাদের মধ্যস্থল থেকে দাঁড়িয়ে উঠে মওলানাকে পরদিন হরতাল ঘোষণা করতে বলেন। আবদুস সেলিম বেবিট্যাক্সি চালকদের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতনের কাহিনী তুলে ধরেন। মওলানা সাহেব বায়তুল মোকাররমের সিঁড়ি থেকে ৬ ডিসেম্বর হরতাল ঘোষণা করেন। এই সময় মওলানার দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সেক্রেটারি মোহাম্মদ তোয়াহা এবং কৃষক সমিতির সেক্রেটারি আবদুল হক দু’দিক থেকে মওলানার পাঞ্জাবির পকেট টেনে ধরে তাকে হরতাল ঘোষণা থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মওলানা নিবৃত্ত হন নি।
 
তোয়াহা ও হক সাহেবের আচরণ অযৌক্তিক ছিল না। রাজনীতির ব্যাকরণ অনুযায়ী সেকালে হরতাল করার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি লাগত। খণ্ড পথসভা, লিফলেট বিতরণ, দোকানে দোকানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতি আবেদন-নিবেদন জানানো এবং কলকারখানার শ্রমিকদের সমর্থন আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে হরতাল করা হতো। হরতালের আগের দিন ‘আগামী কাল হরতাল’ স্লোগান দিয়ে মশাল মিছিল করতে হতো। এসবের কিছুই করা হল না, অথচ মওলানা ভাসানী হরতাল ডেকে বসলেন। হরতাল হবে কিনা সেটাই ছিল তোয়াহা ও হক সাহেবদের দুশ্চিন্তার বিষয়।
 
মওলানা সাহেব বায়তুল মোকাররম থেকে হরতালের পক্ষে মিছিল শুরু করলেন। কিন্তু স্টেডিয়ামের গেট পর্যন্ত যেতে না যেতেই ইপিআরের লোকেরা মওলানা সাহেবের বুকের ওপর খুবই কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের নল তাক করে বসল। তাকে এক কদমও এগোতে দেবে না। মওলানা সাহেব জায়নামাজ নিয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন এবং নামাজ পড়তে শুরু করলেন। সম্ভবত সময়টা ছিল মাগরিবের ওয়াক্ত। নামাজ শেষে মওলানা ভাসানী মোনাজাত শুরু করলেন। মোনাজাতে তিনি ফেরাউন, নমরুদের আধুনিক সংস্করণ আইয়ুব খানের পতন কামনা করলেন। দীর্ঘ মোনাজাতে তিনি জালেম ও জুলুমের অবসান প্রার্থনা করলেন। তার মোনাজাতের ভাষা মানুষের মনে আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ইপিআরের জওয়ানরা যখন মওলানা সাহেবের পথরোধ করে দাঁড়াল তখন তার পাশে ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রখ্যাত ন্যাপ নেতা মিয়া আরিফ ইফতেখার।
 
পরদিন ঢাকায় একটি অত্যন্ত সফল হরতাল হল। হরতালের সময় পুলিশের গুলিতে আবদুল মজিদ ও আবু নামে দু’জন শহীদ হল। এর পরদিনও হরতাল ডাকা হয়েছিল এবং হরতালও হয়েছিল। জননেতার সঙ্গে দলনেতার এটাই পার্থক্য। যিনি জননেতা তিনি জনগণের নাড়ির শব্দটি শুনতে পান। অন্যদিকে দল নেতারা নানান রকম হিসাব কষেন। বেশ ক’বছর ধরে অব্যাহত থাকা রাজনৈতিক হতাশা নিমিষেই নিঃশেষ হয়ে গেল।
 
আন্দোলন গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য মওলানা ভাসানী দেশব্যাপী গ্রামে গ্রামে ২৯ ডিসেম্বর ১৯৬৮ হাট হরতালের ডাক দিলেন। নরসিংদীর হাতিরদিয়ায় হাট হরতাল সফল করার জন্য কৃষক নেতায় পরিণত ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান উদ্যোগ নিলেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধল। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বের হল। গ্রেফতার এড়ানোর জন্য তিনি ঢাকায় চলে এলেন এবং ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটে পৌঁছা মাত্রই পুলিশের ডিএমপি বাহাউদ্দিন তাকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেইঞ্জ থেকে গুলি করল।
 
তখনই বের হয়ে গেল আসাদুজ্জামানের প্রাণ। তিনি শহীদ হলেন। আসাদুজ্জামান মিছিলে গুলির ফলে শহীদ হওয়া আর দশ জনের মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাসী একজন সচেতন কর্মী। তাই তার শাহাদাত এখনও মানুষ স্মরণ করে শহীদ আসাদ দিবস পালনের মাধ্যমে। শহীদ আসাদের স্মরণে আসাদ যেখানে শহীদ হয়েছিলেন সেখানে একটি স্মৃতির স্থাপনা নির্মাণ করার প্রকল্প নিয়েছিলেন এক সময় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। জাতির দুর্ভাগ্য সেই প্রকল্প আজও বাস্তবায়িত হয় নি।
 
১৯৬৯-এর ছাত্র গণআন্দোলনের সূচনার পূর্ব পর্যন্ত মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ কাদার গর্তে আটকে গেছে। কিন্তু মওলানা ভাসানী যে প্রতিরোধের সূচনা করেছিলেন সেই প্রতিরোধ অতি অল্প সময়ের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হল। মওলানা ভাসানী ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ পল্টন ময়দান থেকে বজ্র নির্ঘোষে আওয়াজ তুললেন বাস্তিল দুর্গের মতো ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে মুজিবকে মুক্ত করা হবে। মুজিব মুক্ত হলেন ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ দশ লাখ লোকের জমায়েতে শেখ মুজিবকে গণসংবর্ধনা দেয়া হল। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমিও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতাটি দিয়েছিলাম। শেখ মুজিব আমার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘খুব তো বলেছিস। আমাকে ঝামেলায় ফেললি।’ আমি তাকে বলেছিলাম, আপনার মতো নেতাকে ঝামেলায় ফেলার ক্ষমতা কি আমার আছে? সেই গণসংবর্ধনা সভায় তৎকালীন ডাকসু সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের ঘোষণা দেন। জনগণ সেই ঘোষণা দু’হাত তুলে সমর্থন জানান। এটাই হল রাজনীতির জোয়ার-ভাটার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। ফাঁসির আসামি মুক্ত মানুষ হয়ে তার জনগণের কাছে চলে এলো।
 
সেকাল ও একালের রাজনীতিতে অনেক তফাৎ। পুলিশের আচরণেও অনেক তফাৎ। শহীদ আসাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে ৪-৫ জনের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয় নি। আর এখন আসামি করা হয় শত শত ব্যক্তিকে। প্রায়ই অজ্ঞাত বলে, যাতে যখন-তখন যে কাউকে গ্রেফতার করা যায়। এমন কী কোনো ঘটনা না ঘটলেও মামলা হয়। সাংবাদিকদের রিপোর্টের ভাষায় এসব মামলার নাম ‘গায়েবি’ মামলা। কাজেই ভাটার পর জোয়ার আসতে অনেক বেশি সময় লাগবে বৈকি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে হঠাৎ জোয়ার শুরু হয়ে যেতে পারে। ছাত্র কিশোরদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলন আমাদের সবার কল্পনারও বাইরে গিয়ে বিশাল জাগরণের সৃষ্টি করেছিল।
 
তৈরি হয়েছিল চমৎকার সব স্লোগান। যেমন, যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ। যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই বাংলাদেশ। রাজপথে পোস্টার সাঁটা হয়েছিল, ‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে/সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত। কোমলমতি শিশু-কিশোররা কীভাবে এসব মহৎ ভাবনা সৃষ্টি করতে পেরেছিল তা ভাবতে অবাক লাগে। মাত্র ক’দিন স্থায়ী এই আন্দোলনে তারা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল। আন্দোলনটি হয়েছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের শাসনের সময়েই। কিন্তু তারা বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী ভাষায় এই আন্দোলনের জবাব দেয়া হবে।
 
৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় হয়েছে। কেউ কেউ বললেন, এটা আওয়ামী সুনামি। ভূমিধস ও সুনামি দুটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে অনেক মানুষের প্রাণ যায়। অন্য কোনো যুৎসই বিশেষণ ব্যবহার করলে ভালো হতো। কিন্তু সেই বিশেষণ বোধহয় সাংবাদিকরা খুঁজে পান নি। মনের অজান্তে তারা বিপদের কথাই বললেন।
 
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম মন্তব্য করেছেন, ‘যত বড় বিজয় তত বড় শঙ্কা।’ নাসিমদের মতো ব্যক্তিরা মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পান নি। এটা কেন এবং কী জন্য হল তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এতই ভারি যে, ১৪ দলীয় জোটের ও মহাজোট থেকে নির্বাচিতদের সংসদে বিরোধী দলে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ যেন শিশুদের ‘যেন-যেন’ খেলা। ইংরেজিতে একে বলে Make belief game. নাসিম সাহেব বুঝে কিংবা না বুঝে মন্তব্য করেছেন কিনা, জানি না। তবে অনেক সময় জয়ের ভার এত বড় হয়ে যায় যে, দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
 
ইংরেজিতে একটি কথা আছে, Collapsing out of its own weight. ফরাসি ইতিহাসবিদ ফার্নান্ড ব্রদেল তার একটি গ্রন্থের একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছিলেন, Weight of numbers. জানিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিণতি কী দাঁড়াবে। কথায় বলে History repeats itself, অর্থাৎ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। বাস্তবে অবশ্য তেমনটি হয় না। ইতিহাসের গতিময়তায় নায়ক-নায়িকা থেকে শুরু করে সব অভিনেতা-অভিনেত্রীর পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন হয় দৃশ্যপটেরও। মঞ্চেরও পরিবর্তন হয়। দর্শকদেরও পরিবর্তন হয়। এরকম পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগামী দিনে কী ঘটবে তা কষ্টি বিচার করে বলা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনই ইতিহাসের ধারা।
 
ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension