
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ভাস্কর্যের বদলে পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ— ইতিহাস সংরক্ষণ নাকি মূল ভাবগাম্ভীর্য বিচ্যুতি?
বিশেষ প্রতিবেদন॥
ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ স্থান—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের স্থান এবং ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থান—সংরক্ষণে মূল নকশায় থাকা ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। ভাস্কর্যের পরিবর্তে সেখানে ওয়াটার ফাউন্টেন বা পানির ফোয়ারা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক অগ্রগতি প্রতিবেদনে ‘প্রকল্প পুনর্গঠন ও পরিমার্জন’ (Rescoping and Repurposing)-এর অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, স্থপতি এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘সোয়াধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)’ শীর্ষক ৩৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাস্তব রূপরেখায় তুলে ধরা এবং উদ্যানের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করা।
আগের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল, প্রাথমিক নকশায় ৭ মার্চের ভাষণের স্থানে বঙ্গবন্ধুর একটি ব্রোঞ্জ বা কংক্রিটের ভাস্কর্য এবং ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের স্থানে যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মৃতিসংবলিত ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা। পাশাপাশি ভাষণের স্থানটিতে ‘হোলোগ্রাফিক ৩ডি’ প্রজেকশনেরও পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্মাণাধীন স্থানগুলোতে ভাঙচুর ও কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই দুটি নির্দিষ্ট স্থানে ব্রোঞ্জ বা কংক্রিটের কোনো ভাস্কর্য না বসিয়ে ‘ওয়াটার ফাউন্টেন’ বা দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা স্থাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এছাড়াও ৭ মার্চের ভাষণের ৩ডি হোলোগ্রাফিক পরিবেশনায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্থাপত্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই পরিবর্তন নিয়ে মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন, মন্ত্রনালয়ের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিকের মতে, ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ কেবল সাধারণ ঘটনা নয়, এগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর। সেখানে পানির ফোয়ারা নির্মাণ করলে দর্শনার্থী ও নতুন প্রজন্ম স্থানগুলোর প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হতে পারে।
নকশা পরিবর্তনের আইনি ও কৌশলগত জটিলতা প্রসংঙ্গে মিডিয়ার সাথে প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত কর্মকর্তা জানান, “এটি একটি জাতীয় বিষয়, হঠাৎ করে নকশা পরিমার্জন সহজ নয়। জাতীয় স্মৃতিবিজড়িত স্থানের ইতিহাস ধরে রাখার যে মূল উদ্দেশ্য, এই পরিবর্তনের ফলে তা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে সেটি বড় প্রশ্ন”।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কেবল একটি নগর পার্ক নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জীবন্ত দলিল। উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজের পাশাপাশি একাত্তরের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মূল ঘটনা ও ভাবগাম্ভীর্য যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার প্রত্যাশা করছেন দেশের বুদ্ধিজীবী ও গবেষক মহল।



