মুক্তমতবাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী কন্যার জাতিসংঘে নিয়োগ নিয়ে কিছু কথা

আরশাদ মাহমুদ

আমি এখন ইউরোপ ভ্রমণে আছি। প্রথম দেশ হিসেবে গত রাতে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসতে পৌঁছেছি।
সত্যি কথা বলতে কি জায়মা রহমানের নিয়োগ নিয়ে কোন কিছু লেখার ইচ্ছে আমার ছিল না। ভেবেছিলাম আগামী প্রায় এক মাস ইউরোপের যে ছয়-সাতটি দেশ ভ্রমণ করার পরিকল্পনা আছে সেগুলোর অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করবো।

কিন্তু গতকাল খুব ভোরে বিমানবন্দরে পৌঁছে স্কাই লাউঞ্জে বসে ফেসবুক চেক করার সময় জায়মা রহমানের নিয়োগের খবরটা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। ১১ ঘণ্টা ফ্লাইট টাইম এবং প্রায় চার ঘন্টা শারজাহ বিমানবন্দরে যাত্রা বিরতিসহ মোট প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধরেই এই ভাবনাটা মন থেকে দূর করতে পারিনি।ভাবছিলাম বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কখনোই সম্ভবত ভালো হবে না। কেন এমন ধারণা হলো সেটা ব্যাখ্যা করছি।

খবরটার পক্ষে-বিপক্ষে সারাদিন ধরেই নানা রকমের মন্তব্য চোখে পড়েছে। সরকারি দলের দলদাস ছাড়াও কয়েকজন মোটামুটি নিরপেক্ষ ব্যক্তি– যার মধ্যে একজন প্রাক্তন সচিবও আছেন– দেখলাম এটার প্রশংসা করেছেন। বিরোধী পক্ষের সবাই খুব রুঢ় ভাষায় এর নিন্দা জানিয়েছে।

এরমধ্যে আমার যে প্রতিক্রিয়া সেটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি। প্রথমেই ভাবলাম জায়মা রহমান যদি কোন অক্ষত, অপরিচিত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত কোন বাংলাদেশি হতো তাহলে সে এই নিয়োগ পেত কিনা? এর সোজাসাপ্টটা জবাব হলো– না; কোনভাবেই না।

তার পক্ষে যারা সাফাই গাইছেন তাদের বক্তব্য হল তিনি অত্যন্ত যোগ্য এই পদের জন্য এবং এতে দেশের মঙ্গল হবে ভবিষ্যতে।

প্রথম প্রশ্ন হল যোগ্যতার সংজ্ঞা কি এবং তার যোগ্যতা কিভাবে প্রমাণ হলো?

আমাদের সবার কাছেই যোগ্য তাদেরকেই মনে হয় যারা ইংল্যান্ড, আমেরিকার ডিগ্রিধারী এবং ইংরেজি লিখতে-বলতে পারে তাদেরকেই আমরা সাধারণত যোগ্য বলি। সেই সংজ্ঞায় জাইমা রহমান বা খলিলুর রহমান খুবই যোগ্য ব্যক্তি। যেহেতু আমার বিদেশে লেখাপড়া নেই এবং ইংরেজি তেমন একটা লিখতে-পড়তে পারি না তাই অনেকেই আমাকে খুবই অযোগ্য মনে করেন এবং তাদের ধারণা সম্পূর্ণ সত্য। অনেককেই বলতে শুনি যে আমি কোন যোগ্যতায় খলিল-জলিলদের মত বিদেশি ডিগ্রিধারীদের সমালোচনা করি। তাদের এই যুক্তি অকাট্য। আমি এটা নিয়ে কোন কনটেস্ট করব না। তবে আমার বিবেচনায় যোগ্য তিনি, যিনি সুশিক্ষিত এবং তার অর্জিত শিক্ষা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এবং সর্বোপরি দেশের উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করেন। এবং কোনভাবেই তা নিজের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহার করেন না।

সাংবাদিকতার কারণে আমি এই খলিল-জলিলদের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি বা তাদের সম্পর্কে জানি। এই আপাদমস্তক ধান্দাবাজ তথাকথিত দেশপ্রেমিকরা সাধারণত বিদেশে থাকেন এবং দেশে কোন দুর্যোগ হলে এরা পয়গম্বর এর মত আবির্ভূত হয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে দেশে আসেন। আবার কোন ঝামেলা হলে দেশ থেকে পালিয়ে যান। যেমন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

এবার আসি জায়মা রহমানের যোগ্যতার ব্যাপারটি বিষয়। খবর নিয়ে জানলাম বছর দুয়েক আগে জায়মা ব্যারিস্টারি পাস করেছে ইংল্যান্ড থেকে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোথাও প্র্যাকটিস করেনি; এমনকি দেশে বা বিদেশে কোন নামকরা ল ইয়ারের জুনিয়র হিসেবেও তার কাজের কোন অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু তিনি নিয়োগ পেয়েছেন জাতিসংঘ বর্তমান সাধারণ পরিষদের সভাপতিদের লিগাল অফিসার হিসেবে।

ফলে নির্দ্বিধায় বলা যায় সে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে হওয়াতেই এই নিয়োগ পেয়েছে। আর যিনি নিয়োগকর্তা তিনি বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার নিয়োগ কর্তা হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এটা একটা লেনদেনের ব্যাপার।
আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় বর্তমানে সাধারণ পরিষদের সভাপতি যদি বাংলাদেশের কেউ না হতেন তবে জায়মা রহমান কোনোভাবেই সেখানে নিয়োগ পেতেন না। পরিষ্কারভাবে বলতে হয় এটা খুব সিরিয়াস একটা কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট এর ব্যাপার। আরো নেকেডলি বললে বলতে হয় এই নিয়োগ স্বজনপ্রীতির নিকৃষ্ট উদাহরণ।

এখন দেখা যাচ্ছে কেউ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলে তার সন্তানদের বিভিন্নভাবে কোন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিয়োগের ব্যবস্থা করা একটা রিচুয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তার পতনের পরপরই তাকে সেখান থেকে অপসারণের চেষ্টা হয় ইউনুস সরকারের আমলে এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই পদত্যাগ করে চলে যান। লিখে রাখতে পারেন তারেক রহমান যদি কোন কারনে দেশের প্রধানমন্ত্রী না থাকেন, থাকলে জায়মা রহমানেরও একই অবস্থা হবে।

জায়মা রহমানের পক্ষে যারা বক্তব্য দিচ্ছেন তাদের একটা যুক্তি হলো যে সেটা জাতিসংঘের কোনো স্থায়ী পদ নয় এবং সেখান থেকে তিনি কোন বেতন ভাতা পাবেন না। প্রশ্ন হল তিনি যে এক বছর নিউইয়র্কে থাকবেন তার খরচ কে বহন করবে? নিশ্চিতভাবে বলা যায় সেটা বাংলাদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় হবে। ফেসবুকে কোন এক পোস্টে দেখলাম জায়মা জাতিসংঘে আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধির বাসায় থেকেই কাজ করবেন এবং খাওয়া-দাওয়া সেখানই হবে। ইতিমধ্যে জানেন স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান প্রধানমন্ত্রীর পত্নী জোবায়দা রহমানের আপন চাচাতো বোন। এগুলো যদি স্বজনপ্রীতি না হয়, তাহলে শেখ হাসিনা বা ইউনুসকে আমরা কেন স্বজন প্রীতির জন্য দর্শক দোষারোপ করছি!

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির বেতন ভাতা জাতিসংঘ দেয় না; সাগতিক দেশকেই সেটা বহন করতে হয়। যেমন খলিলুর রহমানের বেতন এবং তার সঙ্গে যারা কাজ করবেন তাদের সবারই বেতন-ভাতা হবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।

এর পক্ষে যারা সাফাই গাইছেন তাদের বক্তব্য হলো খলিলুর রহমানের বর্তমান নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশকে এক বিশাল উচ্চতায় নিয়ে গেছে বিশ্বমঞ্চে। বিশ্ব বাটপার মুহাম্মদ ইউনুস এর মূল প্রবক্তা। তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে ইউনুস বা তার মত যারা দালাল আছে তারা কিসের ভিত্তিতে বললেন যে বাংলাদেশে এখন বিশ্বে সবচেয়ে সম্মানিত আলোচিত দেশ। আমি তো দুনিয়াদারীর সংবাদ মাধ্যম ঘেঁটে এর কোন প্রমাণ কোথাও পেলাম না।

পরিশেষে তারেক রহমানকে অনুরোধ করবো আমার এই কথাগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে, দেশের সত্তিকার মঙ্গল যাতে হয় সেদিকে মনোযোগ দেবেন। আরো বলবো আপনার বাবাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেন; মাকে নয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান এখনো মানুষের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছেন তার প্রধান কারণ হলো তার ব্যক্তিগত সততা এবং তিনি তার কোন আত্মীয়-স্বজনকে কখনোই সামনে আনেন নি। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় বেগম খালেদা জিয়া তার প্রয়াত স্বামীর সেই পথ অনুসরণ করেননি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension