
হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৮০০ ছাড়াল, ৯১% টিকাবঞ্চিত
সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৮০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৩৭ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯১ দশমিক ৫ শতাংশের টিকা দেওয়া ছিল না।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কেসভিত্তিক পর্যবেক্ষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
১৪ জুলাই পর্যন্ত ৩৩৭ জনের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা জানানো হয়েছে। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এক ডোজ এবং ২ দশমিক ১ শতাংশ দুই বা তার বেশি ডোজ টিকা নিয়েছিল। এ ছাড়া মারা যাওয়া ২৪ শতাংশ শিশুর এখনও টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। টিকাবঞ্চিত শিশুরাই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর শিকার হয়েছে।
ইপিআই ও ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ৬৬ হাজার ৬৯০ রোগীর মধ্যে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। এক ডোজ এমআর টিকা পেয়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং দুই ডোজ টিকা পেয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ১৪ হাজার ৮৪৯ রোগীর মধ্যে ৮০ শতাংশই কোনো এমআর টিকা নেয়নি। এক ডোজ টিকা নিয়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং দুই ডোজ নিয়েছে ১২ শতাংশ।
এদিকে, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে ৮০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ছয় শিশু মারা গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
মৃত ৩৩৭ জনের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২২ শতাংশের বয়স ছিল ৬ মাসের কম, ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস, ২৫ শতাংশের বয়স ৯ থেকে ১১ মাস, ১৭ শতাংশের বয়স ১ থেকে ৪ বছর, ৩ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ৯ বছর এবং ১০ বছরের বেশি বয়সী ছিল ৩ শতাংশ।
টিকাবঞ্চিতদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে ২৪ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ছয় মাসের কম, অর্থাৎ তাদের এমআর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। এ ছাড়া ৩২ শতাংশের বয়স ছিল ৬ থেকে ৯ মাস, ২৫ শতাংশের ৯ মাস থেকে ১ বছর, ১৪ শতাংশের ১ থেকে ৪ বছর, ২ শতাংশের ৫ থেকে ৯ বছর এবং ১০ বছরের বেশি বয়সী ছিল ৩ শতাংশ।
হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সমকালকে বলেন, টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুর অপুষ্টি, মায়ের অপুষ্টি, ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি, অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত থাকা এবং মায়ের পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়া। তিনি বলেন, তিন-চার বছর ধরেই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি– এমন শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর প্রবণতা বাড়ছে। তবে চলতি বছর এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
টিকা কার্যক্রম চলার পরও হাম নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, এখনও টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি– এমন শিশুরা সংক্রমিত হচ্ছে। পাশাপাশি ১০ বছরের বেশি বয়সীরা সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ পরিস্থিতিতে কম বয়সী শিশুদের জ্বর দেখা দিলেই দ্রুত আলাদা রেখে বিশেষ যত্নে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মাস্ক ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের এক পর্যায়ে নিউমোনিয়া দেখা দেয় এবং তারা নিউমোনিয়ায় মারা যায়। তিনি বলেন, টিকা ছাড়াও সঠিক পুষ্টি ও মায়ের বুকের দুধ শিশুকে সুরক্ষা দেয়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ সাব্বির হায়দার বলেন, টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি এবং ছয় মাসের নিচের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাম পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ৯০৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজার ৩৫২। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্তের সংখ্যা ১৩৩। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ হাজার ৮৪১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৯৯ হাজার ২৯৪ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কেউ মারা যায়নি। হামের উপসর্গে যে ছয় শিশু মারা গেছে, তাদের চারজন ঢাকা বিভাগের এবং বাকি দুজন সিলেটের।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, তবু বাদ পড়েছে লাখো শিশু
চলতি বছরের মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এই কর্মসূচিতে সরকারি হিসাবে ১০৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হয়। তবে গত জুনে একই বয়সী দুই কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা তুলনা করলে দেখা যায়, প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে ছিল।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, মোট শিশুর অন্তত ৯৫ শতাংশের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ হয় না। হার্ড ইমিউনিটি না হলে সংক্রমণ চলতেই থাকবে। তিনি বলেন, শিশুদের শুধু টিকার আওতায় আনলেই হবে না, কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে কোনো টিকাদান কর্মসূচির পর টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নে গবেষণা ও নজরদারি (পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিলেন্স) পরিচালনা একটি আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ইউনিসেফ, আইইডিসিআর বা আইসিডিডিআর,বি– যে কোনো প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের মূল্যায়ন করতে পারে। এতে দেখা হয়, টিকা নেওয়ার পর কত শতাংশ মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি কতটা কার্যকর হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুলের কথা স্বীকার মন্ত্রীর
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের পর সরকার বুঝতে পারে, হামের টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হয়েছিল। তিনি বলেন, সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে টিকাদানের পাশাপাশি বাবল সিপ্যাপ, ভেন্টিলেটরসহ নিবিড় চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।



