
একাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয় নি: টিআইবি
নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে- ‘একাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয় নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ ধরনের নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। পর্যালোচনার জন্য ৩শ’ আসনের মধ্য থেকে দৈবচয়নের (লটারি) ভিত্তিতে ৫০টি আসন বেছে নেয় টিআইবি। সেখানে দেখা গেছে, ৪৭ আসনেই অনিয়ম হয়েছে। পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত আসনগুলোতে আওয়ামী লীগ ৪০, জাতীয় পার্টি ৬, বিএনপি ১, গণফোরাম ২ এবং অন্যান্য দল ১টি আসনে জয়ী হয়েছে।
অনিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে- ৪২ আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা, ৪১ আসনে জাল ভোট দেওয়া, ৩৩ আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখা, ৩০ আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট, ২৯ আসনে পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ২৬ আসনে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া, ২৬ আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা, ২২ আসনে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, ২১ আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া, ২০ আসনে ব্যালট বাক্স আগে থেকে ভরে রাখা, ১১ আসনে প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীর নেতাকর্মীদের মারধর করা, ২৯ আসনে পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া এবং ১০ আসনে কোনও এজেন্ট না থাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সারা দেশের বেশির ভাগ কেন্দ্র আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের নেতাকর্মীদের দখলে থাকার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালনে সমর্থ হয় নি।’

গত বছরের নভেম্বর থেকে শুরু করে ভোটের দিন ও চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কমিশন গুরুত্বপূর্ণ অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয় নি। নির্বাচন কমিশন সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে নি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে কিনা তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। এছাড়া নির্বাচনের সময়ে তথ্যপ্রবাহ ‘নিয়ন্ত্রণ’ ছাড়াও ক্ষমতাসীন দল-জোটের কোনে কোনো কার্যক্রম নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে।’
প্রতিবেদনে আরও বল হয়, প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের প্রবণতা দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে। এটা আইনপ্রণেতাদের আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে অনীহার প্রমাণ দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিধি মানা না হওয়ায় নির্বাচন আংশিক অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। ভোটারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সমান সুযোগ ছিল না। সব দলের প্রার্থীরা প্রচারে সমান সুযোগ পায় নি।
নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশিত নিরপেক্ষতার অভাব ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সময়মতো উদ্যোগ নেয়ায় ব্যর্থতা ছিল। মোটা দাগে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায়, কারণ সব দল প্রার্থী দিয়েছিল। আংশিক অংশগ্রহণমূলক এ কারণে বলা হচ্ছে, সবাই সমান সুযোগ পায় নি। গণতন্ত্রের জন্য এ ধরনের নির্বাচন ইতিবাচক নয়। এটাও ঠিক যে একটা নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র আসে না আবার ধ্বংসও হয় না।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি সুলতানা কামাল বলেন, ‘নির্বাচনে যদি সমান সুযোগ দেওয়া না হয়, সেটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। সে কারণেই বলা হচ্ছে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচনে সবাই সমান সুযোগ পাবে এটাই বাঞ্ছিত। সবাই সমান সুযোগ না পেলে সংশয় থেকেই যায়। এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো উদাহরণ নয়। নির্বাচন পরিচালনায় প্রচুর ত্রুটি ছিল। এজন্য আমরা বলছি, ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সামনের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করবেন।’
টিআইবির পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এগুলো হল- সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়া; নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্য অংশীজনদের দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখা; সহিংসতা-বলপ্রয়োগসহ আচরণবিধির বহুমুখী লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও তার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নেয়া; আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা নিরূপণ করা; নির্বাচন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করা, পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের জন্য অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ভোট হওয়া ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২৫৭টিতে জয় পেয়েছে দলটি, জোটগতভাবে তারা পেয়েছে ২৮৮ আসন।
অপরদিকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা সব মিলিয়ে মাত্র ৭টি আসন পেয়েছে। জয়ী আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে সরকার গঠন করলেও নির্বাচনে অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে জয়ী সংসদ সদস্যরা শপথ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুনঃভোট দাবি করেছেন তারা।



