খেলাযুক্তরাষ্ট্র

‘এটি প্রদর্শন করতে পারবেন না’— যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের ম্যাচে টার্গেট করা হতো ফিলিস্তিনি পতাকা

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হওয়া প্রতীকগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিনের পতাকা।

ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিয়মানুযায়ী স্টেডিয়ামের ভেতরে যেকোনো দেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অনুমতি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ম্যাচ দেখতে আসা বেশ কয়েকজন সমর্থক মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের আটকে দিয়েছেন। তাদের ফিলিস্তিনের পতাকা সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে, অন্যথায় তা বাজেয়াপ্ত করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

আরব দেশগুলোর সমর্থকদের ব্যাপক সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবেই এমন ঘটনা ঘটছে। এবারের বিশ্বকাপে ফিলিস্তিন অংশ না নিলেও গ্যালারিজুড়েই দেখা যাচ্ছে ফিলিস্তিন নামক দেশটির পতাকা।

ফিলিস্তিনপন্থি অনেক অধিকারকর্মীর মতে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হলেও, এই সংঘাতগুলো প্রমাণ করে যে জনপরিসরে ফিলিস্তিনি পরিচয়কে ক্রমবর্ধমান নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে।

ওকল্যান্ডের ফিলিস্তিনি-বংশোদ্ভূত আমেরিকান সংগঠক মাইসা মোরার বলেন, নিরাপত্তাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির জন্য ফিফাই দায়ী। তিনি দাবি করেন, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এ নিয়ে ফিফার দেওয়া বার্তাই বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। এতে নিরাপত্তাকর্মীরা পতাকা বহনকারী সমর্থকদের বাধা দেওয়ার সাহস পেয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা খবর দেখছিলাম যে ফিফা স্টেডিয়ামে ফিলিস্তিনের পতাকা নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছে। শুরুতে আমার মনে হয়েছিল, এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন? বিশ্বকাপে মানুষ সব সময়ই নিজেদের পতাকা নিয়ে আসে। তাই ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানো যাবে কিনা, তা নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠাটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছিল।

বাস্তবতা যখন ভিন্ন

কিছু সমর্থকের জন্য এই আশঙ্কা দ্রুতই বাস্তবে রূপ নেয়।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ওমর দ্রেইদি জানান, লেভিস স্টেডিয়ামে একটি ম্যাচ দেখার সময় একজন নিরাপত্তাকর্মী তার কাছে এসে বলেন, আপনি ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শন করতে পারবেন না।

মিডল ইস্ট আইকে দ্রেইদি বলেন, আমার ভাগ্য ভালো ছিল যে আমি ফিফা মাস্টার্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ফিফায় আমার বন্ধু রয়েছে এবং আমি ফিফার নিয়মকানুন বুঝি। আমি এনবিএ খেলোয়াড়দের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করি, তাই আমি জানি কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ।

এক্সে পোস্ট করা দ্রেইদির একটি ভিডিও ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, তিনি কাঁধে ফিলিস্তিনের পতাকা জড়িয়ে ওই ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন।

ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, আপনি যদি আমাকে ফিলিস্তিনের পতাকা নামিয়ে ফেলতে বাধ্য করেন, তবে ওই ব্যক্তিকেও তার কেফিয়াহ (ফিলিস্তিনিদের ঐতিহ্যবাহী স্কার্ফ) খুলে ফেলতে বলুন।এ সময় তিনি তাঁর পক্ষে কথা বলা আরেক সমর্থকের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন।

দীর্ঘক্ষণ বাগ্‌বিতণ্ডার পর ওই নিরাপত্তাকর্মী রেডিওতে তার সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ফিরে এসে দ্রেইদিকে জানান যে তিনি পতাকাটি রাখতে পারবেন।

দ্রেইদি বলেন, তিনি যখন আমাকে বললেন, ‘আপনি পতাকাটি রাখতে পারেন, এখন শান্ত হোন,’ তখন আমি বলেছিলাম, ‘আপনিই তো এসে আমাকে হয়রানি করেছেন’।

দ্রেইদি আরও জানান, তাদের এই বাদানুবাদ দ্রুতই আশপাশের দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমার পেছনে দুজন আলজেরীয় বসেছিলেন, তারাও এতে যোগ দেন। এরপর পেছনের সারির এক নারীও ভিডিও করতে শুরু করেন—মানুষ এমন কিছু করছিল, যা সত্যিই সুন্দর। এটি সংহতি, গর্ব ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ওই দুজনের প্রতি আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।

অনলাইনে ঘটনাটি পোস্ট করার পর দ্রেইদি আরও অনেক সমর্থকের কাছ থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরেছেন।

তিনি বলেন, মাঠে থাকা অনেকেই আমাকে মেসেজ করে জানিয়েছেন যে তাদের পতাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আমার খারাপ লেগেছে, কারণ আমি চাই তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানুক।

তিনি আরও বলেন, সমর্থকদের উচিত টুর্নামেন্টের নিয়মাবলি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা এবং সম্ভব হলে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিও বা প্রমাণ রাখা। আমি চাই সমর্থকেরা জানুক যে তারা ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াতে পারেন এবং এটি তাদের অধিকার। যদি তাদের কোনো সহায়তার প্রয়োজন হয়, তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি ফিফার আইনি দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মিডল ইস্ট আই ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সংহতির প্রতীক এবং ফিফার দ্বিমুখী নীতি

এই ঘটনাগুলো এমন একটি টুর্নামেন্টের প্রেক্ষাপটে ঘটছে, যা একাধিক ফ্রন্টে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফিফা বিশ্বকাপকে ফুটবল এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যের উৎসব হিসেবে প্রচার করলেও, অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, যুদ্ধ, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ফিফা তাদের সেই নীতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সমালোচকেরা বৈশ্বিক সংঘাতের ক্ষেত্রে ফিফার দ্বিমুখী নীতির দিকেও আঙুল তুলেছেন।

২০২২ সালে ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে ইসরাইলকে নিষিদ্ধ করার জন্য ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও মানবাধিকারকর্মীদের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও ফিফা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে। টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ইভেন্টে ট্রাম্পের উপস্থিতি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ফিফার এই সখ্য মেনে নিতে পারছেন না অধিকারকর্মীরা।

ফিলিস্তিনি সমর্থকদের কাছে স্টেডিয়ামের ভেতরের এই পতাকা–বিতর্ক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর বৈষম্যেরই একটি অংশ বলে মনে হচ্ছে। তবে দ্রেইদির মতে, এই টুর্নামেন্ট জাতীয় ও রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে ফুটবলের ক্ষমতারও প্রমাণ দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ফিফাকে নিয়ে আমাদের অনেক অভিযোগ রয়েছে—ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া, ইসরাইলকে খেলতে দেওয়া ইত্যাদি। তবে এগুলো একটু একপাশে সরিয়ে রাখুন। বিশ্বকাপ সত্যিই একটি অনন্য ক্রীড়া আয়োজন, কারণ এটি মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসে। এটি মানুষের মধ্যে যে গর্ব ও আনন্দ নিয়ে আসে, তা আমি দেখতে পাচ্ছি।

স্টেডিয়ামে ফিলিস্তিনের পতাকা দেখে মানুষ কী বার্তা গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে দ্রেইদি বলেন, এটি মূলত সমতা ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা।

তিনি বলেন, আমি শুধু সবাইকে জানাতে চাই যে, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের মতো ফিলিস্তিনের পতাকাও স্টেডিয়ামে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। আমরা আমাদের জার্সি পরতে পারি, আমাদের পতাকা উঁচুতে ওড়াতে পারি এবং এর জন্য গর্ববোধ করতে পারি। আমি এটা জেনেই মাঠে গিয়েছিলাম।

মোরারের কাছে এই টুর্নামেন্টে উপস্থিত থাকাটা কেবল ফুটবল দেখার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক সময়ে সেখানে উপস্থিত থাকাটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের বড় স্টেডিয়াম, আর সেটি ফিলিস্তিন, জর্ডান এবং আলজেরিয়ার পতাকা ও কেফিয়াহ দিয়ে ভরা। কেবল খেলা নয়, ফিলিস্তিনি হিসেবে আমাদের নিজেদের জন্য এই সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ নিজ চোখে দেখাটা আমার কাছে খুব জরুরি ছিল।

তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা বারবার তার কাছে এসে সংহতি জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনের পতাকাটি ধরে দেখতে চেয়েছেন এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা যেখানেই গেছি, মানুষ পতাকাটিকে সাদরে গ্রহণ করেছে। আমার মনে হয়, গাজার গণহত্যার কারণেই মানুষের মধ্যে এমন অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। আমি যা অনুভব করেছি এবং দেখেছি তা হলো, মানুষ সত্যিকার অর্থেই ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে। দিন শেষে এটি মানুষের সংগ্রাম ও মুক্তিরই লড়াই।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension