
কই গো! প্যাকেটটা দাও। বললেন, আনোয়ার সাহেব।
স্ত্রী লাবণ্য হাসতে হাসতে প্যাকেটটি দিয়ে বলল, আজ মাসের শেষ দিন। মনে আছে তো তোমার? প্রতি মাসের শেষ দিনে আনোয়ার সাহেব পরিবারের জন্য একটু ভালো বাজার করেন। আনোয়ার সাহেব একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি যে বেতন পান তা দিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে কোনও রকম দিন চলে যায়। একটু অভাব-অনটন থাকলেও সুখে-শান্তিতে থাকেন তারা। কোনো উচ্চভিলাষ জীবন যাপন পছন্দ করেন না। । তিনি সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী।
স্ত্রী লাবণ্য তারই সমমনের। তিনি লাবণ্যের হাতে বেতনের সব টাকা তুলে দেন। লাবণ্য খুব হিসাব করে সংসার চালান। এই টাকার থেকেই একটু একটু করে বাঁচিয়ে মাস শেষে একটা ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন।
লাবণ্য এ মাসে বাড়তি পাঁচশ’ টাকা আনোয়ার সাহেবের হাতে দেন। আনোয়ার সাহেব টাকাটি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে স্ত্রীর দিকে চেয়ে থাকেন। গত মাসে বাজারে জিনিসের দাম দ্বিগুণ হারে বেড়েছে তা লাবণ্যকে বলা হয়নি। তাছাড়া দুশ’ টাকা তেলের দাম দোকানে বাকি রেখেছিলেন। এই টাকা শোধ করে তিনি কী ভালো বাজার করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। নিজে নিজে বিড়বিড় করে বলেন, থাক্ বাজারে যেয়ে দেখি কী হয়।
বাজারে গিয়ে তিনি যে জিনিসের দামই জিজ্ঞেস করেন, দাম শুনে হতভম্ব হয়ে যান। কী করে তিনি আজ তার সন্তান, স্ত্রীর মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দেবেন! ওই দিনের সুখটুকুই যেন আনোয়ার সাহেবের বড় প্রাপ্তি। একটা অন্যরকম খুশির ঝিলিক ফুটে ওঠে সবার মুখে।
এই দিনটার জন্যই তারা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানি না আদৌ আর ভালো খাবার মুখে তুলে দিতে পারব কিনা। কতটা দিন অপেক্ষা করে এই সময়টার জন্য। ভাবতে ভাবতে তার চোখে জল আসে। বারবার স্ত্রী ও সন্তানের হাসিমাখা মুখের ছবি ভেসে আসে। আনোয়ার সাহেব বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, হায়রে খুশি, হায়রে দিন! প্রয়োজনীয় জিনিসই যেখানে কেনা যাচ্ছে না সেখানে আবার ভালো খাবার, ভালো বাজার! সবই অমাদের কপাল। এই বলেই লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
সামান্য প্রয়োজনীয় বাজার নিয়ে তিনি আনমনে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকেন। হঠাৎ আত্মঘাতী ট্রাক এসে তাকে ধাক্কা দেয়। ছিটকে পড়েন তিনি রাস্তার ওপর। ততক্ষণে খাঁচা থেকে প্রাণ পাখিটা উড়াল দেয় অচিন দেশে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে বাজার। রক্তাক্ত নিথর দেহের চারিপাশে সাক্ষী হয়ে পড়ে থাকে আলু, ডাল, লবণ, তেল। অগ্নিমূল্যে পুড়তে থাকে লাবণ্যর কপাল।



