ভারত

খালেদা থেকে মমতা কেউ স্থান দেয়নি, বনবাস কাটিয়ে ফিরতে চান নির্বাসিতা

রূপসী বাংলা কলকাতা ডেস্ক: তিনি নির্বাসিত। তাঁর কথায় তিনি মৌলবাদের শিকার। বাংলা তাঁকে স্থান দেয়নি। তবু তিনি বাংলায় কাছে থাকতে চান। ফিরতে চান। নিজের দেশে। শুধুই বাংলাকে ভালোবেসে। বাংলা’দেশ’-কে ভালোবেসে। মনে নেই কোনও দ্বেষ। আর এভাবেই থাকতে বাংলার কাছে। তিনি তসলিমা নাসরিন।

দুই বার বনবাসে মিলিয়ে ২৪টি বছর কেটে গিয়েছে পরবাসে। তবু বাংলাকে তিনি আঁকড়ে রয়েছেন বুকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এভাবেই তাঁর বাংলার প্রতি টান ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন , “আজ ২৪ বছর আমি নির্বাসিত। দেশে আমাকে প্রবেশ করতে দেয় না দেশের কোনও সরকারই। আমি অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করতে চাই না। আমাদের নির্লজ্জ সরকারেরা কিন্তু অবৈধভাবে আমাকে দেশে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ২৪ বছর আগে খালেদা জিয়ার সরকার আমাকে দেশের বাইরে বের করে দিয়েছিল কারণ মৌলবাদিরা দেশ জুড়ে তাণ্ডব করছিল। দেশের অবস্থা শান্ত হলে এক দু’মাস পর দেশে ফিরতে পারবো, এরকমই বলা হয়েছিল।” ২৪ বছর শেষ হয়েছে কিন্তু অপেক্ষার সেই এক দু’মাস এখনও শেষ হয়নি ‘নির্বাসিত’ লেখিকার। আজও তাঁকে নিজের দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। এমনটাই লিখেছেন তিনি।

তিনি ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে লিখেছেন, “পৃথিবীর অনেক প্রতিবাদী লেখক শিল্পীকেই নির্বাসন দিয়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার, কিন্তু সরকার বদল হলে সেই লেখক শিল্পীরা ফিরতে পেরেছেন নিজ বাসভূমে। কিন্তু আমার বেলায় সেটিও হয় না। সরকার বদল হয়, আমার ভাগ্য বদল হয় না। আসলে কোনও সরকারই সত্যবাদী, প্রতিবাদী বা আদর্শবাদী লেখকদের বাক স্বাধীনতায় বা মত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে না, সে কারণেই সমস্যা।”

তিনি তাঁর মনের ব্যথা প্রকাশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে নিয়েও। শিল্প, শিল্পী নিয়ে এতো কথা বলেন তিনি। কিন্তু তসলিমাকে তিনি ফিরিয়ে নেন নি। লেখিকা লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গও বাংলাদেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। এক সরকার আমাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছে, নতুন সরকার এসে আগের সরকারের কিছু না মানলেও আমার নির্বাসনদণ্ড মেনে নিয়েছে। আমার বেলায় নিষেধাজ্ঞাগুলো অদ্ভুতভাবে সংক্রামক।”

তাঁর প্রতি এত দ্বেষ সবার তবু তিনি বাংলায় ফিরতে চান। কিন্তু কেন? তিনি লিখেছেন, “দুই বাংলা থেকে নির্বাসিত হয়েও আমি ইউরোপে ফিরি না, আমেরিকায় বাস করি না। বাংলার কাছাকাছি কোথাও পড়ে থাকি। অনেকটা বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকার মতো। কেন বাংলার প্রতি আমার এত আকর্ষণ? বাংলার মাটি,হাওয়া, গাছপালা নদীনালা বাড়িঘরের জন্যই কি এমন উতলা আমি? এসব তো অনেক দেশেই আছে,তারপরও কেন কোথাও আমার মন ভরে না! এ নিয়ে আমি প্রচুর ভেবেছি। উত্তর খুঁজেছি বছরের পর বছর। লক্ষ করেছি, বিদেশ বিভুঁয়ে এই ভাষাটি কোথাও শুনলে আমি থমকে দাঁড়িয়ে ভাষাটি শুনি, এই ভাষাটি কোথাও লেখা আছে দেখলে পড়ে দেখি, এমনকী ছুঁয়েও দেখি। ভাষাটির কাছ থেকে দূরে সরতে আমার মোটেও ইচ্ছে করে না। আমি অনুভব করি আমার মা আমাকে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে, আমার বাবা আমাকে দুহাতে বুকের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, অনুভব করি ভাই বোনের সঙ্গে মাঠ জুড়ে হৈ চৈ করে গোল্লাছুট খেলছি। এই অনুভবটি আমাকে সুখ দেয়, অদ্ভুত এক নিরাপত্তা দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে আমি বুঝেছি, আসলে ভৌগলিক কোনও অঞ্চল আমার দেশ নয়, আমার দেশের নাম বাংলাদেশ নয়, আমার দেশের নাম বাংলা ভাষা। ভাষাটিই আমার দেশ। এই ভাষাটি যদি বাংলাদেশে কেউ না বলে, তাহলে ওদেশে ফিরলেও আমার মনে হবে না ও দেশ আমার দেশ।”

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension