
খুলছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে, এটি আনন্দের খবর। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, যখন তাদের বড় একটি অংশই বেকার অবস্থায় থাকে। দেশের ভবিষ্যতের জন্য এ অবস্থা অত্যন্ত ভীতিকর। শিক্ষা পদ্ধতি এমন হওয়া জরুরি যেখানে, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা বা ভাষাগত যোগাযোগে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন সম্ভব হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে মত দিয়েছে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। সারাদেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরু করা যাবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত বছরের মার্চ থেকে দেশের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিপাঠদান বন্ধ রয়েছে। ছুটি দফায় দফায় বাড়িয়ে তা সবশেষ ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। এরপর আর তা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। বড় কোনো সমস্যা তৈরি না হলে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শ্রেণি পাঠদান শুরু হচ্ছে। এর মধ্যে মাদ্রাসা ও কারিগরি সব অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে আমরা অভিনন্দন জানাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পরও দৈনিক বাধ্যমূলক প্রতিবেদন পাঠানোর একটি বিষয় রয়েছে। এটা কঠোরভাবে মনিটরিং করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এটা সত্য, দেশে করোনা সংক্রমণের হার কমতে শুরু করেছে। আগামী দিনে আরও কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যদি কোনো ক্লাসে ৩০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকে তাহলে দুই শিফটে বা দুদিনে ভাগ করে খোলা যেতে পারে। প্রথমে বড়দের এবং পরে ছোটদের অর্থ প্রাইমারি লেভেলের ক্লাস খোলার কথা আলোচনা হয়েছে। তবে অবশ্যই কর্তৃপক্ষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে এবং সেজন্য যা যা দরকার হবে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে করোনা সংক্রমণ তীব্র হলে এবং মৃতু্যহার বাড়তে থাকলে দফায় দফায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়ে। সময়মতো পরীক্ষা না হওয়ায় একদিকে সেশনজট, অন্যদিকে আর্থিক চাপেও পড়ে যায় বহু শিক্ষার্থী। এটা সত্য, যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তারা টিউশনি, খন্ডকালীন চাকরিসহ নানা কাজ করে অনেকে পড়াশোনার ব্যয়ভার নির্বাহ করত। আবার কেউ কেউ নিজ পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করত। এই শিক্ষার্থীদের বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে এসে মেস ভাড়া করে থাকতে শুরু করে। এতে তাদের বিপুল পরিমাণে আর্থিক খরচ হচ্ছে। পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক নানা জটিলতাও বাড়ছে। ফলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থায় আবাসিক হল খোলার দাবিতে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। তাতেও সমস্যার সমাধান হয় না। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ও খুলবে। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারের বিষয়টিও সরকারকে ভাবতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বেকারত্ব কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের চিত্র অনেকটাই বিপরীত। এ দেশে শিক্ষিতের বেকার হওয়ার আশঙ্কা অশিক্ষিতদের তুলনায় বেশি। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে, এটি আনন্দের খবর। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, যখন তাদের বড় একটি অংশই বেকার অবস্থায় থাকে। দেশের ভবিষ্যতের জন্য এ অবস্থা অত্যন্ত ভীতিকর। শিক্ষা পদ্ধতি এমন হওয়া জরুরি যেখানে, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা বা ভাষাগত যোগাযোগে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন সম্ভব হবে। মনে রাখা দরকার, দেশের মেরুদন্ড হলো শিক্ষা তথা শিক্ষিত জনশক্তি। এদের দমিয়ে রাখলে, কর্মহীন ও সুযোগবঞ্চিত রাখলে দেশের মেরুদন্ড দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই সময়োপযোগী শিক্ষা পদ্ধতির প্রসার ঘটিয়ে বেকারত্ব কমাতে সংশ্লিষ্টরা কার্যকর উদ্যোগ নেবে- এটাই প্রত্যাশা। মনে রাখতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিলেই হবে না, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
