
গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন।
পর্ব চারের তিন
কিয়ের্কেগার্ডও বুদ্ধের মত তত্ত্ববিদ্যায় উৎসাহী ছিলেন না এবং তাঁরও মূল লক্ষ্য মানুষের নৈতিক দিকটা। তিনিও বুদ্ধের মতো বলেছেন, কামনা-বাসনাই দু:খ আনে। তবে তাঁর এ ব্যাখ্যা ঈশ্বরকেন্দ্রিক, কিন্তু বুদ্ধের ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। বুদ্ধের মতো কিয়ের্কেগার্ড বাসনার ঊর্ধ্বে যেতে চান না। কারণ তিনি মনে করেন, বাসনা ত্যাগ বৌদ্ধিক আত্মহত্যার সামিল। কামনা মূলত: দুই প্রকারের : স্বার্থপর কামনা এবং পরমার্থ কামনা। স্বার্থপর কামনাকে বাদ না দিলে কিয়ের্কেগার্ডের কাম্য মুক্তি (salvation) লাভ সম্ভব নয়। তাই তাঁর চেয়ে বুদ্ধের বত্তব্যই অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রত্যকটি দু:খের জন্য ব্যক্তি নিজেই দায়ী, অন্য কেউ নয়।আরব দেশের এক কবি বলেছিলেন, ‘মারা যাওয়ার পর তাঁর কবরের ওপর যেন লিখে রাখা হয় যে, তাঁর পাপের জন্য তাঁর বাপ দায়ী। কারণ তাঁর বাপ না থাকলে তাঁর জন্ম হতো না এবং জন্ম না হলে তিনি পাপ করতেন না। কিন্তু বুদ্ধ কখনোই উদোরপিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাননি। তাঁর মতে, আমার দু:খ আমারই সৃষ্টি। শুধু দু:খ নয়, এমনকি আমাদের জন্মের জন্যও আমরাই দায়ী। জন্মলাভের বাসনা থেকেই আমাদের জন্ম হয়েছে।
প্রয়োগবাদ (Pragmatism ) সম্প্রতিক কালের আর একটি দর্শন। এ দর্শনের মূল বক্তব্য হলো, যা কাজে লাগে এবং যা প্রয়োজনীয় ত-ই সত্য, তা-ই আলোচ্য ও বিবেচ্য হওয়া উচিত। সম্ভবত গৌতম বুদ্ধই প্রয়োগবাদেরও পুরোধা। মালুক্য পুত্রের তত্ত্ববিদ্যা বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, কেউ যদি তীর বিদ্ধ হয় তাহলে কী তার প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত? যেহেতু সে কষ্ট পাচ্ছে, সেহেতু সে প্রথমে তীরটা খুলবে। এর আগে সে নিশ্চয়ই ভাববে না, তীরটা কী গতিতে এল, তীরটা কে মারল, তীরটা কীসের তৈরী। তাই আমরা যেহেতু দু:খের সাগরে ভাসছি, আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত এই দু:খের হাত থেকে কিভাবে বাঁচা যায় তার চেষ্টা করা। বুদ্ধের মতে, আমাদের কাছে এর চেয়ে বড় সত্য আর নেই।
–কাজী নুরূল ইসলাম।
ছবিঃ স্পিরিচুয়াল রে (Image by Spiritual Ray)



