
গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন।
পর্ব চারের চার
সমকালীন দর্শনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ (Logical positivism) । এ মত অনুসারে principle of verification বা পরখনীতি হচ্ছে সত্যের মানদন্ড। যে বাক্যকে পরখ করা যায় না তা অর্থহীন। তাঁদের মতে, তত্ত্ববিদ্যাবিষয়ক অবধারণ এই পরখনীতির আওতায় পড়ে না। তাই এরা অর্থহীন। গৌতম বুদ্ধ পরখনীতির উল্লেখ না করলেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তত্ত্ববিদ্যায় আলোচ্য বক্তব্য প্রমাণও করা যায় না আবার অপ্রমাণও করা যায় না। গৌতম বুদ্ধ সর্বপ্রকার চরম মত ও পথের বিরোধী ছিলেন। সম্ভবত এটা তাঁর ব্যক্তি জীবনেরই অভিজ্ঞতার ফল। তিনি মধ্যমা প্রতিপদ বা মধ্যম পথকেই উত্তম পথ বলে স্বীকার করেছেন।
অ্যারিস্টটল যে Golden Mean এর কথা বলেছেন তা তাঁর ২০০বছর আগে গৌতম বুদ্ধই বলে গেছেন। বস্তুত বুদ্ধের মধ্যমা প্রতিপদ ও অ্যারিস্টটলের Golden Mean এর মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করা কঠিন।
অনেক পন্ডিত ব্যক্তি বৌদ্ধধর্মকে হিন্দুধর্মের আর একটি শাখা বলে মনে করেন। কেউ আবার মনে করেন, বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই হিন্দুধর্ম পূণর্তা লাভ করেছে। যেমন, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শিকাগো বক্তৃতায় বলেছেন, ’ Buddhism is the fulfillment of Hinduism.’ অনেকে আবার বৌদ্ধধর্মের সাথে খ্রীষ্ট ধর্মের মিল খুজেঁ পেয়ে এদের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্বন্ধ আছে কিনা তা খুঁজতে চান। ড. বেণী মাধব বড়ুয়া বলেন, ‘ইহা নিশ্চিত যে, শুধু বাইবেলের পূরাকল্পে বর্ণিত প্রফেটগণের জীবন ও বাণীর ঐতিহাসিক ধারা দ্বারা যীশুখ্রীষ্টের জীবন ও বাণী ব্যাখ্যাত হয় না। ঐ ধারার সহিত অপর এক ধারার মণিকাঞ্চন সহযোগ আবশ্যক। অপর ধারা খুঁজিতে গেলে বাধ্য হইয়া ভারতের আর্য সংষ্কৃতির বৌদ্ধ ধারায় আশ্রয় লইতে হয়। বুদ্ধ ব্যবহৃত উপমাগুলি এবং যিশু খ্রীষ্টের প্যারাবেলস –এর মধ্যে সাদৃশ্য এত ঘনিষ্ঠ যে, তাহা শুধু chance coincidence বলে যেন
সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। যেমন বুদ্ধের উপমাগুলি ভারতের পূর্ববর্তী সাহিত্যে পাওয়া যায় না তেমন যীশুর প্যারাবেলস বাইবেলের পূরাভাগে পাওয়া যায় না। ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার সংঙ্গে সম্পূর্ণ একমত না হয়েও অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা যায়, গৌতম বুদ্ধ ও যীশু খ্রিষ্টের শিক্ষার মিল আমাদের চিন্তাকে নাড়া না দিয়ে পারে না। আমার জানা মতে পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এমন কোন মনীষীর আবির্ভাব ঘটেনি যিনি গৌতম বুদ্ধের মতো একাধারে নৈতিক শিক্ষার প্রবক্তা ও সমাজ সংষ্কারক এবং যার দর্শনকে অস্তিত্ববাদ, প্রয়োগবাদ ও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সব ধর্মের শিক্ষিত প্রবক্তাদের কাছে তিনি সমাদৃত এবং এ বিষয়ে তিনি সত্যিই অনন্য। রাজত্বের লোভ ত্যাগ করে তিনি সত্যের সন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। আজ তাই কোটি কোটি মানুষের হৃদয়সিংহাসনে তিনি সমাসীন।
–কাজী নুরূল ইসলাম।
ছবিঃ জেজে (Image by JJ Studios)



