সম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরেই দ্বন্দ্ব

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন কমিশনার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন। কমিশনার মাহবুব তালুকদার মনে করছেন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই আর তার এই কথাকে অসত্য আখ্যা দিয়ে সিইসি বলেছেন, তিনি মনে করেন না যে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। বাগযুদ্ধ এখানেই থেমে যায় নি। মাহবুব তালুকদার সিইসির বক্তব্যর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, সিইসি তার বক্তব্যে একজন নির্বাচন কমিশনারের অস্তিত্বে আঘাত করেছেন।
 
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে সিইসি ও একজন কমিশনারের মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তা একদিকে যেমন উদ্বেগের, অন্যদিকে তেমনি হতাশাজনক। বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে সিইসি ও একজন কমিশনার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। কথা হচ্ছে, সত্য একটাই। একই বিষয়ে কখনও দুটা সত্য থাকতে পারে না। তাই যদি হয়, তাহলে কেন এই মতবিরোধ? এই মতবিরোধ জনগণ তথা নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে? এতে কি সার্বিকভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থায় ভাটা পড়ছে না?
 
বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল সার্চ কমিটির মধ্য দিয়ে এবং তা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন কমিশন সব ধরনের রাগ-অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবতার প্রতি আন্তরিক থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতির মূল্যায়নে খোদ কমিশনের ভেতরেই দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে! এ অবস্থায় আর মাত্র কয়েকদিন পর যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, তার আগে আরও কোনও অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বৈকি।
 
দেশের বিশিষ্টজনরা ইতোমধ্যেই পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সবকিছু ছাপিয়ে এটাই সত্য যে, নির্বাচনে এখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয় নি। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে খবর বেরোচ্ছে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের নির্বিঘ্নে প্রচার-প্রচারণা চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। এসব খবরের সত্যতা পাওয়া যায় নির্বাচনী এলাকাগুলোর পোস্টারের দিকে তাকালে। দেশের অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের পোস্টার নেই বললেই চলে। এমন অভিযোগও রয়েছে, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সরকারি দলের প্রার্থীর হয়ে কাজ করছে। বস্তুত প্রায় প্রতিদিনই নির্বাচন কমিশনের কাছে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে হামলা ও গ্রেফতারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় সিইসির বক্তব্যকে গ্রহণ করতে নারাজ বিশিষ্টজনদের অনেকেই। বস্তুত তফসিল ঘোষণার পর জনপ্রশাসন ও আইশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে আসে। অথচ আমরা দেখছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে নির্বাচন কমিশন। বলতেই হবে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে।
 
আমরা নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য কমিশনারের মধ্যে পরিস্থিতির বাস্তবতা নিয়ে কোনও মতবিরোধ দেখতে চাই না। কমিশনের সবারই উচিত সত্যকে সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা। নির্বাচন কমিশন দলীয় কোনও প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি সাংবিধানিক সংস্থা। সাংবিধানিক সংস্থার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব এর সব সদস্যেরই। কমিশনের সদস্যরা বড় ধরনের কোনও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়বেন না, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। কারণ সেক্ষেত্রে আসন্ন নির্বাচনটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার কাজটি বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে শুধু নয়, দেশে এমন এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যা জাতির জন্য মোটেও সুখকর হবে না।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension