
গ্রামের পর গ্রাম ছারখার
ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম চোগাথে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের একমাত্র ভরসা স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তার জিতু। গুজরাটের চোগাথ গ্রামে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষের বসবাস। গত সপ্তাহেও ওই গ্রামে অন্তত ৬০০ মানুষ করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও তাদের চিকিৎসার জন্য কোনো ব্যবস্থা করছে না জেলা কর্র্তৃপক্ষ। এ অবস্থা শুধু চোগাথের নয়, ভারতের অধিকাংশ গ্রামেরই চিত্র এক।
করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের শহরগুলো আগেই সংক্রমিত হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে গ্রামগুলোতে। শহরাঞ্চলে যেখানে মানুষ লাইন দিয়েও হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না, সেখানে গ্রামের অবস্থা রীতিমতো ভীতিকর। গ্রামগুলোতে এমনিতেই থাকে না পর্যাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ। করোনার মধ্যে অনেক গ্রামে গত ছয় মাস ধরে কোনো চিকিৎসা উপকরণও পৌঁছায় নি। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের গ্রামগুলোতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেদিকে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নজর নেই বললেই চলে।
চোগাথের আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিকটবর্তী শহরগুলো গিয়েছিলেন হাসপাতালে ভর্তি হতে। কিন্তু সেখানেও তারা ব্যর্থ হন। স্থানীয় বাসিন্দা দিনেশ মাকওয়ানা সিএনএনকে জানান, তিনি তার কভিড আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে গুজরাটের চারটি শহরের হাসপাতালে গিয়েছিলেন ভর্তি করাতে। কিন্তু হাসপাতালগুলো আগে থেকেই পরিপূর্ণ ছিল। উপায় না দেখে বাবাকে গ্রামে ফিরিয়ে আনেন। তার ভাষ্যমতে, ‘দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে গ্রামের আমরা সবাই ভীত। আমিও ভয় পাচ্ছি। আমার বাবা মারাও যেতে পারে এ অবস্থায়। গ্রামের অনেককেই আমি চিনি যারা করোনায় মারা গেছেন।’ মাকওয়ানা যখন সিএনএনের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন তার কভিডে আক্রান্ত মা শ্বাস নিতে পারছিলেন না।
নরেন্দ্র মোদির সরকার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে অক্সিজেন পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। শুধু অক্সিজেনই নয়, গ্রামগুলোতে মহামারীর মধ্যে নেই কোনো কাজ। এমন অবস্থায় গ্রামবাসীদের খাদ্য সংস্থানের জন্যও সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। বেসরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সামান্য।
চোগাথের ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা গিরিজাশঙ্কর একাই করোনায় মৃতদের সৎকারের কাজ করে যাচ্ছেন। বনাঞ্চল থেকে ট্রাক্টরবোঝাই করে কাঠ এনে গ্রামের পেছনের অংশে রাখছেন। সাধারণত গ্রামটিতে বছরে প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু গত এক মাসেই সেখানে ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের প্রত্যেকের নাম একে একে বলতে পারেন গিরিজাশঙ্কর। তার মতে, কিছু পরিবার তাদের একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন কভিডের সংক্রমণে। গিরিজাশঙ্করের ভাষ্যে, ‘গ্রাম এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো ত্রাণ আসে নি। কোনো ডাক্তারও আসে নি। এখানে কেউ আসেও না, যায়ও না। গ্রামে কোনো সরকারি কর্মকর্তাও নেই।’
কিছু বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কমিটির সদস্যরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। এর মানে সামনে আরও মানুষ আক্রান্ত ও মারা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভারতের করোনার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, এই ভ্যারিয়েন্ট গোটা বিশ্বের জন্যই হুমকিস্বরূপ।❐



