আঞ্চলিকবাংলাদেশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আজ থেকে সাতদিন ‘সর্বাত্মক লকডাউন’

দেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরীক্ষা অনুপাতে করোনা শনাক্তের হার বিপজ্জনকভাবে বেড়ে ৫৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। যেখানে গতকাল সোমবার দেশে গড়ে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা রোগী শনাক্তের হার দেশের গড় শনাক্ত হারের প্রায় সাত গুণ। জেলাটিতে গত ১৩ মে ৩২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১১ জনের করোনা শনাক্ত হয়, পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল প্রায় ৩৪ শতাংশ। আর সর্বশেষ গত রবিবার ৯৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৫২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। ওইদিন পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ।

এই জেলায় করোনায় মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনভাবে বেড়েছে। দেশে গত বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনার প্রথম ঢেউয়ে এক বছরে জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৪ জন। সেখানে দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর চলতি বছরের মার্চ থেকে মাত্র তিন মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট (ধরন) ছড়িয়ে পড়া রোধে আজ মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে আগামী সাত দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার পর গতকাল সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে লকডাউনের এই ঘোষণা দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ।

লকডাউন চলাকালে সব দোকানপাট ও যান চলাচল বন্ধ থাকবে। রাজশাহী ও নওগাঁ থেকে কোনো যানবাহন চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করতে পারবে না, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও কোনো যানবাহন জেলার বাইরে যাবে না। তবে রোগী ও অন্য জরুরি সেবাদানকারীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে না।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতোই দিনাজপুর, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের সীমান্তবর্তী আরও কয়েকটি জেলা থেকেও হঠাৎই করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হারের তথ্য মিলেছে।

শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, রাজশাহীতেও সংক্রমণ বেড়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত দুই সপ্তাহ আগেও এত বেশি রোগী ছিল না। এখন ওই হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য একটি ইউনিট আলাদা করে ফেলতে হয়েছে। সেখানে ৬০ শতাংশ রোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা। চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটা বর্ডারের মতো আছে। সেখান দিয়ে লোকজন আসা-যাওয়া করে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ করে সংক্রমণ বৃদ্ধির কোনো কারণ এখনো বের করতে পারে নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখান (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) থেকে যারা গিয়েছে, তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, নাকি বর্ডারের মাধ্যমে হলো- সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। খুলনাতেও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নন-বর্ডার যে জেলা, যেমন বগুড়ায় বৃদ্ধি পায় নি। তাই নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না, বৃদ্ধির কারণটা কী।

সীমান্ত পাহারায় থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা বলছেন, তারা সীমান্তে রাতদিন পাহারায় থাকছেন। মানুষ যাতে অবৈধভাবে পারাপার হতে না পারে সেদিকে তারা কঠোর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সীমান্তের বাসিন্দাদের ভাষ্য, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দালাল চক্র ঠিকই চোরাপথে মানুষ আসা-যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

গতকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলায় ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ। তিনি বলেন, ‘গেল এক সপ্তাহ ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা সংক্রমণের হার শতকরা ৫০ ভাগেরও অধিক। যা জাতীয় সংক্রমণের ৫ গুণেরও বেশি।’

 

জেলা প্রশাসন ঘোষিত সর্বাত্মক লকডাউনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে রোগী, জরুরি পণ্য ও সেবা পরিবহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন বন্ধ থাকবে। রাজশাহী ও নওগাঁ থেকে সব ধরনের যানবাহন চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করতে পারবে না। সব বাজারের সব ধরনের দোকানপাট ও সাপ্তাহিক হাট বন্ধ থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, ফার্মেসি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান খোলা থাকবে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারবে না এবং জনসমাগম করতে পারবে না।

প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, লকডাউন চলাকালে আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের বাজার ও আড়ত পৃথক পৃথক জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে আমের বেচাকেনা করা যাবে। এ ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের আমবাজার বসানো হবে স্টেডিয়ামে। শিবগঞ্জে ইউনিয়নপর্যায়ে এবং রহনপুরে সরকারি খোলা জায়গায় আম বেচাকেনা হবে। লকডাউনে মোট ১১টি বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়। জেলাজুড়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির মুখে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে বাজারে করোনা পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলা থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য যে নমুনা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে তাতে অর্ধেকেরই বেশি মানুষ করোনা শনাক্ত হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যে পরিমাণ করোনা রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে তার অর্ধেকই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ও শিবগঞ্জ উপজেলার।

তিনি আরও জানান, গত চার দিনে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৬৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে একজন করোনা রোগী রয়েছেন। বাকি ৬৪ জনকে শিবগঞ্জের ডাকবাংলোসহ কয়েকটি হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। আর আক্রান্ত ভারতফেরত ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে।।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension