আন্তর্জাতিকপ্রধান খবর

তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন গাজার ৪০% গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী

গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গাজার ৪০ শতাংশেরও বেশি গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন।

গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গাজার ৪০ শতাংশেরও বেশি গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন। এ সংকট শুধু মায়েদের নয়, তাদের অনাগত ও নবজাতক সন্তানের জীবনকেও চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে একজন অপরিণত বা কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি সাত নবজাতকের একজনকে গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতার কারণে জরুরি নিওনেটাল কেয়ারে (নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র) নিতে হচ্ছে। মায়েরা নিজেরাই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছেন বলে তাদের শরীরে পর্যাপ্ত বুকের দুধ তৈরি হচ্ছে না, ফলে শিশুদের টিকে থাকার সম্ভাবনা আরো কমে যাচ্ছে। অনেক মা বাধ্য হচ্ছেন একাধিক সন্তানের মধ্যে কার মুখে খাবার তুলে দেবেন, আর কাকে দেবেন না—এমন মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে।

গাজার নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের শিশু হাসপাতালের পরিচালক ড. আহমেদ আল-ফাররা আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে ১২০ জন অপুষ্টিতে ভোগা শিশু চিকিৎসাধীন। এ বিপুলসংখ্যক রোগীকে সামাল দিতে গাজায় অন্তত ১০টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন। গাজার অপুষ্টিতে আক্রান্ত এসব শিশু যদি বেঁচেও যায়, তবু সারা জীবন তারা এ অপুষ্টির পরিণতি বহন করবে।’

এমনকি উদ্বাস্তু শিবিরগুলোয় হাজার হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, যাদের কাছে চিকিৎসা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান এ চিকিৎসক।

সংকট মোকাবেলায় ভ্রাম্যমাণ মাতৃসদন ইউনিট চালু করেছে জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী বিভিন্ন সংস্থা। ধাত্রীদের সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি জরুরি ওষুধ ও কিট সরবরাহ করছে তারা। তবে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অবিরাম ইসরায়েলি হামলা এবং সহায়তা কর্মীদের ওপর আক্রমণের কারণে এসব প্রচেষ্টা বারবার ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিনিধি ড্যান স্টুয়ার্ট জানান, দুর্ভিক্ষ নিয়ে বিশ্বনেতাদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের পুষ্টি ক্লিনিকের প্রতিটি কক্ষ অপুষ্টিতে ভোগা মা ও শিশুতে ভরা। কিন্তু বাইরের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশু চিকিৎসাসেবাও ঠিকমতো নিতে পারছে না, যা আমাদের কর্মীদের জন্য এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।’

পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন না ঘটলে দেইর আল-বালাহর মতো এলাকাগুলোও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে পতিত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এদিকে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রথমবারের মতো গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে বলে ঘোষণা দেয়ায় বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, ক্ষুধার এ পরিস্থিতি গণহত্যারই নামান্তর।

টেলিগ্রামে দেয়া এক বিবৃতিতে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, স্বাস্থ্য খাতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের ধ্বংস এবং ব্যাপক হত্যাকাণ্ডও এ গণহত্যার অংশ। শত শত মানুষের জীবন বাঁচানো যেত, কিন্তু নানা সংকটের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। এখনো হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি এক বাস্তব পরীক্ষা—কেননা বিবৃতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার এ দুর্ভিক্ষ সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট এবং প্রতিরোধযোগ্য ছিল। ইসরায়েলকে সরাসরি ‘যুদ্ধে দুর্ভিক্ষকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার’ অভিযোগ করেছে তারা।

অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬২ হাজার ৬২২ জন নিহত এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৭৩ জন আহত হয়েছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু ২৪ ঘণ্টায়ই নিহত হয়েছে ৬১ জন এবং আহত হয়েছেন ৩০৮ জন। এছাড়া খাদ্যসহায়তা নিতে গিয়ে নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬-এ, আর আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৩০৮ জনেরও বেশি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension