নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

নিউ ইয়র্কে মুখে মুখে মামদানিপত্নী, কেউ বলছেন ফার্স্ট লেডি, কারও কাছে স্টাইলিশ আইকন

নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির স্টাইলিশ স্ত্রী রামা দুয়াজি। শহরটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফার্স্ট লেডি হতে যাচ্ছেন সিরীয় বংশোদ্ভূত ফ্যাশনসচেতন এই নারী। মঙ্গলবার মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রামা। নিত্যনতুন ফ্যাশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সবার নজর কাড়েন তিনি। নিউইয়র্কের তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে এখন তারই নাম। কেউ তাকে ফার্স্ট লেডি বলে অভিহিত করছেন, কেউ আবার বলছেন ‘স্টাইলিশ আইকন’। এপি।

২৮ বছর বয়সি রামা একজন সিরিয়ান-আমেরিকান শিল্পী ও অ্যানিমেটর। তার শিল্পকর্মে নারী অধিকার ও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির বিষয়গুলো ফুটে ওঠে। তার কাজের মূল লক্ষ্য হলো নিজের অভিজ্ঞতা এবং যেসব বিষয় তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করা। জেন-জি প্রজন্মের এক নতুন, সচেতন ও সক্রিয় মুখ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছেন তিনি। মামদানির নির্বাচনি প্রচারে তিনি নীরব, অথচ প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন।

সিরীয় শিকড় থেকে নিউইয়র্কের শিল্পজীবন : ১৯৯৭ সালের ৩০ জুন টেক্সাসের হিউস্টনে সিরীয় মুসলিম মা-বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন রামা। তার বাবা একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং মা চিকিৎসক। নয় বছর বয়সে পরিবারসহ দুবাইয়ে চলে যাওয়ার পর সেখানেই শুরু হয় স্কুলজীবন। স্কুলজীবনে আঁকাআঁকির মাধ্যমে তিনি নিজের সৃষ্টিশীল আগ্রহকে লালন করতে থাকেন। রামা ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব দ্য আর্টস থেকে যোগাযোগ শিল্পে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২১ সালে তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন। ২০২৪ সালে স্কুল অব ভিজুয়াল আর্টস থেকে ইলাস্ট্রেশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ডেটিং অ্যাপে গড়ে ওঠে সম্পর্ক : রামা দুয়াজি ২০২১ সালে ডেটিং অ্যাপ হিঞ্জে মামদানির সঙ্গে পরিচিত হন। তখন মামদানি ৩০ বছর বয়সি ও নিউইয়র্ক রাজ্যের অ্যাসেম্বলি সদস্য। তাদের সম্পর্ক শুরু হয় অভিন্ন প্রগতিশীল মূল্যবোধের ভিত্তিতে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বাগদান সম্পন্ন করেন তারা। দম্পতি বর্তমানে কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়ায় বসবাস করেন। তারা ব্যক্তিগত জীবন অনেকটাই গোপন রেখেছেন। নির্বাচনি প্রচারে রামাকে উদ্দেশ করে মামদানি প্রকাশ্যে বলেন, ‘রামা শুধু আমার স্ত্রী নন, তিনি এক অসাধারণ শিল্পী।’ এছাড়া নির্বাচনে জয়ের পর ভাষণে মামদানি বলেন, ‘এ মুহূর্তে ও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তার চেয়ে উপযুক্ত সঙ্গী আমি কল্পনা করতে পারি না।’

নির্বাচনে ভূমিকা, নীরব অথচ প্রভাবশালী : মামদানির মেয়র নির্বাচনের আগে আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চাননি রামা দুয়াজি। তিনি কোনো টেলিভিশন সাক্ষাৎকার বা যৌথ প্রচারণায় অংশ নেননি। তবে নির্বাচনের পেছনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি। বিশ্লেষকদের ধারণা, জোহরান মামদানির প্রচারণার ভিজুয়াল রূপায়ণ-লোগো, রঙের ব্যবহার (হলুদ, কমলা, নীল) ও টাইপোগ্রাফি-সবই রামার সৃজনশীল ভাবনা থেকে এসেছে। যা তরুণ ও বহুসাংস্কৃতিক ভোটারদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। অনেকে তাকে ‘মামদানির জয়ের অন্তর্নিহিত শক্তি’ বলে উল্লেখ করেন। তার ২ লাখ ৩৫ হাজার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর মাধ্যমে তিনি অভিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় ভোটারদের সক্রিয় করতে সক্ষম হন।

জেন-জি আইকনের উত্থান : নির্বাচনের পর থেকেই রামাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রবল আগ্রহ। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে গণমাধ্যম-সব ক্ষেত্রেই উঠে এসেছে তার নাম। ফোর্বস, গ্ল্যামার ইউকে, দি ইনডিপেনডেন্ট, এপি নিউজ, সিএনএন, টাইম ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাকে নিউইয়র্ক সিটির ‘প্রথম জেন-জেড ফার্স্ট লেডি’ হিসাবে অভিহিত করেছে। বেশকিছু সংবাদমাধ্যম আবার তার শিল্পীসত্তাকেই কেন্দ্রে রেখেছে। ২৮ বছর বয়সি রামার স্টাইল ইতোমধ্যে তরুণদের নজড় কেড়েছে। তিনি নেকলেস, রিং এবং লেয়ার্ড চেইন, বড় হুপ ইয়াররিংস পরতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে ক্যাজুয়াল আউটফিটের সঙ্গে প্রায়ই এসব পরতে দেখা যায় তাকে। নিউইয়র্ক সিটির জেন-জেড ফার্স্ট লেডির কালো রং বেশ পছন্দ। প্রায়ই তাকে কালো পোশাকে দেখা যায়। তার স্বামী মামদানির সঙ্গে প্রথম অফিশিয়াল উপস্থিতিতে তিনি একটি এলিগ্যান্ট এমব্রয়ডার্ড টপ পরেছিলেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে রামা দুয়াজি জেন-জি প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও ন্যায়বোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

নতুন দিগন্তের উন্মোচন : ফার্স্ট লেডি হিসাবে রামা দুয়াজি এমন এক মঞ্চ পাচ্ছেন, যেখানে সমাজসেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে পারে। তার পরিকল্পনার মধ্যে থাকতে পারে শিল্পী রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং তরুণ শিল্পীদের মেন্টরশিপ। নিজস্ব আন্তর্জাতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি নিউইয়র্কে এক নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলতে পারেন। মামদানির প্রশাসনের বিপুল বাজেট তাকে শিল্প ও মানবিক সহায়তামূলক কর্মসূচিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেবে।

তিনি ফিলিস্তিন সংহতি, শিল্পে বিনিয়োগ এবং শরণার্থী সহায়তার মতো বিষয়ে নীতিগত স্তরে প্রভাব ফেলতে পারেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ফেডারেল তহবিল নিয়ে রাজনৈতিক চাপও তৈরি হতে পারে।

আলোচনা-সমালোচায় স্টাইলিশ আইকন : এদিকে সমালোচকরা বলছেন, তার কর্মীসুলভ শিল্পকর্ম ফার্স্ট লেডির প্রথাগত আনুষ্ঠানিক ভূমিকার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অপরদিকে সমর্থকরা বলেন, তার ডায়াসপোরা অভিজ্ঞতা নিউইয়র্কের সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং শহরের আর্ট ও শরণার্থী সহায়তা কর্মসূচিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension