
পুরুষ সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক রিপোর্ট: হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলনকে যুগান্তকারী উল্লেখ করে নারী আন্দোলনাকরীরা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বলেন, অনেকে এই আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের উপর নিপীড়নের কথা যেমন বলছেন তেমনি অনেকে বলতে পারছেন না। এজন্য যে তারা নিপীড়নের শিকার হন নি তা ধরে নেওয়া উচিত না।
১৮ নভেম্বর রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে #মি টু মুভমেন্ট-বাংলাদেশ আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা এসব কথা বলেন। গত শুক্রবার ১৬ নভেম্বর এই সংগঠনের আয়োজনে #মি টু মুভমেন্টের সমর্থনে প্রথম মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলাম বলেছেন, ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল। সে সময় কোনও নারী ধর্ষণের শিকার, সেটা চিহ্নিত করা ধর্ষকদের জন্য অনেক বেশি আনন্দের বিষয় ছিল এবং তার বিরোধিতায় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ‘আমিও ধর্ষিতা।’ সেই হাত ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন #মি টু আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেটি বাংলাদেশে আছড়ে পড়েছে। যারা বিভিন্ন সময় নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে, এমন নয়জন নারী মুখ খুলেছেন। আমরা মুখ খুলি নি, তার মানে এই নয় আমরা নির্যাতনের শিকার নই। বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়েকেই তাদের জীবনে এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কিন্তু এই কথাগুলো তারা কোথায় বলবে সেই জায়গাটা খুঁজে পেত না এতদিন। বর্তমানে সেই জায়গাটা করে দিয়েছে ফেসবুক। আমরা বলতে পারছি না, কিন্তু যারা বলতে পারছে তাদের পাশে থেকে এ আন্দোলনের মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, আমরা পুরুষ সহকর্মীদের বলব এটা কোনও নারী আন্দোলন নয়, এটা আসলেই সকলের আন্দোলন, নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন। এই সমাজ আমাদের, সমাজকে বাসযোগ্য করার দায়িত্বও আমাদের।
বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, ডিবিসির প্রণব সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। সেমন্তী একজন ছাত্রী; তার ১৫ বছর বয়সের অভিজ্ঞতা ১১ বছর পরে অনেক কষ্টে বলতে পেরেছে। শুধু কি এরাই অপরাধী? এগুলো পথে পথে হচ্ছে অফিসে অফিসে হচ্ছে মাঠে মাঠে হচ্ছে। আমরা চাই নারীকে শ্রদ্ধা করুন। আমরা যদি নারীকে শ্রদ্ধা করি তাহলে ওই নিপীড়ক আর মেয়েদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, যারা এগুলোকে প্রশ্রয় দেয় তারা বলে যে, ছেলেরা একটু এরকম করতেই পারে। কিন্তু কেন? সুযোগ পেলেই একটি মেয়ের গায়ে হাত দেবে? অপমান করবে? সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে? এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মানবধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, যে সমস্ত নারী তাদের অভিজ্ঞতার কথা সাহস করে প্রকাশ করেছে তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই। মেয়েদেরকে পুরুষ শাসিত সমাজে ভোগপণ্য হিসেবে মনে করা হয়। আমি পুরুষতন্ত্রের কথা বলছি। এই দেখার পিছনে অনেকগুলো কারণ আছে। আপনারা যদি ওয়াজ মাহফিলগুলো শুনেন, সেখানেও দেখবেন নারীকে মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। এখন সময় এসেছে আমাদের প্রশ্ন তোলার, কথা বলার। সমাজে আমাদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করেন, আমরাও আপনাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করব। আমরা আপনাদের নির্যাতনকারী, প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই না। আমরা আপনাদের আমাদের একজন সহযোদ্ধা হিসেবে সমাজ গঠনকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

#মি টু আন্দোলনে দেখেছি কিছু বিশেষ ব্যক্তি; যাদের অনেকে সকলের পরিচিত। তারা প্রগতিশীল লেবাসধারী। তারা মনে করে একটি অসহায়, দুর্বল মেয়ের উপর হাত তুলতে পারবে। অশোভন আচরণ করতে পারবে। তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তে পারে। এই মি টু আন্দোলনে শুধু এই ৯ জন না, আস্তে আস্তে সকল নারীরা মুখ খুলবে এবং সকলের আসল চেহারা উন্মোচন করবে।
বাংলাভিশনের নিউজ এডিটর শারমিন রিনভী বলেন, বারবারই বলা হচ্ছে, এ বিষয়ে এতদিন পরে কেন? আমি বলতে চাই এতদিন পরে আইসব্রেক হতে চলেছে। এ আন্দোলন কোনও ছেলেদের বিরুদ্ধে নয়, এ আন্দোলন শুধু মাত্র নিপীড়কের বিরুদ্ধে। যারা খারাপ আছেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য এই আন্দোলন।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলী শুভ বলেন, ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী যৌন নিপীড়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদেরকে আমরা রুখে দিতে চাই। সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে চাই। আমরা সকলে মিলে যদি এই যৌন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, তাহলে দেখবেন আগামীতে এই পৃথিবী বাসযোগ্য হয়েছে।
যৌন নিপীড়নের শিকার শুধু মেয়েরা নয় বরং অনেক ছেলেও এতে আক্রান্ত উল্লেখ করে ৭১ টিভির সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন বলেন, বাংলাদেশে এখন মেয়েরা মি টুর মাধ্যমে মুখ খুলতে শুরু করেছে। আমরা মনে করি এর পাশাপাশি ছেলেদেরও মুখ খোলা উচিৎ। কারণ, মি টুর শিকার শুধুমাত্র নারীরা না, পুরুষরাও।
বাংলাদেশে মি টু বিষয়ে মুখ খোলা নয়জন নারীর একজন মুশফিকা লাইজু বলেন, ৩১ বছর পর আমি আমার কথা বলতে পেরেছি। আর সেজন্যই আমি এখানে এসেছি। আমি যখন এটি প্রকাশ করেছিলাম, তখন কিছু ভেবে বা কাউকে জানিয়ে করি নি। আমি ভেবেছি ৩১ বছর পরে আমি যথেষ্ট পরিণত ও শক্তিশালী। যদি আমার পাশে কেউ না থাকে তবে আমি একাই এ কথা মানুষকে জানাব এবং একাই সোচ্চার থাকব।
এ সময় নারী আন্দোলকর্মী, বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নারী ও পুরুষ কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



