বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কয়েকটি প্রাচীন গির্জা

জাহান আরা দোলন:


বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছেন খ্রিস্টান সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনা কেন্দ্র গির্জাগুলো দেশের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। ‘বড়দিন’ উপলক্ষ্যে এ সব গির্জাগুলোতে বিভিন্ন আয়োজন থাকে। যদিও করোনা মহামারীর কারণে এ বছর সে আয়োজনে ছেদ পড়েছে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের নেতৃবৃন্দের দেওয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে ছোট বড় প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো চার্চ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৭৪টি। বাংলাদেশের কয়েকটি গির্জা নিয়ে আমাদের এ আয়োজন।

ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় হোলি রোজারিও চার্চ, ছবি: বিডি নিউজের সৌজন্যে।

হোলি রোজারিও চার্চ
রাজধানীর ফার্মগেইটের কাছেই তেজগাঁও এলাকায় হোলি রোজারিও চার্চ। হলি রোজারি চার্চ পর্তুগিজ মিশনারিদের দ্বারা নির্মিত একটি গির্জা। মুগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে স্বাধীন ও উম্মুক্তভাবে বাণিজ্য, খৃস্টধর্ম প্রচার এবং গির্জা নির্মাণের ফরমান (১৫৭৯) নিয়ে ট্যাভারেস বাংলায় আসেন। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকায় পর্তুগিজদের বসতি গড়ে ওঠে। পর্তুগিজরা এখানে নিজস্ব বাণিজ্যকুঠি ও উপাসনালয় নির্মাণ করেন। ১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার তেজগাঁয়ের তেজকুনী পাড়ায় বর্তমান হলিক্রস গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের পূর্বদিকে ‘হলি রোজারী চার্চ’ (স্থানীয়ভাবে চার্চটি ‘জপমালা রাণীর গির্জা’ নামে সমধিক পরিচিত) নির্মাণ করেন। এটি ক্যাথলিক চার্চ।


কাকরাইলের সেন্ট মেরিস ক্যাথিড্রালের প্রার্থনা কক্ষ, ছবি: বিডি নিউজের সৌজন্যে।

সেন্ট মেরিস ক্যাথিড্রাল
ঢাকার ১ নং কাকরাইল সড়কে অবস্থিত সেন্ট মেরিস ক্যাথিড্রাল গির্জা। এটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে৷ বড়দিন উপলক্ষ্যে এ গির্জাটি সাজানো হয় আকর্ষণীয়ভাবে৷


সেন্ট নিকোলাস চার্চ, কালীগঞ্জ, গাজীপুর, সংগৃহীত ছবি।

সেন্ট নিকোলাস চার্চ
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী এলাকায় ১৬৬৩ সালে সেন্ট নিকোলাস চার্চটি স্থাপন করা হয়। আমাদের ইতিহাসের বড় কিছু ঘটনা ঘটেছে এই গির্জাকে কেন্দ্র করে। এখান থেকে কালীগঞ্জের আঞ্চলিক বাংলা ভাষার প্রথম বাইবেল অনূদিত হয়। এমনকি বাংলা ভাষার প্রথম দ্বিভাষিক অভিধান ও প্রথম ছাপা বইও এখান থেকেই প্রকাশিত হয়।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে পর্তুগিজ খ্রিষ্টানরা আস্তানা ফেলে এখানে এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিক্রমে ১৬৬৪ সালে তারা প্রথম গির্জা স্থাপন করে। পরে ১৬৮০ সালে পাকা ইমারত হয় নাগরীর সেন্ট নিকোলাস চার্চ। আরেকটি গির্জা ভবন তৈরি করা হয় ২০০৯ সালে৷ ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে হস্ত প্রসারিত যীশুর দণ্ডায়মান মূর্তি৷ এই এলাকায় আরও একটি গির্জা আছে, নাম সেন্ট অ্যান্টোনিস চার্চ। পর্তুগিজ স্থাপত্য নিদর্শনে তৈরি দর্শনীয় সেন্ট নিকোলাস চার্চ ও সাধু আন্তনির গির্জা নাগরীকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা আসছেন এই গির্জা দেখতে।


অক্সফোর্ড মিশন চার্চ, বগুড়া সড়ক,বরিশাল, ছবি: ট্রাভেল বাংলাদেশ

অক্সফোর্ড মিশন চার্চ
বরিশাল শহরের বগুড়া সড়কে অবস্থিত অক্সফোর্ড মিশন চার্চটির পরিচয় হলো এটি এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গির্জা। এ গির্জার আরেক নাম এপিফানি উপাসনালয়। শৈল্পিক, অভিজাত ও সুন্দরতম হিসেবেও এ গির্জার নাম আছে। নির্মাণকাল ১৯০০ সাল। দৃষ্টিনন্দন এ গির্জাটি ‘লাল গির্জা’ নামেও পরিচিত। ১৯০৩ সালে এ চার্চের প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্ন হয় ও একই বছর ২৬ জানুয়ারি এটি উদ্বোধন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপের কাজ ১৯০৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। লাল ইট দিয়ে নির্মিত শতবর্ষী এ চার্চ চমৎকার রক্ষণাবেক্ষণের সুবাদে ঝকঝকে ও সুদৃশ্য। গির্জাটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এর স্থাপত্যশৈলী বিনষ্ট না হয়। ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়েও গির্জাটি সম্পূর্ণ অক্ষত থেকে যায়।

তবে জনসাধারণের জন্য এখানে প্রবেশ সংক্রান্ত জটিলতা আছে। নিজস্ব সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া চার্চের সীমানার ভেতর সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ।


আওয়ার লেডি অফ দ্য হোলি রোজারিও ক্যাথিড্রাল চার্চ, চট্টগ্রাম, সংগৃহীত ছবি

আওয়ার লেডি অফ দ্য হোলি রোজারিও ক্যাথিড্রাল চার্চ
চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটা এলাকার বান্ডেল সড়কের ‘আওয়ার লেডি অব দি হলি রোজারি ক্যাথিড্রাল চার্চ’ নামে এ গির্জাটি চারশ’ বছর পুরনো। চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম প্রধান এ গির্জাটি ১৬০০ সালে পর্তুগিজ খ্রিস্টান ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রার্থনার উদ্দেশে তৈরি করেন। এ গির্জা রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রধান গির্জা। স্থানীয়ভাবে এটি বান্ডেল ক্যাথলিক চার্চ নামেও পরিচিত। পর্তুগিজ আমলে নির্মিত এই গির্জার ভেতরে দেয়ালের স্তম্ভগুলো আকর্ষণীয় কারুকাজে তৈরি। গির্জা ঘিরে রয়েছে সাধারণ ও পুরোহিতদের আলাদাভাবে নির্মিত সমাধিস্থল।

টিনের ছাউনি দেওয়া প্রাচীন এ গির্জার পাশইে পরিকল্পিতভাবে সাজানো খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নারী পুরুষের সমাধি। পাথরঘাটার এ গির্জাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিভাগে ১২০ টি গ্রামীণ স্কুল, চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি জুনিয়র বিদ্যালয়, চারটি উচ্চ বিদ্যালয় একটি কলেজ ও একাধিক আবাসিক হল গড়ে উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে পর্তুগীজ খ্রিস্টান ব্যবসায়ীরা আসে ১৫১৮ সালে। তবে ১৫৩৭ সাল থেকে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। প্রথম মিশনারি ছিল তিনটি। তাহলো-সন্ন্যাসব্রতী, প্ররৈতিকি এবং জেসুইট সংঘ। সেন্ট জন দ্যা ব্যাপ্টিস্ট নামে প্রথম গির্জা স্থাপতি হয় ১৬০০ সালের ২৪ জুন। দুই বছর পর সেটি ধ্বংস করা হয়। প্রথম গির্জার ধ্বংসস্তুপ পরে উপর পরবর্তীতে ‘পবিত্র জপমালা রাণী’ নামে গির্জা এবং ১৮৪৩ সালে বিশপ ভবনের দালানটি নির্মাণ করা হয়। ১৬০০ সালে নগরীর জামালখানের গির্জাটিও তৈরি করা হয়।


আর্মেনিয়ান গির্জা, পুরনো ঢাকা, আরমানিটোলা। সংগৃহীত ছবি

আর্মেনিয়ান গির্জা
পুরনো ঢাকার আরমানিটোলায় সেন্ট মেরিস ক্যাথিড্রাল অবস্থিত। এটি ‘আর্মেনিয়ান চার্চ’ হিসেবে পরিচিত। আর্মেনিয়রা আরমানিটোলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরুর পরে এ গির্জা নির্মাণ করা হয়। সেটি ১৭৮১ সালের কথা। এলাকাটির আরমানিটোলা নামটিও এসেছে আর্মেনিদের কারণে। ধারণা করা হয় এই গির্জা নির্মাণের আগে তাদের ছোট একটি উপাসনালয় ছিল। গির্জাটি এখন যে জায়গায়,সেখানে এক সময় আর্মেনিদের গোরস্থান ছিল। গির্জা নির্মাণের জন্য গোরস্থানের আশেপাশে যে বিস্তৃত জমি তা দান করেছিলেন আগা মিনাস ক্যাটচিক নামের এক আর্মেনিয়। লোকশ্রুতি অনুযায়ী গির্জাটি নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন চারজন আর্মেনিয়। এরা হলেন মাইকেল সার্কিস, অকোটাভাটা সেতুর সিভর্গ, আগা এমনিয়াস এবং মার্কার পোগজ।


সেন্ট থমাস চার্চ, বাহাদুর শাহ পার্ক, পুরনো ঢাকা, সংগৃহীত ছবি

সেন্ট থমাস চার্চ
পশ্চিমে গির্জা নির্মাণে কয়েদীদের ব্যবহারের ইতিহাস আছে। সেন্ট থমাস চার্চ নামের এ গির্জাটি নির্মাণেও শ্রম দিয়েছিলেন ঢাকা জেলের কয়েদীরা। ১৮১৯ সালে ঢাকা জেলের কয়েদিদের শ্রমের বিনিময়ে নির্মিত হয়েছেল এ গির্জা। ঢাকার পুরনো গির্জাগুলির মধ্যে অন্যতম একটি সেন্ট থমাস চার্চ। শাঁখারি বাজরের পূর্ব পাশে এবং বাহাদুর শাহ পার্কের উত্তর পাশে অবস্থিত সেন্ট থমাস চার্চের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৮১৯ সালে। উদ্বোধন করা হয় ১৮২৪ সালে। সেন্ট থমাস ছিলেন উপমহাদেশের খ্রিস্টান মিশনারী। তার নামানুসারেই এই চার্চের নামকরণ। গির্জাটির প্রধান আর্কষণ হলো চূড়ায় অবস্থিত বড় আকারের একটি ঘড়ি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের কর্মচারীদের জন্য সেন্ট থমাস গির্জা প্রতিষ্ঠা করে। আর্মেনিয় চার্চ হল গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ আর সেন্ট থমাস হল গিয়ে এংলিক্যান প্রোটেষ্ট্যান্ট। আন্টাঘর ক্লাব চত্বরটি আর্মেনীয়দের কাছ থেকে ইংরেজরা কিনে নিয়ে পার্কে রূপ দেয়। চার পাশ ঘিরে দেয় লোহার বেড়ায়। চার কোণে স্থাপন করে চারটি কামান। জেমস টেলরের ১৮৩৯ সালের রিপোর্টে এটি ছিল কয়েকটি রাস্তার মাঝে একটি ডিম্বাকার বাগান। সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী নির্মম বীভৎসতার সাক্ষী এই উদ্যান এবং সেন্ট থমাস গির্জা।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension