
বাংলায় বিজেপির চাই ১৮ শতাংশ
রূপসী বাংলা কলকাতা ডেস্ক: রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে পাওয়া ২৭ শতাংশ ভোট বেড়ে যদি ৪৫ শতাংশ হয়, একমাত্র তাহলেই পশ্চিমবঙ্গে ২২টি লোকসভা আসন পেতে পারে বিজেপি৷ রাজনৈতিক মহল এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলায় বাড়তি ১৮ শতাংশ ভোট জোগার করা বিজেপির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে৷ তবে এই ১৮ শতাংশের গণ্ডি টোপকে যেতে পারলে তবেই অমিত শাহের ২২টি লোকসভা আসন জয়ের স্বপ্ন সফল হবে৷ তবে রাজ্যে বিজেপির যা সাংগঠনিক শক্তি, তাতে অনেক বিজেপি নেতাই বিশ্বাস করেন না যে পার্টি লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ২২টি আসন পাবে৷ কারণটা স্পষ্ট৷ রাজ্যের ৪৪ হাজার বুথের প্রতিটিতে তৃণমূল কংগ্রেসের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার শক্তি নেই গেরুয়া শিবিরের৷ সেক্ষেত্রে প্রতিটি দলীয় সভাতেই কর্মীদের ‘বুক দিয়ে বুথ আগলে রাখুন’ – এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে৷
কিছুদিন আগেই, রাজ্য বিজেপির অন্যতম সহসভাপতি চন্দ্রকুমার বসু একটি টুইট করেছেন৷ সেখানে তাঁর বক্তব্য, একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে তিনি খবর পেয়েছেন, বিজেপি বাংলায় যা ভোট পায় তা হল ‘নেগেটিভ ভোট ৷’ তৃণমূলের জনপ্রিয়তার কমার কারণে ওই ভোট বিজেপির দিকে ঘুরে গিয়েছে৷ এই কারণেই পার্টি রাজ্যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে৷ কিন্তু জেতার জন্য (ভোটে জেতার জন্য বা সরকার গড়ার জন্য, যেটা উনি নিজের বক্তব্যে পরিষ্কার করে বলেন নি) পার্টিকে পজিটিভ ভোট পেতে হবে৷ একমাত্র মাঠে-ময়দানে সাংগঠনিক কাজকর্ম করেই তা সম্ভব৷
Reliable sources tell me that the voteshare gain of @BJP4Bengal till now is due to negative voting, unpopularity of @AITCofficial .This has put the party in the 2nd position.However to win party must draw the positive vote-which can only be possible based on work on the ground.
— Chandra Kumar Bose (@Chandrakbose) November 21, 2018
চন্দ্রকুমারের দেওয়া তথ্যের বাস্তব ভিত্তি পাওয়া গিয়েছিল শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে৷ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে পঞ্চায়েত নির্বাচনে একদল তৃণমূলকেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখা গিয়েছে৷ তবে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগেই শাসকদলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মী-সমর্থকরা বিজেপি নেতাদের হাত ধরে (বিশেষত মুকুল রায়) দলে দলে গেরুয়া শিবিরে নাম লিখিয়েছে ৷ পঞ্চায়েতের মনোনয়ন জমা, প্রত্যাহার থেকে শুরু করে ভোটপর্ব – এক বেনজির সন্ত্রাসের মুখ দেখেছে বাংলা৷ অনেকেই মন্তব্য করেছেন – বাংলায় এই রকম রক্তাক্ত নির্বাচন শেষ কবে হয়েছে তা মনে করা যায় না৷ তবে পঞ্চায়েতে মুকুল রায়দের অভাবনীয় সাফল্যে শাসকের চোখ কপালে উঠেছে৷ ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩ শতাংশ আসনে নির্বাচিত হয়েছিল বিজেপি প্রার্থীরা৷ ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৭ শতাংশ৷ ২৪ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি নবান্নে শাসককে রীতিমতো চিন্তায় ফেলেছে৷ শাসকদল ভাবতে শুরু করেছে, সারা বাংলায় কত ‘বিক্ষুব্ধ তৃণমূল’রয়েছে? ২৭ শতাংশের মধ্যে বিজেপির আদর্শগত ভোট কতটা? কতটাই বা তৃণমূলের ঘরের ভোট কেটেছে গেরুয়ারা?
এই সব প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে শাসকদল জানতে পেরেছে, শুধু বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নয়, আদর্শবিচ্যুত এবং এলাকায় তৃণমূলের ভয়ে ভীত বামপন্থী কর্মীরাও বিজেপিতে নাম লিখিয়েছে৷ মুর্শিদাবাদে বিক্ষুব্ধ অধীনপন্থীরা বা মালদায় যাঁরা কংগ্রেসী পরিবারতন্ত্র এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে সমান মাপের ঘেন্না করেন, তাঁরাই বিজেপিতে যোগ দিয়েছে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই দলকে বার্তা দিতে দেরি করেননি, ‘‘সিপিএমের ভালো লোকেদের দলে টানতে হবে৷ আপনারা (দলের কর্মীরা) যদি না পারেন আমি করে দেখাবো?’’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে বিজেপির ব্যাপক প্রচার কর্মসূচী চলবে৷ বিজেপির রথ ঘুরবে রাজ্যের ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে ৷ রথযাত্রায় আগাগোড়া থাকবেন সর্বভারচীয় সভাপতি অমিত শাহ ৷ তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবাক করে রথযাত্রায় বিশেষ আকর্ষণ হতে পারেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ রথযাত্রা চলাকালীন রাজ্যের চার জায়গায় জনসভা করবেন মোদী৷ এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় ব্রিগেডে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী৷ সব মিলিয়ে রাজ্যে মোদী শাহের ঠাসা কর্মসূচী চিন্তায় রেখেছে মমতাকে৷
মোদী-শাহের জনসংযোগকে কাজে লাগিয়েই বিজেপি রাজ্যে ৩৫ শতাংশ ভোট পেতে পারে বলে ধারণা নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের৷ ২০১৪ সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনে রাজ্যে বেশ কয়েকদফা প্রচার সেরেছিলেন মোদী৷ সে সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়৷ কলকাতায় তার প্রথম জনসভায় মোদী বলেছিলেন, এখানে দিদি আছে, রাষ্ট্রপতি ভবনে দাদা আছে৷ আপনাদের তো দু’হাতেই লাড্ডু৷ আমিও আপনাদের লোক৷ দিদি অবশ্য মুসলমান ভোটের কথা ভেবে মোদীর লাড্ডু গেলেন নি৷ কিন্তু বিজেপি রাজ্য থেকে দুটি আসন পেয়েছিল৷ ২০১৮ তে এসে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির প্রভাব আগের খেকে ২০০ শতাংশ বেড়েছে৷ মানুষ বিজেপিকে তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি মনে করছে৷ এই পরিস্থিতিতে ২৭ খেকে ৩৫ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী রাজ্য বিজেপি৷
তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৮০০ জেলা পরিষদ আসন জিতেছে৷ সেক্ষেতে যদি ধরেও নেওয়া হয় তৃণমূলের আসন বাড়ছে না, তবুও বিজেপির সঙ্গে ১০ শতাংশ ভোটের পার্থক্য থেকেই যায়৷ এছাড়া, বিধানসভা ভোট এবং পঞ্চায়েত ভোটের তুলনা পাশাপাশি রেখে করা যেতেই পারে৷ তবে লোকসভা ভোটের পরিপ্রক্ষিতে তা বদলে যাওয়া সম্ভব৷ সেক্ষেত্রে, বিশেষজ্ঞদের মত, বিজেপি পঞ্চায়েতের ২৭ শতাংকে ৩৫ শতাংশ করতে পারলে দু’ধরণের ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷ এক, তৃণমূলকে অবাক করে বিজেপি প্রায় ৯টি আসন দখল করল৷ অন্যদিকে এই আশঙ্কাও রয়েছে যে বিজেপি কোনও আসনই পেল না৷
কারণ তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ভোট পার্থক্য ১০ শতাংশ৷ যা যথেষ্ঠই বড়৷ এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের ভোটে শাসকদলের ‘এরিয়া ডমিনেশন’ বা এলাকা দখল এবং হুমকি কর্মসূচী শুরু হয়ে যায় মাসখানেক আগে থেকেই৷ সেক্ষেত্রে এখানকার ভোট রসায়ন অন্য রাজ্য থেকে আলাদা৷ বুথ এবং বুথের বাইরে তৃণমূল, বিজেপির ওপরে দাদাগিরি করতে চাইবে৷ অনুব্রত মণ্ডলের মতো তৃণমূল নেতারা সংবাদমাধ্যমে বলতে শুরু করেছেন, ‘‘২৯৪ টি কেন্দ্রে বুথের দখল নেবে ওরা (বিজেপি)৷ আমরা কী হাত্ চুড়ি পড়ে বসে রয়েছি৷’’ তবে সেফোলজিস্টদের মতে, এই ১০ শতাংশ ভোটের ব্যবধান যত কমে আসবে, ততই সুযোগ বাড়বে বিজেপির৷



