
বিশ্বকাপ বিক্রির পথে, নাকি শুধু অংশীদারত্ব?
পরিকল্পনাটি কার্যকর হতে হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ভোটে অনুমোদন পেতে হবে। আর অনুমোদিত হলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্ব দেবেন জোশুয়া কুশনার প্রতিষ্ঠিত একটি বিনিয়োগ সংস্থা। জোশুয়া কুশনার হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই
সহিংসতার ঘটনার মধ্য দিয়ে দিন দশ-এক আগে শেষ হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আর্জেন্টিনাকে শাস্তি দেয়া হবে কিনা, এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি ফিফা। তবে এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি কাঠামোর পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলছেন, উদ্যোগটির লক্ষ্য হলো ‘বিশ্বব্যাপী ফুটবলের গণতন্ত্রীকরণ’। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোয় অংশীদার হওয়ার সুযোগ দেয়া হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ থেকেও আর্থিক লাভ করতে পারেন।
বিশ্বকাপ ও অন্যান্য প্রতিযোগিতায় অংশীদারত্ব বিক্রির এ পরিকল্পনায় ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ফিফা।
গতকাল ঘোষিত এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই হাজার কোটি ডলার মূল্যের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান (সাবসিডিয়ারি) গঠন করা হবে, যা বিশ্বকাপ ও অন্যান্য ফিফা প্রতিযোগিতা পরিচালনা করবে।
নতুন প্রতিষ্ঠানটির নাম হবে ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)। এতে ফিফা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ধরে রাখবে, তবে সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহ করা হবে।
পরিকল্পনাটি কার্যকর হতে হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ভোটে অনুমোদন পেতে হবে। আর অনুমোদিত হলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্ব দেবেন জোশুয়া কুশনার প্রতিষ্ঠিত একটি বিনিয়োগ সংস্থা। জোশুয়া কুশনার হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
উয়েফা বলছে, এ প্রস্তাব ‘এমন একটি সীমা অতিক্রম করেছে, যা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর কখনোই অতিক্রম করা উচিত নয়।’
তবে ফিফার দাবি, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আরো বেশি অর্থ সংগ্রহ করে ফুটবলের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, বিশ্বজুড়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং অর্জিত সব নিট মুনাফা আবার ফুটবলের উন্নয়নেই বিনিয়োগ করা হবে।
জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ফুটবলের কিছু অংশ অসাধারণ বাণিজ্যিক মূল্য সৃষ্টি করেছে। আমরা সেই সাফল্যকে স্বাগত জানাই এবং চাই তা অব্যাহত থাকুক, কারণ এর সুফল পুরো ফুটবলই পাবে।’
ফিফা জানিয়েছে, তারা নতুন প্রতিষ্ঠানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। পাশাপাশি ফুটবলের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা, ম্যাচসূচি এবং নিয়ন্ত্রক ও ক্রীড়াসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্বও ফিফার কাছেই থাকবে।
বিশ্বকাপ কোনো পণ্য নয়
এ প্রস্তাব ফিফা ও উয়েফার মধ্যকার মতপার্থক্য আরো স্পষ্ট করেছে। ইউরোপীয় সংস্থা উয়েফা নিজেদের ফুটবলের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে অলাভজনক সংস্থা ফিফা বলছে, তারা আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের প্রসার ঘটাতে চায়।
এক বিবৃতিতে উয়েফা জানায়, তারা এই নতুন প্রস্তাবকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখছে। তাদের ভাষায়, ‘প্রতিটি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড়, সমর্থক, সরকার এবং যারা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন—সবারই এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।’
উয়েফা আরো বলেছে, ‘ফুটবলের মূল চেতনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কেনাবেচার সম্পদ নয়—বিশেষ করে যখন কে আর্থিকভাবে লাভবান হবে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। ফুটবলের মালিক আমরা কেউ নই। তাই এটিকে বিক্রি করার অধিকারও ফিফার নেই।’
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপ কোনো পণ্য নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং এটি কখনোই কারো বিক্রি করার সম্পত্তি ছিল না।’
তিনি আরো বলেন, ‘চুক্তিকে যেভাবেই উপস্থাপন করা হোক না কেন, একবার এর একটি অংশ বিক্রি করা মানে পুরো ধারণাটিকেই বিক্রি করে দেয়া।’



