
ভারতে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি, মৃত্যুহার বেশি পুরুষের
নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যেকোনো সময় ডাক্তারের কাছে যান। অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়—পুরো জীবনেও একবারও ডাক্তার দেখান না
ভারতে ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা গেছে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি হলেও, মৃত্যুর হার পুরুষদের মধ্যে বেশি। দেশের সবশেষ ক্যান্সার রেজিস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের অর্ধেকের বেশিই নারী। তবে, মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে পুরুষরা এগিয়ে। খবর বিবিসি।
বিশ্বব্যাপী চিত্র কিন্তু ভিন্ন। ২০২২ সালে গড়ে প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে ১৯৭ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। সেই বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়। যার মধ্যে পুরুষ ১ কোটি ৩ লাখ আর নারী ৯৭ লাখ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ধনী দেশগুলোয় প্রতি ১২ জন নারীর মধ্যে একজন জীবদ্দশায় স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। আর প্রতি ৭১ জনে ১ জন মারা যান। কিন্তু দরিদ্র দেশে চিত্র উল্টো। প্রতি ২৭ জন নারীর মধ্যে একজনের স্তন ক্যান্সার শনাক্ত হয়। অথচ মৃত্যুহার প্রতি ৪৮ জনে একজন।
ভারতে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্তন, জরায়ুমুখ (সার্ভিকাল) ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার। মোট শনাক্তের ৪০ শতাংশই শুধু স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত। সার্ভিকাল ক্যান্সার মূলত মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার সাধারণত হরমোন-সংক্রান্ত কারণে বাড়ে। পাশাপাশি জীবনধারার পরিবর্তনও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে—যেমন দেরিতে গর্ভধারণ, কম সময়ে বুকের দুধ খাওয়ানো, স্থূলতা ও বসে থাকার অভ্যাস।
অন্যদিকে, পুরুষদের মধ্যে মুখগহ্বর, ফুসফুস ও প্রোস্টেট ক্যান্সার বেশি। ভারতে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে দায়ী তামাক। যা প্রধানত মুখ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ।
কিন্তু মৃত্যুহারের এই দ্বৈততার আসল কারণ কী? নারীদের কি আগে রোগ শনাক্ত হচ্ছে? পুরুষদের ক্যান্সার কি বেশি মারাত্মক? নাকি ধূমপান, পান খাওয়া ও মদ্যপানের মতো মতো অভ্যাস তাদের অবস্থা খারাপ করছে?
চিকিৎসকরা বলছেন, সচেতনতা বাড়ানো ও উন্নত সেবার ফলে নারীদের সাধারণ ক্যান্সারগুলো আগেভাগেই শনাক্ত হয়। যেহেতু এসব ক্যান্সারের ‘ল্যাটেন্সি পিরিয়ড’ বা সুপ্ত পর্যায় দীর্ঘ। তাই সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ভালো থাকে। ফলে নারীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম।
কিন্তু পুরুষদের অবস্থা ভিন্ন। তাদের ক্যান্সার মূলত জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত—তামাক ও অ্যালকোহল ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারের প্রধান কারণ। এগুলো আক্রমণাত্মক, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেয় না।
এছাড়া পুরুষরা সচরাচর প্রতিরোধমূলক পরীক্ষা বা নিয়মিত চেকআপে যান না। অনেক সময় তারা উপসর্গ থাকলেও দেরিতে চিকিৎসা নেন। ফলে মৃত্যুহার বেড়ে যায়।
সেন্টার ফর হেলথ ইনোভেশন অ্যান্ড পলিসি ফাউন্ডেশনের প্রধান ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ রবি মেহরোত্রা বলেন, ‘নারীর স্বাস্থ্য জনস্বাস্থ্য প্রচারে বড় ফোকাস হয়ে উঠেছে। এর ইতিবাচক দিক আছে, তবে একে দ্বি-মুখী তলোয়ারও বলা যায়। সচেতনতা ও স্ক্রিনিংয়ের কারণে নারীদের ক্যান্সার অনেক আগেই ধরা পড়ে। কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে আলাপটা সাধারণত তামাক আর মুখের ক্যান্সারের বাইরে যায় না।’
তিনি আরো জানান, ‘নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যেকোনো সময় ডাক্তারের কাছে যান। অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়—পুরো জীবনেও একবারও ডাক্তার দেখান না।’
ক্যান্সারে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার জন্য জাীবনযাপনকে মূল কারণ বলছেন চিকিৎসকরা। আসামে ক্যাচার ক্যান্সার হাসপাতালের প্রধান আর রবি কানন বলেন, দেশের উত্তর-পূর্বের বেশিরভাগ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আমি নিশ্চিত—জীবনধারাই আসল কারণ। এখানে অণ্য যেকোনো জায়গার তুলনায় তামাক ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেশি। তার সঙ্গে যোগ হয় অ্যালকোহল, সুপারি, এমনকি মাংস রান্নার ধরণও। খাবারের অভ্যাস ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।



