যুক্তরাষ্ট্র

মহারণে কমলা-ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানেই টানটান উত্তেজনা। উত্তর গোলার্ধ ছাড়িয়ে তার ঝাপটায় দুলছে পুরো ব্রহ্মাণ্ড। ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে প্রলয়ংকরী যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির নির্বাচনের দিকে এখন নজর সারাবিশ্বের। কে হবেন মুক্তবিশ্বের পরবর্তী নেতা– তা জানতে আমেরিকানদের মতোই উদগ্রীব বিশ্বের শত শত কোটি মানুষ।

সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাগ্য নির্ধারণে আজ ভোট দেবেন দেশটির ভোটাররা। এ নির্বাচনে কমলা বিজয়ী হলে তিনি হবেন দেশটির ২৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প বিজয়ী হলেও সৃষ্টি হবে নতুন ইতিহাস।

নির্বাচনবিষয়ক পণ্ডিতদের ধারণা, কয়েক দশকের মধ্যে এবার সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে দেশটিতে। প্রধান দুই প্রার্থীই সমানে সমান। কমলা জাতীয়ভাবে ১ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়।

এবারের নির্বাচনে ইস্যু গর্ভপাত, অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও অভিবাসন। দেশটিতে বেশির ভাগ রাজ্যে ঐতিহ্যগতভাবে হয় ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকানরা জয়ী হয়ে থাকেন। তবে বেশ কয়েকটি রাজ্য রয়েছে, যেখানে যে কোনো দলই জয়ী হতে পারে। এগুলোকে দোদুল্যমান রাজ্য বলা হয়। এবার এ ধরনের রাজ্য সাতটি।

এগুলো হলো– পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, উত্তর ক্যারোলাইনা, মিশিগান, অ্যারিজোনা, উইসকনসিন ও নেভাদা। তবে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে ১৯টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট থাকা পেনসিলভানিয়া।

নতুন ইতিহাস
নির্বাচনের সময় ‘ঐতিহাসিক’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করা হয় বলে এটি ভোঁতা হয়ে গেছে। তবে বিবিসি বলছে, এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সত্যিই ঐতিহাসিক। ৬০ বছর বয়সী কমলা হ্যারিস বিজয়ী হলে তিনি হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করবেন প্রথম নারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। পাশাপাশি তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী এবং এশিয়ান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হবেন।

ইতিহাস গড়বেন ৭৮ বছর বয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি উনিশ শতকের পর প্রথম প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, যিনি পুনর্নির্বাচনে হেরে আবার জয়ী হয়েছেন। আবার তিনি প্রথমবারের মতো ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া প্রার্থী। তবে চলতি বছরই তিনি দৃশ্যত দুটি হত্যা প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন। তিনি বিজয়ী হলে তা হবে সবচেয়ে বিস্ময়কর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। কমলা জয়ী হলে তিনি প্রায় ২৫০ বছরের মধ্যে প্রথম নারী কমান্ডার-ইন-চিফ হবেন।

পৌনে আট কোটি আগাম ভোট
গত রোববার পর্যন্ত ৭ কোটি ৮০ লাখের বেশি আমেরিকান আগাম ভোট দিয়েছেন। ২০২০ সালে দেশটিতে যত ভোট পড়ে, এই সংখ্যা তার প্রায় ৪৮ শতাংশ। এবার দেশটিতে ভোটার ১৮.৬৫ কোটি।

এতে স্পষ্ট, দেশটিতে সশরীরের আগাম এবং মেইল-ইন ভোটিং ক্রমবর্ধমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং আমেরিকার রাজনীতিতে তা একটি নতুন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও প্রায় অর্ধেক ভোটার আগাম ভোট দিয়েছিলেন, যা মহামারি সময়ের কাছাকাছি ছিল।

এবার জর্জিয়ায় ৪০ লাখ বেশি ভোটার ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন বলে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকশন ল্যাবের তথ্যে দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালে এ রাজ্যে যত ভোট পড়ে, এবার তার প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। রণক্ষেত্র রাজ্য নর্থ ক্যারোলাইনার ৪৪ লাখের বেশি নাগরিক ব্যালট নিয়েছেন। এ রাজ্যেও ২০২০ সালে যত ভোট পড়ে, এই সংখ্যা তার ৮০ শতাংশ।

মহামারির মধ্যে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ১০ কোটি ভোটার আগাম ভোট দেন সশরীরের কেন্দ্রে হাজির হয়ে অথবা মেইলের মাধ্যমে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বছরের পর বছর মেইল-ইন ভোটিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন।

আগাম ভোটে কমলার বাজিমাত
ইতোমধ্যে পৌনে আট কোটির বেশি ভোট দেওয়া হয়েছে। মানে দেশটির মোট ভোটের প্রায় অর্ধেকই সম্পন্ন হয়েছে। নতুন জরিপে দেখা যায়, কমলা হ্যারিস দেশের যুদ্ধক্ষেত্র রাজ্যগুলোতে আগামী ভোটারদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন।

যারা ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ৮ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের জরিপে দেখা গেছে, কমলা তিনটি দোদুল্যমান রাজ্যে কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, একটিতে ট্রাম্প এগিয়ে। বাকি তিনটিতে দু’জনই সমানে সমান।

জেন্ডার ব্যবধান
নির্বাচনী কৌশলবিদ জিম মেসিনা বিবিসিকে বলেছেন, কমলা ও ট্রাম্প উভয়ের প্রচারশিবিরই বিশ্বাস করে, এখন পর্যন্ত যেসব ডেটা পাওয়া গেছে, তাতে ইঙ্গিত মিলছে তারা জয়ী হতে চলেছে।

২০১২ সালে ওবামার প্রচারাভিযান পরিচালনা করেছিলেন মেসিনা। তিনি বলেছেন, ২০১২ সাল থেকে তিনি এ ধরনের চিত্র দেখেননি। এবার সত্যিই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে চলেছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, আগাম ভোটারদের ৫০ শতাংশের বেশি নারী। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যাতে বোঝা যায় নারীরা এবারের নির্বাচন নিয়ে কতটা উৎসাহী। কমলার দিক থেকে দেখলে এ সংখ্যা অনেক আত্মবিশ্বাস জন্ম দেয়।

অন্যদিকে ট্রাম্পকে অধিক সংখ্যক তরুণ পুরুষ ভোটার ভোট দিয়েছেন, যারা ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাট। মেসিনা বলেন, এ বছর আমেরিকার রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জেন্ডার ব্যবধানও দেখা গেছে। নারীরা কমলা হ্যারিসকে এবং পুরুষরা ট্রাম্পকে ভোট দিচ্ছেন। এটি নির্ধারক ফ্যাক্টর হতে পারে। তবে উভয় পক্ষই বলেছে, সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কমলার পক্ষে যাচ্ছেন।

শেষ দিনের প্রচার
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিস শেষ দিনে ভোটারদের কাছে তাদের সমাপনী বার্তা দিয়েছেন। উভয় প্রার্থীই প্রধান রণক্ষেত্র রাজ্যজুড়ে চষে বেড়িয়েছেন। সোমবার কমলা পেনসিলভানিয়ায় প্রচারণা চালান এবং ট্রাম্প উত্তর ক্যারোলাইনা, পেনসিলভানিয়া ও মিশিগানে প্রচারে অংশ নেন।

শেষ প্রচারেও ট্রাম্প অভিবাসনবিরোধী বার্তাকেই সামনে রেখেছেন। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এক সমাবেশে বক্তৃতায় কমলা হ্যারিস বলেছেন, গাজা যুদ্ধ অবসানে তিনি তাঁর সাধ্য অনুযায়ী সবকিছুই করবেন। মিশিগানেই রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আরব আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বাস।

ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর ডিয়ারবর্নে সমাবেশ করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ইসরায়েলকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে থাকা ক্ষোভকে পুঁজি করে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।

ইলেকটোরাল কলেজ
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীই যে জয়ী হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একজন প্রার্থী তুলনামূলক কম ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।

এর মূলে আছে দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থায় ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ নামে ২০০ বছর পুরোনো একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই ইলেকটোরাল কলেজে যিনি ভালো ফল করেন, তাঁর হাতেই যায় হোয়াইট হাউসের চাবি। ইলেকটোরাল কলেজের ৫৩৮ জন ইলেকটোর নির্বাচিত করেন প্রেসিডেন্টকে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে একজন প্রার্থীকে এই ৫৩৮ ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে অন্তত ২৭০টি নিশ্চিত করতে হয়।

কংগ্রেস নির্বাচন
কমলা ও ট্রাম্প ছাড়া আরও চার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী লড়ছেন এবারের নির্বাচনে। তবে শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনই হচ্ছে না; একই সঙ্গে দেশটির কংগ্রেসের সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি রাজ্য গভর্নর পদেও ভোট হবে। সিনেটের ১০০ আসনের ৩৪টিতে, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টির সবকটিতে এবং রাজ্য গভর্নর পদের ৫০টির মধ্যে ১১টিতে আজ ভোট গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে কংগ্রেসের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ডেমোক্র্যাটরা রাজ্য আইনসভায় জয় পেতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। অ্যারিজোনা ছাড়াও ডেমোক্র্যাটরা নিউ হ্যাম্পশায়ার, উইসকনসিন, নর্থ ক্যারোলাইনা ও কানসাস আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে লড়ছেন। একই সঙ্গে সিনেটে বিদ্যমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চান।

রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে চলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার পাশাপাশি পেনসিলভানিয়া, মিশিগান ও মিনেসোটা রাজ্যের ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভেঙে দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করছেন।

কখন ফলাফল ঘোষণা
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভোট গ্রহণ শেষ হবে। তবে নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলে কে জিতেছেন, তা জানতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে। বেশ কয়েকটি জায়গায় জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব সংকীর্ণ হতে পারে। এ জন্য আইন অনুসারে ভোট পুনর্গণনা করা প্রয়োজন হতে পারে। তাতে ফলাফল পেতে অপেক্ষার পালা শুধুই বাড়বে।
২০২০ সালের নির্বাচন ৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হলেও মার্কিন টিভি নেটওয়ার্কগুলো ৭ নভেম্বর (শনিবার) ভোর পর্যন্ত জো বাইডেনকে বিজয়ী ঘোষণা করেনি। আগামী বছরের ২০ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল কমপ্লেক্সের মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্টের অভিষেক হবে। সূত্র: বিবিবি, আলজাজিরা ও সিএনএন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension