
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং চরম দরিদ্রতার ভিন্ন চিত্র
ড. পল্টু দত্ত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম জাতীয় অর্থনীতি এবং শিল্পায়নের প্রতীক। বিশ্ব রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে এবং বিশ্বের তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এর বিশেষ প্রভাব অনস্বীকার্য। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থানরত এই দেশটির সম্পদ, উচ্চ জীবনযাত্রার মান, প্রথম পরাশক্তি এবং বিশ্ব-মানের পরিষেবার প্রাপ্যতার কারণে, অনেক আমেরিকানসহ পৃথিবীর অনেকেই বিশ্বাস করে যে সুযোগ, স্বপ্ন অর্জন এবং সত্যিকারের মানুষ হিসাবে বসবাসের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ভালো দেশগুলোর মধ্যে একটি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর অর্থ আছে ঠিকই, চোখ ধাঁধানো সুউচ্চ সারি সারি অট্টালিকা আর বিশালাকার মসৃণ পিচঢালা স্মার্ট মোটরওয়ে দিয়ে যখন সা সা করে নামি-দামি গাড়ি সব দাপিয়ে বেড়ায়, বিশ্বখ্যাত বিপণিবিতানগুলোতে নানা রকমের পণ্য দেখতে দেখতে যখন দেহ ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিংবা শহরের মন মাতানো দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে দেখতে স্বর্গীয় সুখ ও আনন্দের তরীতে ক্ষণিকের জন্য ভেসে বেড়ানো যায়, তখন কখনোই মনে হয় না যে এটি একটি উন্নত দেশ নয় কিংবা সত্যিকার অর্থে বসবাসের জন্য শ্রেষ্ঠ স্থান মোটেও নয়। বরং পৃথিবীর এই শক্তিধর দেশটি আসলে অর্থনৈতিক এং সামাজিক শৃঙ্খলায় একেবারে পঙ্গুত্বের দোরগোড়ায়। কেউ যদি মনে করে থাকে যে আমেরিকা একটি সুযোগ এবং মহা সম্ভাবনার দেশ, যেখানে মানুষের শ্রমের সঠিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন আছে কিংবা মানুষ সুখ ও আনন্দের সাথে জীবনযাত্রা করছে -তা সম্পূর্ণ ভুল। তার কারণ- আমেরিকান পুরো অর্থনীতিই এক বিশাল পুঁজিবাদী কেলেঙ্কারি।
গত বিশ বছর যাবত যতবার যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি ততবারই এর আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির চরম অবনতির নিম্নগামী প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। এ যেন এক স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীতমুখে। পৃথিবীর সব দেশেই আর্থসমাজিক ব্যবস্থা বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, যাত্রী এবং গ্রাহক সেবায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সচরাচর দেখতে পাই বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে। এই ঊর্ধ্বগামী প্রবণতা গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি। সাধারণ জনগণও অর্থনৈতিক সুবিধার সাথে সম্পৃক্ত।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের চাকা এক সাথে চলতে হবে এবং এর সুষম বণ্টন জাতীয় সমৃদ্ধির সহায়ক। কিন্তু আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে এর সার্বিক উন্নতির যেন কোন ন্যায়সঙ্গত সাদৃশ্য নেই। জাতীয় আয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ২০২০ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৩৪ শতাংশ ছিল অর্থাৎ ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত ত্রিশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ সালে এই ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থনীতির হিসাব- নিকাশ না জানলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা বোঝা খুবই সহজ যে আমেরিকা এক ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে আমেরিকার ঋণের পরিমাণ অর্থনীতির আকারের দ্বিগুণ হবে অর্থাৎ প্রায় আশি ট্রিলিয়ন।
প্রাচীন ভারতের খ্যাতিমান ঋষি এবং পণ্ডিতদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তক্ষশীলায় জš§ গ্রহণকারী রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মন্ত্রী চানক্য। তার মতে ঋণগ্রস্তরা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী অসুখী এবং ঋন গ্রহনকারী পিতা যদি উশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য ঋণগ্রস্ত হন তাহলে পুত্রের চোখে সেই পিতা চরম শত্রু। একটি দেশের জন্যও এটি প্রযোজ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই
ঋণগ্রহণের ব্যাধি শুরু হয়েছে বলা যায় জন্মলগ্ন থেকেই। ১৭৯০ সালে বিপ্লবী যুদ্ধের পর পরই মার্কিন সরকার নিজেকে প্রথম ঋণের মধ্যে খুঁজে পায়। তারপর থেকেই এই ঋণের বোঝা দিন দিন ঊর্ধ্বগামী হতে থাকে, শধু একের পর এক যুদ্ধ বাধিয়ে এবং কখনো অর্থনৈতিক মন্দার কারণে। বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার আর প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখার জন্যই অন্যায়ভাবে যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং যুদ্ধে জড়িয়ে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল সাজার এই পরিণতি। বাংলায় সহজ ভাষায় যাকে বলে পরের ধনে পোদ্দারি।
আমেরিকানরা যানে না যে এই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই নিতে হবে। ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট ফেডারেল ঋণের পরিমাণ ছিল মাথাপিছু প্রায় ৮১০০০ মার্কিন ডলার এবং এর পরিমাণ দিন দিন ঊর্ধ্বগতির দিকে। এখানেই শেষ নয়।
সিএনবিসি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে আমেরিকান নাগরিক ব্যক্তিগত ঋণে জর্জরিত মাথাপিছু প্রায় একানব্বই হাজার। আশা করি এই ছোট্ট পরিসংখ্যান থেকে এইটা অনুধাবন করতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না যে আমেরিকা আসলেই একটি ঋণগ্রস্ত দেশ যার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ভয়ানক। যদি কোনো কারণে বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস নামে তাহলে জাতীয় এবং সামাজিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী।
কয়েকটি দিকে নজর দেয়ার চেষ্টা করবো এই লেখায়। দরিদ্রতার প্রসঙ্গটিই ধরা যাক। আমরা দরিদ্র বলতে বুঝি আফ্রিকা, এশিয়া আর লাতিন আমেরিকার স্বল্প আয়ের দেশগুলোর সমস্যা। কিছুদিন আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকেও খুব গরিব দেশ হিসেবে দেখা হতো। এমন কি উন্নত বিশ্বের অনেক শিক্ষিত সচেতন মানুষও বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে এবং শিগগিরই একটি উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। উন্নত দেশগুলো মানুষেরা স্বল্প উন্নত দেশগুলোর সম্পর্কে এই জাতীয় উদাসীনতা আর উন্নাসিকতা দেখে মাঝে মাঝে সত্যিই বিস্মিত হই। অথচ আমাদের দেশের সচেতন ছেলেমেয়েদের অন্যদের সম্পর্কে জানার কতো না আগ্রহ এবং কৌতূহল! দারিদ্র্য শুধু একটি উদীয়মান বাজার সমস্যা নয়। সেন্সাস ব্যুরো অনুসারে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র জনসংখ্যার ১৪.৪ শতাংশ কিংবা ৪৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ সরকারিভাবে দরিদ্র। তার মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ ১৯.৫ শতাংশ এবং শ্বেতাঙ্গদের সর্বনি¤œ ৮.২ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হিসবে বিবেচনা করা হয় অথচ এই শক্তিশালী দেশেও বৃহৎ জনগোষ্ঠী দরিদ্রের মধ্যে বাস করে।
অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে চায় না। বরং পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের ধারনা রাশিয়া একটি দরিদ্র দেশ যেখানে মানুষের জীবন যাত্রার মান অত্যন্ত অসহনীয় পর্যায়ে। ২০২০ সালে রাশিয়ায় দরিদ্রতার হার মাত্র ১২.১ শতাংশ এবং ইইউতে প্রায় ৯৭ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্য বা সামাজিক বর্জনের ঝুঁকিতে ছিল যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জনসংখ্যার ২১.৯ শতাংশের সমতুল্য। আশা করি এই তথ্যগুলো থেকে বুঝতে আর কোন অসুবিধা হওয়ার অবকাশ নেই দরিদ্রতার অবস্থান কোথায় বেশি। তবে নিন্দুকেরা এই জাতীয় পরিসংখ্যা মানতে নারাজ। তাদের যুক্তিতে ইউরোপিয়ান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্রতা উন্নতমানের দারিদ্র্য!
উন্নত বিশ্বের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দরিদ্রতার হার সবচেয়ে বেশি। তাছাড়াও অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে আয় ও সম্পদের বৈষম্যের মাত্রাও চরম পর্যায়ে। তবে এটা ঠিক মার্কিনি দরিদ্রতা আর আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের দরিদ্রতা এক নয়। কারণ সোশ্যাল সিকিউরিটির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে শারীরিক দরিদ্রতা স্পষ্টতই কম চরমে।
দুর্ভিক্ষ এবং অপুষ্টিজনিত কারণে শিশু মৃত্যুর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে নেই যা অন্যত্র দৃশ্যমান। দারিদ্র্যকে যদি পরম আর আপেক্ষিক দরিদ্রতার মাপকাঠিতে দেখি তাহলে পরম দরিদ্রতা সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দরিদ্র দেশগুলোতেই দেখতে পাওয়া যায়, যেখনে সাধারণ মানুষ নিজের বা পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কিংবা পরিষ্কার পানীয় জল সরবরাহ করতে অক্ষম। আর আপেক্ষিক দরিদ্রতা প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করে যেখানে একটি সামাজিক গোষ্ঠী অন্যদের সাথে তুলনা করে। মার্কিনি দরিদ্রতাকে আপেক্ষিক দরিদ্রতার সাথেই তুলনা করা উচিত। তারপরেও তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যের হার রাশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যের হার উন্নত বিশ্বের প্রথম ২৫টি দেশর তুলনায় অনেক বেশি এবং খুব চরম পর্যায়ে। দারিদ্র্যের সামগ্রিক হার যেখানে ২৫টি দেশের গড় প্রায় ১১ শতাংশ সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হার প্রায় ১৮ শতাংশ। স্কেন্ডেনেভিয়ান দেশগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম। যেমন ডেনমার্কে এই হার মাত্র ৫.৫ শতাংশ।
তবে উপসংহারে এটা বলা হয়তো খুব একটা ভুল হবে না যে, একটি দরিদ্র দেশে ধনী হওয়া যেমন ভালো তেমনি একটি ধনী দেশেও দরিদ্র হওয়া মন্দ নয়। কারণ উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশেই জনগণের ভরণ-পোষণের দায়িত্বে সরকার প্রদত্ত সোশ্যাল সিকিউরিটির ব্যবস্থা আছে। তাই একটি উন্নততর জীবনযাত্রার মান উপভোগ করার সর্বোত্তম সুযোগ হলো একটি ধনী দেশে বসবাস করা। তবে আমেরিকা সম্পর্কে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, যত গর্জে তত বর্ষে না। আমেরিকা বৃহৎ অর্থনীতির দেশ বলে আমেরিকাকে সুখ ও শান্তির অভয়ারণ্য ভাবার কোনো কারণ নেই। হাল হকিকত দেখে সহজেই অনুমান করা যায় খুব শিগগিরই আমেরিকার প্রসব বেদনা শুরু হবে। প্রতি এক হাজারের মধ্যে যেখানে একজন আমেরিকন কোভিডে মারা যায় সে দেশকে দরিদ্র
ছাড়া আর কিইবা বলা যায়। একি শুধু স্বাস্থ্য দারিদ্র্য? একটা ধনী দেশে এমন ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অবশ্যই দরিদ্রতারবিশেষ লক্ষন। গড় আমেরিকানরা এখন গুরুতরভাবে অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র। প্রতিটি নাগরিক ঋণে জর্জরিত। একটি জীবন চলে যায় তার পরেও ঋণ অদেয় থেকে যায়। প্রায় ৭০ শতাংশ আমেরিকানরা বেসিক বিল দিতে পারে না, সঞ্চয় তো দূরের কথা।
আমেরিকান অর্থনীতি এখন মূলত নি¤œ বেতনের চাকরিজীবীদের আধিপত্যে রয়েছে। এ যেন এক ভিক্টোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থা।
অর্থাৎ কার্যকরভাবে অল্প সংখ্যক অত্যধিক ধনী ব্যক্তির সেবক হয়ে আছে বাকি জনগোষ্ঠী। ভেঙ্গে পড়েছে মধ্যবিত্তের সামাজিক অবকাঠামো, বিপর্যস্ত শ্রমিক শ্রেণী। পরিসংখ্যানের হিসাব আর বাস্তবের দেখা কোনো বিমূর্ত নয়। তা সত্যি সত্যি মানুষের যন্ত্রণা আর চরম বেদনারই প্রতিনিধিত্ব করে যা বাহ্যিক চাকচিক্য আর জিডিপির সংখ্যায় অদৃশ্য মনে হয়।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক এবং কলামিস্ট



