অর্থনীতি ও বাণিজ্যপ্রধান খবর

শ্রীলঙ্কার ঋণের অর্থ স্থগিতের পর সতর্ক বাংলাদেশ

শর্ত পূরণ না হওয়ায় শ্রীলঙ্কার ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থছাড় স্থগিত করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বাংলাদেশের সামনে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের সময়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। ইতিমধ্যেই আইএমএফের কিছু শর্ত বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার। এক্ষেত্রে আরও কিছু নতুন সিদ্ধান্ত নেবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইএমএফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের আগে আগের শর্তানুযায়ী কাজ করছে সরকার। রিজার্ভ, বাজারভিত্তিক ডলারে রেট, ঋণখেলাপি, রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার, তারল্য ব্যবস্থাপনাসহ ৪৭ শর্তে আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়। বাংলাদেশ অধিকাংশ শর্ত পূরণ করতে পারলেও রিজার্ভে উন্নতি, কর-জিডিপি অনুপাত এবং বাজারভিত্তিক ডলার রেট নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। যদিও রিজার্ভের দিক থেকে শ্রীলঙ্কা থেকে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ। এসব বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হওয়ায় শর্তপূরণে আরও সময় পেতে পারে বাংলাদেশ।

এদিকে সম্প্রতি আইএমএফ শ্রীলঙ্কার ঋণ কর্মসূচির প্রথম পর্যালোচনা শেষ করেছে। এতে আইএমএফ মতামত দিয়েছে, দেশটির সরকার শর্তানুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। এজন্য দেশটিকে আরও কর আদায় করতে হবে। গত বছরের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কা প্রথমবারের মতো তাদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। দেশটির বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। যেসব বেসরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়েছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে ঋণ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এখনো শেষ হয়নি। চলতি মাসের শুরুর দিকে শর্ত পূরণ না হওয়ায় শ্রীলঙ্কার ঋণের অর্থছাড় স্থগিত করেছে আইএমএফ।

অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত শ্রীলঙ্কা নীতি সুদহার ১০০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত আসার আগে আইএমএফ শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ আটকে দিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে যে, তাদের প্রধান সুদের হার কমিয়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির হার গত মাসে দ্রুত কমে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এক বছর আগে মূল্যস্ফীতির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল ৭০ শতাংশ।

গেল মার্চ মাসে আইএমএফের সঙ্গে কলম্বোর সরকার ২৯০ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তিতে পৌঁছায়। চার বছর মেয়াদে এই অর্থ ছাড় করার কথা ছিল। শ্রীলঙ্কা আশা করেছিল যে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে। কিন্তু দ্বিতীয় কিস্তির ৩৩ কোটি ডলারই তারা পায়নি। এদিকে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি বিবেচনা করে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। বেশকিছু বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এর মধ্যে আলাদা দুটি সার্কুলারের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গত সপ্তাহে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে ঋণের সুদহার বাড়ানোর এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে নীতি সুদহার বা রেপো রেটও দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সুদহার বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঋণের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এখন থেকে সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল বা স্মার্ট রেটের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মার্জিন যোগ করতে পারবে। চলতি বছরের ২৩ জুলাই বাজারভিত্তিক এ সুদনীতি প্রচলন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন থেকে স্মার্ট রেটের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ মার্জিন যোগ করার নীতির চর্চা হয়ে আসছিল। একইভাবে প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণ এবং কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্মার্ট রেটের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ শতাংশের স্থলে ২ দশমিক ৫ শতাংশ মার্জিন নির্ধারণ করা যাবে।

সুদহার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে। মূল্যস্ফীতি পর্যায়ক্রমে হ্রাস করার লক্ষ্যে সুদহার বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সুদহার বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত নতুনভাবে বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে প্রযোজ্য হবে।

চলতি অক্টোবরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত স্মার্ট রেট হলো ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর সঙ্গে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মার্জিন যুক্ত হলে ব্যাংক ঋণের সুদহার দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা ছিল।

ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইএমএফের চাপ থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করছে। এরই মধ্যে প্রতিনিধি দলটি কয়েক দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছে। সংস্থাটির কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ প্রাপ্তির শর্ত হিসেবে দেশের ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রম চলছে।
দাতা সংস্থাটির ঋণ দেওয়ার শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে ব্যাংক ঋণের বাজারভিত্তিক সুদহার নির্ধারিত হচ্ছে, যা স্মার্ট বা সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল হিসেবে পরিচিত। প্রতি মাসের শুরুতে এ স্মার্ট রেট জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত জুলাইয়ে স্মার্ট রেট ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর থেকে এ হার বাড়তির দিকে রয়েছে। চলতি অক্টোবরের জন্য স্মার্ট রেট ৭ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এছাড়া সরকার জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করার ঘোষণাও দিয়েছে। আগামী বছর থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু করবে। যদিও এর সরকার ঘোষণা দিয়েছিল গত সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত সমন্বয় করবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে সরকার।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ফর্মুলাভিত্তিক মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন শুরু করতে আইএমএফের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার। এটি আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে।

এছাড়া রাজস্ব বিভাগের সংস্কারে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর অব্যাহতিসহ বেশকিছু বিষয়ে নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে। এজন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে বকেয়া কর আদায়ে কাজ করছে।
এদিকে আগে থেকেই সরকার আইএমএফের ফর্মুলা অনুযায়ী রিজার্ভ গণনা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আইএমএফের শর্তানুযায়ী, সেপ্টেম্বরে নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভের (এনআইআর) পরিমাণ ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রাখার কথা ছিল। জুলাইয়ের জন্য ছিল ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ রিজার্ভ রয়েছে ২১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। আর সেখান থেকে অন্যান্য দায় বাদ দিলে রিজার্ভ ১৮ বিলিয়নের নিচে নেমে যায়। রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য আইএমএফ কিছু শর্ত দিয়ে আরও সময় দিতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

আইএমএফের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, আইএমএফের সঙ্গে গভর্নরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক দল অংশ নেয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিশদ আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে। তবে সুদহার কমানোর বিষয়ে আইএমএফের চাপের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাজারে অর্থের সরবরাহ কমানো দরকার। এজন্য নীতি সুদহারের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদহারও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension