প্রধান খবরবাংলাদেশ

সুধী সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধার বক্তব্যে জামায়াত নেতার বাধা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশের আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক সুধী সমাবেশে এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বক্তব্য দেওয়ার সময় বাধা দিয়ে থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। এমনকি বক্তব্য শেষ শেষ করতে না দিয়ে ওই মুক্তিযোদ্ধার হাত থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শনিবার (২৬ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে জেলা শহরের শহীদ সাটু হল অডিটোরিয়ামে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে জেলা পুলিশ আয়োজিত সুধী সমাবেশে এই ঘটনা ঘটে।

ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মো. তরিকুল আলম। তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ইউনিটের সাবেক সহকারী কমান্ডার ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।

তাকে বাধা দিয়েছেন জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য লতিফুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ দিকে বক্তব্য দিচ্ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো.তরিকুল আলম।

এদিকে ওই ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যালে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা গেছে, বক্তব্য দিতে গিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টকে না মেলানোর আহবান জানান মুক্তিযোদ্ধা মো.তরিকুল। এ সময় সামনের সারিতে বসা জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান উত্তেজিত হয়ে আঙুল উঁচিয়ে তার দিকে তেড়ে যান। চিৎকার করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য থামাতে বলেন।

এ সময় তিনি বলতে থাকেন, এই ফ্যাসিস্টকে কে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ সময় জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির কেউ কেউও চিৎকার শুরু করেন। একজন তাকে মাইক্রোফোন দিয়ে দিতে বলেন। এ সময় সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মতিউর রহমান তরিকুলে হাত থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে নেন।

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা তরিকুল আলম বলেন, আমি যা বলতে চেয়েছিলাম, বাধার মুখে আমাকে তা বলতে দেওয়া হয়নি। আমার বক্তব্য শেষ করতে দেওয়া হয়নি।

এরপর তিনি মঞ্চে উঠে প্রধান অতিথিকে কানে কানে কিছু একটা বলে মঞ্চ থেকে নেমে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

এরপর ওই জামায়াত নেতা মাইক্রোফোন নিয়ে বলেন, পাঁচ আগস্ট বিরোধী কথা আমরা শুনতে প্রস্তুত না। ১৬ বছর আমাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।আমরা পাঁচ নেতাকে হারিয়েছি ফাঁসির মঞ্চে। নেতাকর্মীরা গুম হয়েছে, আয়না ঘরেও কাটিয়েছে, হত্যার শিকার হয়েছে। তাই আমরা এই মতবিনিময় সভায় ওই সব বক্তব্য শোনার জন্য প্রস্তুত নই। এরপর তিনি বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট বক্তব্য রাখেন।

পরে এক প্রশ্নের জবাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা তরিকুল আলম জানান, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনকে আমি অস্বীকার করি না। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধা করি। আহত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি আছে। কিন্তু আমাকে এ কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তার আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, অপ্রত্যাশিত। এতে হতাশ হয়েছি।

দাওয়াত করা প্রসঙ্গে তার দাবি, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে দাওয়াত করা হয়েছিলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান বলেন, উনি শুরুতেই পাঁচ আগস্টকে নিয়ে গুরুত্বহীন কথা বলা শুরু করলে আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বলেছি বিতর্কিত কোনো কথা এখানে না বলাই ভালো। কিন্তু উনি আওয়ামী লীগের মানুষ, তাই পাঁচ আগস্টকে স্বীকার করতে চান না। এটা দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, এখানে জেলার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক সুধী সমাবেশ ছিলো। এখানে ৭১ কেন আসবে আর পাঁচ আগস্টই কেন আসবে? উনি পাঁচ আগস্টকে টেনে নেগেটিভ কথা বেলায় জনগণ এটার প্রতিবাদ করেছে।

এ ঘটনার পর সমাবেশে রাজশাহী রেঞ্জের উপ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান, জেলা পুলিশ সুপার রেজাউল করিমসহ কয়েকজন বক্তব্য দিলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে শেষে সমাপণী বক্তব্যে পুলিশ সুপার এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে এ অনুষ্ঠানে কয়েকজনকে আমন্ত্রণ না জানানোর কথা বললেও কারো নাম উল্লেখ করেন নাই।

তবে জেলা পুলিশ সুপার রেজাউল করিম মুঠোফোনে জানান, অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলাই আমাদের কাম্য নয়। যে বিশৃঙ্খলাটুকু হয়েছে এটা অপ্রত্যাশিত।

তিনি বলেন, ওই মুক্তিযোদ্ধা হয়তো একটা পয়েন্টে কথা বলতে চেয়েছিলেন। যাতে অন্যরা হয়তো দ্বিমত করেছেন।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, নিমন্ত্রণ ছাড়াই অনেকেই অনুষ্ঠানে আসে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, একটা সুন্দর পরিবেশ; যেখানে শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান দেখানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো। সেখানে পুরো বিষয়টি আমাদের কাছে কাঙ্খিত ছিলো না। আমরা কোনটাই চাই নাই।

এদিকে শনিবার ঘটনায় রোববার হট্টগোলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে পক্ষে বিপক্ষে কিছু মতামত লক্ষ্য করা গেছে।

সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের ) সভাপতি মো. আসলাম কবির বলেন, কোনো বক্তা যেহেতু একাত্তরকে টেনে বক্তব্য দেয়নি। তাই তিনিও আইনশৃঙঙ্খলার সভায় এমনটা না করলেই পারতেন। আর সুধীজনদের নিয়ে এ সমাবেশে তার সঙ্গে এমন আচরণও কাম্য ছিলনা। সব মিলিয়ে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা কাম্য ছিলনা।

বিএনপি দলীয় সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, আমি ওখানে ছিলাম না। তাই কোনো মন্তব্য করবো না। তবে এ ধরনের ঘটনা অগ্রহণযোগ্য ও কাম্য ছিলনা।

এদিকে জেলা পুলিশের একটি গ্রুপে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ বা ফ্যাসিস্ট সরকারের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে সভায় ট্রাক মালিক সমিতির কথিত সভাপতির উপস্থিতি সম্পর্কে পুলিশ অবগত ছিলনা বলে জানিয়েছে। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

একাত্তর টেলিভশন

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension