
বরিশাল সিটি কলেজ: মব করে কলেজ দখলে জামায়াত নেতারা
শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বরিশাল সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন বিএনপি অনুসারী শিক্ষক হাওলাদার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। তবে ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মব সৃষ্টি করে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করান ওই কলেজের সহকারী অধ্যাপক মহানগর খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন ও জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার।
খেলাফত মজলিস নেতা মোয়াজ্জেম হোসেনকে তখন বলা হয়, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হবে। কিন্তু শাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগ করানোর পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হয় জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও মহানগর কর্মপরিষদ সুরা সদস্য মো. হাবিবুর রহমানকে। একই সময় কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারি চাখার কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও জামায়াতে ইসলামের রুকন অধ্যাপক মো. আব্দুর রবকে। এরপর পুরো কলেজটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন জামায়াত নেতারা।
খেলাফত মজলিস নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন
এসব ঘটনার প্রতিবাদ করেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার নিশ্চয়তা দিয়ে তাঁকে দমিয়ে রাখা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জামায়াত নেতা হাবিবুর রহমান অবসরে যান। অভিযোগ পাওয়া গেছে, তখন চারজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে টপকিয়ে আগের মতো মব সৃষ্টি করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার।
এ অবস্থায় খেলাফত মজলিস নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আদালতে মামলা দায়ের করলে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রব ও অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এর পর থেকে পুরো কলেজ জামায়াতে ইসলামের কিছু নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
খেলাফত মজলিস বরিশাল মহানগর শাখার সহসভাপতি ও সিটি কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর কিছু নেতার নেতৃত্বে মবের শিকার হন। তখন তাঁর কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে পুরো কলেজ নিয়ন্ত্রণের জন্য আব্দুল জব্বারের নেতৃত্বে মব সৃষ্টি করা হয়। এরপর দায়িত্ব দেওয়া হয় জামায়াত নেতা হাবিবুর রহমানকে।
হাবিবুর রহমান অবসরে গেলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল আমার। কিন্তু কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জামায়াত নেতা আবদুর রবকে দিয়ে অফিস আদেশের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়ে যান আব্দুল জব্বার। আমি এর প্রতিবাদে আদালতে মামলা দায়ের করি। আদালত কারণ দর্শানোর জন্য বলেন এবং কার্যক্রম স্থগিত রাখার আদেশ দেন। এর পরও কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রব ও অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার আমাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। পরে আমাকে শর্ত দেওয়া হয় মামলা তুলে নেওয়ার। গত ৬ তারিখ আমি মামলা তুলে নিলে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।’ মোয়াজ্জেম দাবি করেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আব্দুল জব্বার ছিলেন চতুর্থ। কিন্তু মব সৃষ্টি করে তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়ে গেছেন। মোয়াজ্জেম বলেন, ‘মামলা তুলে নেওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। কারণ পুরো কলেজ এখন জামায়াতে ইসলামীর কয়েক নেতার নিয়ন্ত্রণে।’
কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন রবিবার দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দিনটি আমার কাছে কালো অধ্যায়ের মতো। যদিও এর আগে দীর্ঘদিন ধরেই আমাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে। কিন্তু ওই ২১ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে কলেজের সহকারী অধ্যাপক মহানগর খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন ও অন্য সহকারী অধ্যাপক জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করেন পদত্যাগপত্র লেখা কাগজ নিয়ে। তাতে লেখা ছিল আমি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমি তাতে স্বাক্ষর দিতে রাজি হইনি। পরে আমার ওপর নির্যাতন চালিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলাম। তবে ওই সময় কলেজের পরিবেশ ছিল খুবই ভয়াবহ।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদককে বরিশাল সিটি কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, কলেজে বর্তমানে ৩৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং অন্য দুজন প্রভাষক ছাড়া জামায়াতের অনুসারী অন্য কোনো শিক্ষক নেই। কিন্তু কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারীদের তটস্থ করে রাখেন তাঁরা। তাঁদের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলেই মব সৃষ্টি করেন। যেমনটি দুবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং সভাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। এই শিক্ষকদের মতে, এবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে প্রথম নাম ছিল ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের। কারণ তিনি বর্তমানে কলেজের সবার জ্যেষ্ঠ। এর পরে রয়েছেন দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ারা বেগম। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তৃতীয় ছিলেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা বেগম। ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল জব্বার ছিলেন চতুর্থ অবস্থানে। কিন্তু কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জামায়াত নেতা আব্দুর রব অফিস আদেশে আব্দুল জব্বারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। আর এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় মোয়াজ্জেম হোসেনকে বরখাস্ত করা হয়। তবে কেউই প্রতিবাদ করতে পারেননি। এখন জামায়াতের এই নেতাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও কেউ করতে পারছেন না।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার গত রবিবার দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে আলাপকালে বলেন, ‘আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালন করছি। এখানে মবের কোনো বিষয় নেই। আর মোয়াজ্জেম হোসেন জ্যেষ্ঠ হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে।’ সাবেক অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যাঁরা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন কেবল তাঁরাই বলতে পারবেন।’ তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রবের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর সেলফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।



