
সেনাবাহিনী ও ইমরান খান মুখোমুখি
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খানকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দেশটির সেনাবাহিনী ও সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়িয়েছেন। এ ঘটনার নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ছাড়াও সেনাবাহিনীর এক মেজর রয়েছেন বলে দাবি করেন ইমরান খান। তারপর থেকেই এ নিয়ে বেশ শোরগোল শুরু হয়েছে। তবে ইমরান খানের দাবি ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তা উড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনা কর্মকর্তাকে দায়ী করে কেউ পার পাবে না বলে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সেনাবাহিনী, তাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এ ঘটনায় মামলা নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তাতে করে ইমরান খান ও সেনাবাহিনী যে মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়িয়েছেন—সে বিষয়টি এখন দৃশ্যমান।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাঞ্জাবের ওয়াজিরাবাদে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় বন্দুকধারীর গুলিতে আহত হন ইমরান খান। তার ডান পায়ে তিন থেকে চারটি গুলি লাগে। ঘটনার পরপরই তাকে লাহোরের একটি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ইমরান খান বেঁচে গেলেও তার দলের এক কর্মী নিহত হন। আহত হয় আরও ১৩ জন। এ ঘটনায় এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি একজন চরমপন্থি। তবে ইমরান খান এ কথা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি চরমপন্থি নয়। এর পেছনে অন্য কাহিনি রয়েছে। তিনি বলেছেন, পুরো ঘটনার পেছনে তিন ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। তারা হলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ও সেনাবাহিনীর মেজর ফয়সাল। গত শুক্রবার হাসপাতাল থেকে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি জোর দিয়ে এ দাবি করেন। এর পরদিন গতকাল শনিবার সেনাবাহিনী তার দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলে, ইমরান খানের দাবি ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ (আইএসপিআর) পরিদপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, সামরিক বাহিনী এবং বিশেষ করে একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পিটিআই চেয়ারম্যানের ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিযোগ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ও অযাচিত।
বিবৃতিতে সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা বলেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী শক্তিশালী ও অত্যন্ত কার্যকর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থা মেনে চলা একটি অত্যন্ত পেশাদার ও সুশৃঙ্খল সংস্থা হিসেবে নিজেদের নিয়ে গর্ব করে। যদি ইউনিফর্ম পরিহিত কোনো কর্মী বেআইনি কাজে জড়ান, তার ওপর এই জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এতে বলা হয়, স্বার্থান্বেষী মহল যদি ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে বাহিনীর কোনো সাধারণ সদস্যেরও সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তাহলে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান তার কর্মকর্তা ও সেনাদের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। বিবৃতিতে বলা হয়, আজকে সামরিক বাহিনী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং খুবই নিন্দনীয়। সামরিক বাহিনী কিংবা কোনো সেনার মানহানি করে কাউকে পার পেয়ে যেতে দেওয়া হবে না।
এতে আরও বলা হয়, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে ঘটনাটি তদন্তের জন্য এবং কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বাহিনী ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানহানি ও মিথ্যা অভিযোগের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মামলা নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা ইমরান খান ও দেশটির সেনাবাহিনী যে এখন মুখোমুখি অবস্থায়—সে বিষয়টিকে বেশ দৃশ্যমান করে তুলছে। মামলার অভিযোগ থেকে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার নাম বাদ দিতে ইমরান খান অস্বীকৃতি জানালে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ মামলায় নাম রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও।
জানা যায়, মামলায় সেনা কর্মকর্তার নাম রাখার বিষয়ে অব্যাহতভাবে তাগাদা দিয়ে আসছেন ইমরান খান। এতে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থার মধ্যে পড়েছেন ইমরান খানের মিত্র পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী পারভেজ এলাহি। বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার পাঞ্জাবের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। এতে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ফয়সাল শাহকারের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা এবং প্রাদেশিক আইনমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ডনকে বলেন, বৈঠকে মামলার সব আইনি দিক সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, বৈঠকে প্রতিবন্ধকতার বিষয়েও আলোচনা হয়। ঘটনার রাজনৈতিক দিক উল্লেখ করে সূত্রটি বলেছে, মামলায় জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার নাম দেওয়ার ‘যুক্তির’ বিপক্ষে মুখ্যমন্ত্রী এলাহি। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। মামলায় সেনা কর্মকর্তার নাম না দেওয়ার বিষয়ে তাদের রাজি করানোর চেষ্টা করেন মুখ্যমন্ত্রী। কারণ, মামলায় সেনা কর্মকর্তার নাম থাকলে পরিস্থিতি খুব বেশি ঘোলাটে হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। আর তাতে পিটিআই-ই ভবিষ্যতে অনেক বিপদে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করছেন।



