
৭৩ বছর পর আবারও গণকবরের প্রস্তুতি, কীসের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র?
ভবিষ্যতে বড় ধরনের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় প্রথমবারের মতো গণকবর খননের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর এই প্রথম মার্কিন সেনাদের এমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন সাময়িকী নিউজউইকের এক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখনই এ ধরনের সামরিক প্রস্তুতির খবর সামনে এলো।
গত মাসে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে অন্তত ২২ জন মার্কিন সামরিক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা পেন্টাগনের প্রকাশিত তথ্যভান্ডারে থাকা সংখ্যার চেয়ে চারজন বেশি। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ওই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন।
নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অপারেশন ড্রাগন কোভেন্যান্ট ফেজ-২’ নামের এই মহড়া গত মাসে শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ব্র্যাগে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
এতে অংশ নেন থার্ড কর্পস সাসটেইনমেন্ট কমান্ড ও ২০তম ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের সেনাসদস্যরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন সামরিক ধর্মযাজক এবং ধর্মীয় সহায়তা কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা অন্যান্য কর্মকর্তারা।
বুলডোজার, খননযন্ত্রসহ ভারী সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে তারা অস্থায়ী গণকবর তৈরি এবং বড় ধরনের যুদ্ধে নিহত সেনাদের লাশ ব্যবস্থাপনার অনুশীলন করেন।
মার্কিন সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোরীয় যুদ্ধের পর এত বড় পরিসরে অস্থায়ী গণকবর তৈরির প্রয়োজন তাদের আর হয়নি। ওই যুদ্ধে ৩৬ হাজার ৫১৫ জন মার্কিন সেনা নিহত বা নিখোঁজ হন। এ ছাড়া ৭ হাজার ২৪৫ জন বন্দি হন।
নিউজউইকের প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে বলা হয়, গত ২৫ বছরে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে নিহত মার্কিন সেনাদের লাশ দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ফলে বড় পরিসরে অস্থায়ী কবরস্থানের প্রয়োজন হয়নি।
তবে নতুন এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যতে হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে, তার প্রস্তুতি নেওয়া। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি সেনার জন্য আলাদা কবর তৈরি কিংবা পৃথক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এ ছাড়া মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলার সময়ও যুদ্ধের কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে পারে। সে বিষয়টিও প্রশিক্ষণে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর প্রচলিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি অস্থায়ী গণকবরস্থানে পাঁচটি দীর্ঘ পরিখা থাকে। এতে সর্বোচ্চ ১০০ জনের লাশ সমাহিত করার ব্যবস্থা রাখা যায়।
নর্থ ক্যারোলাইনার মহড়ায় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রতিটি কবরের জায়গা প্রস্তুত করতে গড়ে এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় লেগেছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, আটটি বুলডোজার ও চারটি সামরিক খননযন্ত্র ব্যবহার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ সেনার লাশ অস্থায়ীভাবে সমাহিত করা সম্ভব।
প্রশিক্ষণে লাশ সংরক্ষণের বিষয়টিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যাতে পরবর্তী সময়ে নিহত সেনাদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
সামরিক বিধি অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে নিহত সেনাদের লাশ যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতে পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সব পর্যায়ের কমান্ডারদের।
থার্ড কর্পস সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস ডেলবার্ট রুডে নিউজউইককে বলেন, যুদ্ধের সময় নিহত সেনাদের লাশ কীভাবে ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সমাহিত করা যায়, তা মূল্যায়নে এই মহড়া সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে তাৎক্ষণিক ও অপরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে একটি সুশৃঙ্খল এবং বাস্তবে পরীক্ষিত পদ্ধতি গড়ে তোলাই এই প্রশিক্ষণের লক্ষ্য।
সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, ২০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম মার্কিন সেনাবাহিনীর ধর্মযাজক ও ধর্মীয় সহায়তা বিভাগের সদস্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে নিহত সেনাদের সমাহিত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।



