
৯/১১ হামলার আগাম হুঁশিয়ারি কেন উপেক্ষিত হয়েছিল?
তৌহিদুর রহমান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে জানিয়ে আগেই সাবধান করা হয়েছিল। ওদিন আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা চারটি বিমান ছিনতাই করে দু’টি দিয়ে আঘাত করে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্তার টুইন টাওয়ারে। একটি দিয়ে আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। আরেকটি একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় প্রায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ। ভয়াবহ এই হামলা স্তম্ভিত করে দিয়েছিল পুরো পৃথিবীর মানুষকে। ঘটনাটি ছিল যেন অকল্পনীয়। কী করে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন একটা আক্রমণ ঘটে যেতে পারল- কেউই যেন তা ভাবতে পারছিলেন না।
তবে কেউ কেউ এ হামলার কথা আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। হামলার অনেক আগে থেকেই পুরো বছর জুড়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছিল যে আমেরিকায় যে কোনো মুহূর্তে একটা সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। সিআইএ, এফবিআই, মার্কিন কংগ্রেস কমিশন – সবাই এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল। এমনকি এমন সতর্কবাণীও দেয়া হয়েছিল যে উড়ন্ত বিমান দিয়ে উঁচু ভবনে আঘাত করা হতে পারে। কংগ্রেসের কমিশন বারবার সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল যেন তারা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়। ওই কমিশনের তখনকার প্রধান ছিলেন সিনেটর হ্যারি হার্ট।
সিনেটর গ্যারি হার্ট বলেছেন সে গল্প। ২০০১ সালের গ্রীষ্মকাল জুড়েই সতর্কবার্তা আসছিল যে, একটি বড় আকারের সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। সে আক্রমণ ঘটতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই। সিনেটর হার্ট বা অন্য কেউ এটা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন কোন্দিক থেকে আক্রমণটা আসতে পারে। কিন্তু তারা পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন যে আমেরিকায় কোনো একটা হামলা হতে যাচ্ছে এবং তা খুব তাড়াতাড়িই হতে যাচ্ছে।
গ্যারি হার্ট সে সময় ছিলেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি কংগ্রেস কমিশনের প্রধান। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হতে চেয়ে মনোনয়ন পেতে লড়াইও করেছিলেন। ১১ সেপ্টেম্বর হামলার আট মাস আগে গ্যারি হার্ট এবং রিপাবলিকান ওয়ারেন রাডম্যান একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন। রিপোর্টটি আড়াই বছর তদন্তের পর তৈরি করা হয়েছিল। ওই রিপোর্টের বিষয়বস্তু ছিল ‘নতুন শতাব্দীতে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো কি ধরনের হবে। এ জন্য কমিশন ২০টি দেশের শতাধিক লোকের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিল। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বিশদ পর্যালোচনা। বিদেশনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ে আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের সমাবেশ ঘটেছিল এই কমিশনে। তারা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন তা ছিল খুবই গুরুতর।
কমিশনের এগারো জন সদস্য সব তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করেন, আমেরিকানরা একটা স্পষ্ট এবং বিদ্যমান ঝুঁকির সম্মুখীন যে, দেশের মাটিতেই তারা মারা যাবো, এবং সম্ভবত বড় সংখ্যায়।
সিনেটর গ্যারি হার্ট জানান, ওই রিপোর্ট জমা দিয়ে তারা একটা সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে উপস্থাপনার মাঝামাঝি পর্যায়ে একজন সাংবাদিক উঠে দাঁড়ালেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি চলে যাচ্ছেন কেন? জবাবে সাংবাদিকটি বলেছিলেন, এসব কিছুই আসলে ঘটবে না। সে ভদ্রলোক ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন সিনিয়র রিপোর্টার। অর্থাৎ মিডিয়াতে কমিশনের বক্তব্য প্রায় আসেই নি।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়াও এর চেয়ে খুব বেশি ভালো ছিল না। এই কমিশনটি গঠন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন। তবে ২০০১ সালের জানুয়ারি নাগাদ যখন এই রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়, তখন হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট এসেছেন। রিপাব্লিকান জর্জ বুশ তার মাত্র ১১ দিন আগে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। গ্যারি হার্টরা হয়ত ভেবেছিলেন নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের রিপোর্টটি হাতে পাবেন।
নতুন প্রেসিডেন্টের হাতে রিপোর্টটি তুলে দেয়ার তাদের ওপর নির্দেশ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রেসিডেন্টে তাদের সঙ্গে দেখা করেন নি। তখন তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড চেনির সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেটি করতেও ব্যর্থ হলেন। তবেপররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড, এবং প্রেসিডেন্ট বুশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কন্ডোলিজা রাইসের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলেন।
সিনেটর গ্যারি মনে করেন, দুই মন্ত্রী রিপোর্টটাকে বেশ আগ্রহের সঙ্গেই নিয়েছিলেন, তাদেরকে কিছু প্রশ্নও করেছিলেন তারা। ডোনাল্ড রামসফেল্ড একটি হলুদ রঙের নোটবই বের করে বেশ কিছু নোট নিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া কিন্তু হয় নি।
বুশ প্রশাসন পরে বলেছিল, কোনো সতর্কবাণীর ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া খুবই কঠিন, কেননা এতে সুনির্দিষ্ট কিছু ছিল না।
অবশ্য বিমান হাইজ্যাক করে তা দিয়ে আক্রমণ চালানো হতে পারে, এরকম কোনো ইঙ্গিত কমিশন দেয় নি। কিন্তু সে বছর গ্রীষ্মে তেমনই কিছু সতর্কবাণী এসেছিল। সেসব সতর্কবাণীতে বিমানের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
২০০১ সালের জুলাই মাসে, অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সের একজন এফবিআই কর্মকর্তা একটা মেমো পাঠালেন যা এখন বিখ্যাত দলিলে পরিণত হয়েছে। এতে তিনি কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন – এর তদন্ত করা হোক। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা কয়েকজন লোক স্থানীয় কিছু পাইলট ট্রেনিং কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছে।
এরপরের মাসে দু’হাজার মাইল দূরের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় এফবিআই এজেন্টরা জাকারিয়াস মুসাভি নামে একজন ফরাসি নাগরিককে গ্রেফতার করে। তিনি একটি স্থানীয় ফ্লাইং স্কুলে এসে বোইং সেভেন ফোর সেভেন বিমান চালনা শিখতে চেয়েছিলেন। যদিও তার বিমান চালনার তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। এফবিআইয়ের আইনজীবী কলিন রাউলিকে গভীর রাতে ফোন করে এই গ্রেফতারের কথা জানানো হলো।
একজন সক্রিয় তত্ত্বাবধানকারী ফোন করে বললেন, তিনি সদ্য পাওয়া কিছু তথ্য নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চান। তাকে বলা হলো কর্মকর্তারা মুসাভির জিনিসপত্র এবং কম্পিউটারে কি আছে তা অনুসন্ধান করার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন, এবং সে ব্যাপারে তিনি সহায়তা করতে পারেন কিনা। এফবিআইয়ের কর্তাব্যক্তিরা এ আবেদনের প্রক্রিয়া থামিয়ে দিয়েছিলেন।
২০০৫ সালে বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কলিন রাউলি সেসময়ের ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি জানান, এফবিআইএর হেডকোয়ার্টারে কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্তিতর্ক করার সময় তাদের একজন সুপারভাইজার সত্যি সত্যি বলেছিলেন, ‘আপনি কি জানেন না যে এই ব্যক্তিটি সেই ধরনের লোক যারা উড়ন্ত বিমান দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত হানতে পারে?
জবাবে বলা হয়েছিল, এরকম কিছু ঘটবে না।
এই জাকারিয়াস মুসাভিই পরে ১১ সেপ্টেম্বরের আক্রমণ চালিয়ে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র করার দায় স্বীকার করেন।
কলিন রাউলি বলেন, তাদের সতর্কবাণীগুলো যে উপেক্ষিত হয়েছিল তার একটা কারণ ছিল, নাইন ইলেভেনের আক্রমণের আগে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কেউই কল্পনাই করতে পারতেন না যে এরকম মাত্রার সন্ত্রাসী আক্রমণ আমেরিকায় হতে পারে। কিন্তু সিআইএর ভেতরে কিন্তু সতর্ক সংকেত ঠিকই বেজে উঠেছিল।
২০০১ সালে সিআইএর প্রধান ছিলেন জর্জ টেনেট। আর কাউন্টার টেররিজমের প্রধান ছিলেন কোফার ব্ল্যাক। এগারোই সেপ্টেম্বরের আক্রমণের ১৪ বছর পর সিবিএস টিভির শোটাইম সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জর্জ টেনেট বলেন, সেই গ্রীষ্মকালে তাদের হাতে এমন সব জোরালো এবং নতুন প্রমাণ এসেছিল যাতে বোঝা যায় যে আল-কায়েদা খুব শিগগীরই আমেরিকায় আক্রমণ চালাবে।
সিআইএ’র আলকায়েদা সংক্রান্ত ইউনিটের প্রধান রিচ ব্লি বলেছিলেন, শুধু যে লাল সতর্কবার্তাই ছিল তাই নয়, বরং বাস্তব পরিকল্পনা তখন তৈরি হচ্ছিল। জুলাই মাসের শেষ দিক, তারা সম্মেলন কক্ষে বসেছিলেন। আক্রমণটা ঠিক কি ভাবে চালানো হতে পারে- আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিলেন। জর্জ টেনেট এবং কোফার ব্ল্যাক ওই টিভির অনুষ্ঠানে বললেন, তারা হোয়াইট হাউসে কন্ডোলিজা রাইসকে ফোন করলেন।
কলিন রাউলি বলেন, এই আক্রমণ হবে ইংরেজিতে যাকে বলে স্পেকটাকুলার, যা দেখে লোকেরা চমকে যাবে। আর একটি নয়, হয়ত একাধিক আক্রমণ হবে। আল-কায়েদা আমেরিকাকে ধ্বংস করতে চায়। আমাদের এখনই যুদ্ধ প্রস্তুতির অবস্থায় যেতে হবে। কন্ডোলিসা রাইস পরে বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো রিপোর্ট পান নি যাতে বলা হয়েছিল যে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে বিমান ব্যবহৃত হতে পারে। আর, মার্কিন প্রশাসন তখন প্রতিদিনই নানারকম হুঁশিয়ারি পাচ্ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশ বলেছিলেন তিনি এমন কোনো গোয়েন্দা দলিলপত্র দেখেন নি যাতে আমেরিকার মাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো হামলার ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল। অবশ্য পরে আবার এই হোয়াইট হাউসই নিশ্চিত করেছিল যে, ২০০১ সালের ৬ আগস্ট প্রেসিডেন্টকে যে দৈনিক ব্রিফ দেয়া হয়েছিল তার শিরোনামই ছিল ‘বিন-লাদেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আঘাত হানতে বদ্ধপরিকর।’
কমিশন ভেঙে দেবার পরও গ্যারি হার্ট এবং তার সহযোগীরা সেই গ্রীষ্মে সতর্কবাণী দেয়া অব্যাহত রেখেছিলেন। গ্যারি জানান, তাদের মনে হচ্ছিল বিপদ যেন আরো কাছে চলে এসেছে। তিনি তখন বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলছেন, সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তবে এটাও ঠিক তারা সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেন নি, কবে, কখন বা কোথায় এরকম আক্রমণ হবে, কিংবা এতে বিমান ব্যবহৃত হবে কিনা। হার্ট বলেন, তখন সেটা জানবার কোনো উপায় তাদের কাছে ছিল না। তিনি কানাডার মন্ট্রিয়েলে বিমান যোগাযোগ সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সমিতির অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়েছিলেন। তার পরদিনই কানাডার পত্রিকায় শিরোনাম হয়, ‘আমেরিকায় সন্ত্রাসী আক্রমণ হতে যাচ্ছে।‘
এর দু-একদিনের মধ্যেই কন্ডোলিসা রাইসের সঙ্গে গ্যারি হার্টের আরেকটি বৈঠক হলো। সেটা ছিল সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ। গ্যারি কন্ডোলিসা রাইসকে বলেছিলেন, দয়া করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য পদক্ষেপ নিন। আমাদের ওপর আক্রমণ হতে যাচ্ছে। কন্ডোলিজা রাইস বললেন, ঠিক আছে আমি ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলব। তার পাঁচ দিন পরই আক্রমণ হলো। তিন হাজার লোক মারা গেল।
১১ সেপ্টেম্বর আক্রমণের এক বছর পর এর তদন্ত করার জন্য একটি দ্বিদলীয় কমিশন গঠিত হয়েছিল। ২০০৪ সালে সে কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, এ আক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নীতি, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা এবং চিন্তার ব্যর্থতা ছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেভাবে কাজ করে তার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনারও সুপারিশ করা হয়।
এই রিপোর্ট প্রকাশের এক মাস আগে সিআইএ প্রধান জর্জ টেনেট পদত্যাগ করেন।
বিবিসির বিভিন্ন প্রতিবেদন অবলম্বনে



