
ইসরাইলের ৪০ হাজার টন বোমায় বসবাসের অযোগ্য গাজা
গাজায় ৫১ দিনে ৪০ হাজার টন বোমা ফেলেছে বর্বর ইসরাইল। ফলে উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। রবিবার গাজা সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবি করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত মোতাবেক রবিবার ভোরেও ১৭ জিম্মি মুক্তি দিয়েছে হামাস। অপরদিকে ৩৯ ফিলিস্তিনিকে ছেড়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের আরও একটি ট্যাঙ্কার আটক করে নিজেদের উপকূলে নিয়ে গেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। তবে এ বিষয়ে তেলআবিবের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে হামাসের সিনিয়র নেতা সালামা মারুফ রবিবার বলেছেন, ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর দিন থেকে এখন পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় ৪০ হাজার টন বোমা ফেলেছে ইসরাইল। দেশটির এই নির্বিচারে হামলায় উপত্যকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। খবর আলজাজিরা, বিবিসি ও এএফপির।
তিনি বলেন, উপত্যকার বৃহত্তম আল-শিফা হাসপাতাল সচল নেই। যে কারণে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের একটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইসরাইলি বোমা হামলায় গাজায় নিহত শিশুর সংখ্যা গত বছর সারাবিশ্বের সব সংঘাতে প্রাণ হারানো শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। সাত সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই হামলায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। গাজার হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু ও নারী।
ইসরাইলের একটি বেসরকারি কোম্পানির ট্যাঙ্কার জাহাজ জব্দ করে ইয়েমেনের উপকূলে নিয়ে গেছে হুতি। সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা আমব্রে রবিবার এ তথ্য জানায়। আমব্রে জানিয়েছে, ইয়েমেনে নিয়ে যাওয়া ওই ট্যাঙ্কারটির নাম সেন্ট্রাল পার্ক ভেসেল। এটির মালিক যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ইসরাইলি কোম্পানি। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এর আগে ট্যাঙ্কারটিকে হুদেইদা বন্দরে নোঙরের জন্য নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশ না মানলে ট্যাঙ্কারে হামলা চালানোর হুমকিও দিয়েছিল তারা। এক সপ্তাহ আগেও হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে ইসরাইলের মালিকানাধীন বিশাল পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করে। উত্তর গাজায় ৬১ ট্রাক ত্রাণ সরবরাহ করা হয়েছে। ত্রাণবাহী এসব ট্রাকে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য ও পানি। এ ছাড়া ত্রাণবাহী আরও দুশ’ ট্রাক ইসরাইলের নিতজানা থেকে গাজার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) এক বিবৃতিতে এ কথা জানায়। গাজায় চলছে চারদিনের যুদ্ধবিরতি। এ যুদ্ধবিরতির কারণে সহায়তাসামগ্রী নিয়ে ট্রাকগুলো অবরুদ্ধ গাজায় যেতে পেরেছে। জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের শর্তে চারদিনের এ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধবিরতিকালে মোট ৫০ জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার কথা হামাসের। পরিবর্তে ইসরাইল কমপক্ষে ১৫০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। দ্বিতীয় দফায় রবিবার আরও ৩৯ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরাইল। পাশাপাশি দ্বিতীয় ব্যাচে আরও ১৭ জিম্মির মুক্তি দিয়েছে হামাস। ইসরাইলি বর্বরতায় ছোট্ট ফিলিস্তিনি জনপদ গাজা এখন স্রেফ কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির অন্যদের ফের যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ইসরাইল যতদিন যুদ্ধবিরতি মানবে ততদিন হামাসও মানবে। তিনি বলেন, গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধ, বন্দি বিনিময় সম্পন্ন, গাজাকে অবরোধমুক্ত করা এবং আল আকসা মসজিদে হামলা প্রতিরোধ করতে যা যা প্রয়োজন, তার সবই করতে প্রস্তুত হামাস। তিনি বলেন, মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত আমরা লড়ব। শনিবার যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় দিনও ১৪ জিম্মিকে ছেড়ে দেয় হামাস। হামাসের হাত থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পায়নি ইসরাইল। শনিবার দেশটির হাসপাতাল সূত্র জানায়, হামাসের হাত থেকে মুক্তিপাওয়া সবাই ভালো আছেন। তাদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। জিম্মিদের সবার শারীরিক অবস্থা বেশ ভালো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চলমান এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছেন। ম্যাসাচুসেটসের ন্যানটকেটে পরিবারের সঙ্গে থ্যাঙ্কস গিভিং অবকাশ যাপনকালে বাইডেন বলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি অর্জনের জন্য দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান দরকার। তিনি বলেন, আমি মনে করি যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তির সুবিধার্থে চারদিনের যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার শুরুকে স্বাগত জানান।
ইসরাইল-হামাস সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরাইলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনি এবং হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মুক্তির পর তারা বাড়ি ফিরেছে। ইসরাইলি বর্বরতায় গাজায় প্রায় ১৫ হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে সদ্য মুক্তি পাওয়া মারাহ বাকির (২৪) বলেন, ‘আমি খুশি, কিন্তু আমার মুক্তি শহীদদের রক্তের মূল্যে এসেছে। আট বছর ধরে কারাগারে থাকা বাকির বলেন, ‘কারাগারের চার দেওয়াল’ থেকে এই মুক্তি স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। মারাহ বাকির পূর্ব জেরুজালেমের বেইট হানিনায় তার বাড়িতে ফেরার পর বলেন, ‘আমি আমার শৈশব এবং আমার কৈশোর কারাগারে কাটিয়েছি। এখন মুক্ত। ৫৮ বছর বয়সী হানান আল-বারঘৌতি ইসরাইলি কারাগার থেকে দুই মাস পর মুক্তি পেয়েছেন। তিনি হামাসের সশস্ত্র শাখার নেতা এবং গাজার জনগণের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।’ ‘যদি গাজার জনগণ না থাকত, আমরা স্বাধীনতা দেখতে পেতাম না। আমরা কারাগারে নির্যাতন ভোগ করছিলাম। তারা আমাদের অপমান করেছে, কিন্তু ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের জন্য আমারা অত্যন্ত গর্ববোধ করছি। আমাদের মর্যাদা সমুন্নত হয়েছে। এই প্রতিরোধের জন্য অভিনন্দন জানাই। ধূসর জাম্পার পরা ফিলিস্তিনি বন্দিদের দখলকৃত পশ্চিম তীরের বেইতুনিয়ায় উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে প্যারেড করানো হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের মুক্তির আগে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনজন গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন। এবার ভারত মহাসাগরে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে একটি ইসরাইলি কার্গো জাহাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা হামলার তথ্যটি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, কন্টেনারবাহী জাহাজটির মালিক এক ইহুদি। মার্কিনিরা সন্দেহ করছে, এই হামলায় ইরান জড়িত। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, স্বল্পমেয়াদি এই যুদ্ধবিরতির পথ ধরেই গাজায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি আসবে। অনেকেই ফিরে দেখেন, তাদের চেনা জায়গাগুলো অচেনা হয়ে গেছে। কারণ ইসরাইলি হামলায় তাদের ঘরবাড়ির কোনো চিহ্ন নেই। এক ফিলিস্তিনি বলেন, আমি বাড়ি যেতে চাই। আমার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলেও আমি সেখানে থাকতে চাই। আমি সেখানে মরতে চাই। আরেকজন নারী বলেন, আমি দোয়া করি যেন যুদ্ধবিরতির দিন আরও দীর্ঘ হয়।



