আন্তর্জাতিকবাংলাদেশ

নির্বাচনের আগে জেলে স্বামীর মৃত্যু, এক বিধবার আর্তনাদ: বিবিসির প্রতিবেদন

একজন নারী, একজন মা এবং এখন তিনি বিধবা। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন তিনি। বিবিসিকে বলার মতো একটি কাহিনী আছে তার। কিন্তু প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। এ জন্য আমরা একান্তে যাতে কথা বলতে পারি, এমন একটি নিরিবিলি স্থান খুঁজে নিতে রেললাইন ধরে এগিয়ে যাই। ব্যস্ত বাজার এলাকা থেকে দূরে একটি পরিত্যক্ত ভবনের দিকে অগ্রসর হই। এমন একটি স্থানে দাঁড়ালাম যেখান থেকে শহরটি পরিষ্কার দেখা যায়। তখন আযান হচ্ছিল। আর তিনি আমাকে তার স্বামীর কাহিনী বলতে শুরু করলেন।

তার স্বামী ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির একজন সুপরিচিত কর্মী। তিনি গান গাইতে ভালবাসতেন।

বিশেষ করে গাইতেন আবেগঘন গান। তিনি ছিলেন বিশাল হৃদয়ের। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি ছিলেন সুখী। গত বছর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ঠিক ২৬ দিন পর তার ছেলে একটি ফোনকল পান- জেলে মারা গিয়েছেন তার পিতা।
ওই নারী বলেন, এর মাত্র কয়েকদিন আগে তার পিতাকে সুস্থ দেখে এসেছে আমার ছেলে। কর্তৃপক্ষের কাছে সে জানতে চেয়েছে কিভাবে তার পিতা মারা গেছেন। জবাবে তারা বলেছে, আমরা জানি না। মর্গে আসুন এবং লাশ নিয়ে যান।

তার মৃতদেহ যখন দেখতে পান এই নারী, তিনি বলেন, তখন দেখেছেন, তার সারা শরীরে, হাতে এবং মুখে দাগ। তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে তাকে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, তার স্বামীকে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন আমার ছেলে বাবা বলে ডাকতে পারে না। তার পিতা যে ভালবাসা তাকে দিয়েছে, তা তো আমি অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ করতে পারবো না। কে তাকে পিতার ভালবাসা দেবে? এখন আমি শুধু আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।

মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক গ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে দমন করার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা হলো বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের চালানো সহিংস স্বৈরতান্ত্রিক দমনপীড়ন। সংগঠনটির এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, এটা দেখে মনে হচ্ছে যে, ভিন্ন মতাবলম্বী ও সমালোচনার কোনো স্থান নেই, কার্যকর একটি গণতন্ত্রের জন্য যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের প্রেক্ষিতে রোববারের নির্বাচন বর্জন করছে বিএনপি। নির্বাচনে কোনো প্রকৃত বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থবারের জন্য ক্ষমতা নিশ্চিত।

সমালোচকদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে সরকার। বলেছে, তারা রোববারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইন, বিচার ও পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই। তা হলো, আমরা কারো কণ্ঠ চেপে ধরিনি। সবারই কথা বলার অধিকার আছে। যেকোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই।

বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এসব কথা শোনানো কঠিন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, দলটির কমপক্ষে ১০ হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক জেলে আছেন। বিএনপির সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম বলেন- হ্যাঁ, আপনি অবাধে কথা বলতে পারেন। কিন্তু তারপর পরিণতি কি হবে তার দায়িত্ব কেউ নেবেন না। তিনি আরও বলেন, যেসব মানুষ অবাধে কথা বলেছেন তাদেরকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে প্রহার করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে। তারপর তাদের কেউ কেউ জেলেই মারা গেছেন। এমনকি তিনি রাতে নিজের বাসায় ঘুমানোর ক্ষেত্রে পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করেন। এই আতঙ্ক হলো, কখন কর্তৃপক্ষ আসে এবং লোকজনকে গ্রেপ্তার করে।

ওই বিধবা নারী বলেছেন, তার প্রয়াত স্বামী রাজনৈতিক কর্মী। এখন তিনি নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, আমরা ভয়ে আছি। এ এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রচুর সমর্থক আছেন। তারা আমাকে ও আমার ছেলেকে হয়রান করবেন।

এই আতঙ্ক সত্ত্বেও তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, দেশের জন্য তার স্বামী ঠিক কাজটি করেছেন। এই নির্বাচনের কোনো বৈধতা আছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। বলেন, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে এই নির্বাচনে।
‘তিনি (তার স্বামী) নিহত হয়েছেন। রেখে গেছেন আমাদের। এ জন্য আমি ভোট দেবো না।’

বিবিসি থেকে অনূদিত

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension