গল্পসাহিত্য

স্বপ্নের বোবা কান্না

শাহানাজ শিউলী


কই গো কোথায় গেলে? প্যাকেটটা দাও। বাজারে যেয়ে দেখি কিছু কেনা যায় কিনা বললেন রায়হান সাহেব।

রায়হান সাহেব একজন নন এমপিও স্কুল শিক্ষক। আজ ছাব্বিস বছর ধরে পড়ে আছেন ওই প্রতিষ্ঠানে। কতজন এল গেল, কিন্তু রায়হান সাহেবকে নড়ানো গেল না। বলতে পারেন স্কুলের তার নাড়ীর টান। বিনা পয়সায় কত ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষ করেছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটাই তার আত্মতৃপ্তি। কিন্তু আর কতদিন? শরীর বলেও তো একটা কথা আছে।

ছয় সদস্য নিয়ে রায়হান সাহেবের পরিবার। বাবা স্ট্রোক করে বিছানাতে, মা বেঁচে আছেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ছেলে রাজন দশম শ্রেণীতে পড়ে। মেয়ে শিলা পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেন। ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন তার। রায়হান সাহেব টিউশনি করেন আবার মাঠে খাটেন, এইভাবে চলছে তার সংসার। স্ত্রী সেলিনা বেগম টুকটাকি দর্জির কাজ করে কোনও রকম নিজের হাতখরচটা চালিয়ে নেয়।

আজ বেশ কিছুদিন হলো রায়হান সাহেবের শরীরটা মোটেই ভালো যাচ্ছে না। পাশের ঘরে সেলিনা বেগম তার মেয়েকে নিয়ে শুয়েছিলেন । মেয়ে তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলছিল মা, আমরা কতদিন মাংস খাইনি! একটু মাংস কিনবে? আমার উপবৃত্তির টাকা এসেছে।

সেলিনা বেগম মনে মনে ভাবছিল এই টাকা দিয়ে তিনি স্বামীকে ডাক্তার দেখাবেন। মেয়ের কথা শুনে তিনি অশ্রু নিবৃত্ত করতে পারলেন না। চুপ করে শুয়ে নীরবে কাঁদছিলেন। কি বলবেন মেয়েকে কোনও সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।

ওদিকে আজ কেন জানি রায়হান সাহেবেরও খুব ইচ্ছে করছে একটু মাছ মাংস কিনতে। ছেলেমেয়ে আর পরিবারের মুখে কতদিন একটু ভালো খাবার মুখে তুলে দেন নি!

সংসারের খরচ থেকে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছিলেন মাটির ব্যাংকে। বিছানা থেকে উঠে তন ব্যাংকটি ভেঙে ফেললেন। স্ত্রী সেলিনা বেগম দৌড়ায় এসে বললেন, আরে আরে! করো কি! তিনি কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কোনও কথা না বলে প্যাকেটটা নিয়ে বাজারে চলে গেলেন।

বাজারে গিয়ে রায়হান সাহেব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলেন। কি রেখে কি কিনবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। যে জিনিসেই হাত দেন তার আকাশছোঁয়া দাম! কিন্তু নিজের আয় তো আর আকাশ ছোঁয় নি! বড়লোকদের কোনও সমস্যা নেই। পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে এসে প্যাকেট ভর্তি বাজার নিয়ে ফেরেন তারা। জিনিসের দাম বাড়ল কি না বাড়ল তাদের কিচ্ছু আসে যায় না। সব সমস্যা মধ্যবিত্তদের। এরা না পারে ভিক্ষা করতে, না পারে মানুষের কাছে হাত পাততে, না পারে দুর্নীতি করতে। এদের স্বপ্নগুলো চোখের নোনা জলে ঝরে যায়।

রায়হান সাহেব মাংসের দোকানের সামনে থেকে সরে এলেন। ভাবলেন, আসার সময় মা বলে দিয়েছিল ওষুধ কিনতে। তাহলে আগে ওষুধের দোকানে যাই। ওষুধ কেনার পর যা টাকা থাকবে তাই দিয়ে বাজার করবে। এরপর মায়ের জন্যে দু’দিনের ওষুধ কিনে গেলেন মাছের বাজারে। আজ না হয় একটু মাছ কিনব, মনে মনে বললেন রায়হান সাহেব।

দেশের পরিবর্তন দেখে রায়হান সাহেব খুব খুশি হয়েছিলেন। হয়ত এবার একটু ইলিশ মাছ চোখে দেখা যাবে। আহারে! কতদিন ইলিশ মাছ খাইনি। মাছের বাজারে যেয়ে তার মাথা ঘুরে গেল। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম বাইশ’শ টাকা। আর পুঁটি ইলিশের দাম ছয়শ’ টাকা। ইলিশও আর কেনা হলো না। কিছু তরি-তরকারি কিনে বাড়ি ফিরলেন তিনি। স্বপ্নগুলো শরতের শিউলির মতো নীরবেই ঝরে পড়ল।

এদিকে রাজনের স্কুলের বেতনও দিন দিন বাকি পড়তে লাগল। রায়হান সাহেবের স্বপ্ন ছিল রাজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে। সর্বশ্রেষ্ঠ মেধার স্থান হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর রাজন খুব মেধাবী ছেলে। ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার বানাবেন তম। মস্ত চাকরি করবে। একদিন তাদের সব কষ্ট ঘুচে যাবে। এত কষ্টের মাঝেও সেভাবেই ছেলেকে মানুষ করে তুলছিলেন।

কষ্টের কাছে হার মানেন না রায়হান সাহেব- কখনও মানেন নি। কিন্তু মেধাবী ছেলেগুলোর নাজেহাল অবস্থা দেখে তিনি খুবই মর্মাহত হলেন। না, এটা কোনও বিদ্যাপীঠ হতে পারে না। কোথায় হারিয়ে গেল সব নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ব, বিবেকবোধ। পুরো জাতি যেন একসঙ্গে মুখথুবড়ে পড়েছে!

এটা কখনও মানুষ গঠনের কারখানা হতে পারে না। এটা মেরুদণ্ড ভাঙার কারখানা। আহারে বিদ্যা! আহারে বিশ্ববিদ্যালয়! তিনি ভাবলেন ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়ার আগে মানুষ করে তৈরি করতে হবে। বড় বড় সার্টিফিকেট আর ডিগ্রি দিয়ে দেশের উন্নতি হবে না যদি নিজের ভেতর কোনও নৈতিকতা, মূল্যবোধ, বিবেকবোধকে জাগ্রত না করা যায়। তারচেয়ে আমাদের স্থানীয় এলাকাই ভালো। ওখানেই ছেলেকে পড়িয়ে ভালো মানুষ তৈরি করব।

দিনে দিনে রায়হান সাহেবের শরীরের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকল। স্ত্রী সেলিনা বেগম বললেন, কি হয়েছে তোমার? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

রায়হান সাহেব কোন উত্তর দিলেন না। রাতে সামান্য খাবার খেয়েই শুয়ে পড়লেন। শুয়ে শুয়ে আল্লাহর কাছে মনে মনে প্রার্থনা করলেন, হে আল্র়াহ, আমাকে আর কয়টি বছর সুস্থ রাখো যেন আমি আমার সন্তান দুটো মানুষ করে গড়ে তুলতে পারি।

কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। পরদিন ভোরে রায়হান সাহেব বিছানা থেকে উঠতে গেলে দেখেন তিনি আর উঠতে পারছেন না। তাঁর শরীরের একটা পাশ অবশ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে হাত-পা পাথর হয়ে গেছে। কিছুতেই তিনি নড়াচড়া করতে পারছেন না। তিনি চিৎকার করে কেঁদে উঠে বললেন, সেলিনা আমি উঠতে পারছি না কেন!

সেলিনা দৌড়ে এসে দেখে স্বামী অবশ পড়ে আছে। । তিনি ওঠানোর অনেক চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছুতেই পারলেন না। সেলিনার চারপাশ অন্ধকারে ঘিরে ধরল। রায়হান সাহেবের চোখ থেকে নিভে গেল স্বপ্নের আলো। বেড়ার ফাঁকে বিন্দি বিন্দু আলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন রায়হান সাহেব। স্বপ্নের বোবা কান্নায় চোখের গোল গোল অশ্রু বিন্দুতে নিভে গেল প্রভাতী আলো।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension