
আন্তর্জাতিক
নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়াল
হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ; ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন শত শত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী, চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান
হোসনেআরা চৌধুরী :
হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে হিমালয়ে একটি হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুতগতিতে নেমে আসা পানি, কাদা ও পাথরের স্রোত একের পর এক জনপদ, সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নেপালেই শত শত মানুষের মৃত্যু
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ১,০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং প্রায় ৩,৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং আরও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে দুই দেশের সম্মিলিত মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
তবে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
সুড়ঙ্গে আটকা শত শত কর্মী
বন্যায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে শত শত কর্মী আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা অন্তত এক ডজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের এলাকায় আটকে পড়া কর্মীদের সন্ধান চালাচ্ছেন। কিছু সুড়ঙ্গ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৫০০ কর্মী সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অক্সিজেনের সীমিত সরবরাহ এবং সুড়ঙ্গের ভেতরের বিপজ্জনক পরিস্থিতি উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশিরাও রয়েছেন
বন্যায় নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বিদেশিরাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছিলেন।
নেপাল কর্তৃপক্ষের তালিকায় শত শত বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকার তথ্য রয়েছে। চীনের হিসাবেও নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
পরিবারগুলো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে।
উদ্ধারে নামানো হয়েছে হাজারো সেনা ও স্বেচ্ছাসেবক
উদ্ধার অভিযানে নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নিচ্ছেন। দুর্গম এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত ১১,৮০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিচ্ছিন্ন এলাকায় হেলিকপ্টারে করে খাবার, পানি ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ভারত ও চীনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে।
ধ্বংস সড়ক-সেতু, বিচ্ছিন্ন বহু এলাকা
বন্যার পানির স্রোতে বহু সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকার সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ব্যাপক কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারীদের সেখানে নতুন করে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হচ্ছে।
কাঠমান্ডুতে শুরু হয়েছে গণদাফন
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি—এমন মৃতদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ গণদাফনের ব্যবস্থা শুরু করেছে।
ভবিষ্যতে স্বজনদের মাধ্যমে মৃতদের শনাক্ত করার সুযোগ রাখতে কর্তৃপক্ষ ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত
প্রতিদিন নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি কিছু মানুষকে জীবিতও উদ্ধার করা হচ্ছে। কিন্তু হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় উদ্ধারকারীদের সামনে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
নেপাল ও তিব্বতের এই বিপর্যয় ইতোমধ্যে হিমালয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।



