
চারপাশের সবকিছু ধ্বংস, নেপালের বন্যায় অটুট রইল এক ‘অলৌকিক বাড়ি’
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় চারপাশের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও স্থাপনা—সব ধ্বংস হয়ে গেলেও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে একটি ফিরোজা রঙের বাড়ি। নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলি বাজার এলাকার এই বাড়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিরাকল হাউস’ ও ‘গ্রিন হাউস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ভয়াবহ বন্যার মধ্যেও বাড়িটির মূল কাঠামো অটুট থাকায় এটিকে এখন বেঁচে থাকার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে হিমালয়ের একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর ফলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা। বরফ, বিশাল পাথর, গাছপালা ও কাদামাটি নিয়ে প্রবল স্রোত ত্রিশুলি নদী ধরে নেমে আসে। এতে পুরো জনপদ ভেসে যায়। ধ্বংস হয় সড়ক, সেতু, ভবন ও যোগাযোগব্যবস্থা। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুর্গম অনেক এলাকা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) পর্যন্ত নেপাল ও চীনে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে ৪ হাজারের বেশি মানুষ।
বন্যার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাড়িটির নিচের তলাগুলো দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে পানি ও কাদার স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। দরজা-জানালা ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে পানির তোড়। কিন্তু ওপরের তলায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারের সদস্যরা প্রাণে বেঁচে যান। রিইনফোর্সড কংক্রিটে নির্মিত বাড়িটির মূল কাঠামো প্রবল স্রোতের মধ্যেও টিকে থাকে।
বাড়িটির বাসিন্দারা হলেন ৪৫ বছর বয়সী প্রকাশ পাণ্ডে প্যাকুরেল, তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবা। বন্যা আঘাত হানার সময় প্রকাশ ও তাঁর স্ত্রী বাড়ির কাছেই একটি দোকানে ছিলেন। তাঁদের সাত বছর বয়সী ছেলে ১৫ মিনিট আগে স্কুলে চলে গিয়েছিল। ১১ বছর বয়সী মেয়েটি তখন স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এই অবস্থায় কাদা ও পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে এলে পরিবারটির হাতে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার মতো সময় ছিল না। প্রকাশ ও তাঁর স্ত্রী তাই দোকান থেকে দ্রুত বাড়িতেই ফিরে আসেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তাঁরা বাড়ির ভেতর আটকা ছিলেন। প্রকাশের স্ত্রী জানান, চারদিক থেকে বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষসহ বন্যার পানি বাড়িটিকে আঘাত করছিল। বাড়িটি কাঁপছিল, আর তাঁরা ভয়ে ভাবছিলেন, হয়তো এটাই তাঁদের জীবনের শেষ মুহূর্ত।
তিনি বলেন, ‘আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। সবাইকে বলেছিলাম, একসঙ্গে মরতে হবে। কিন্তু আমরা নতুন জীবন পেয়েছি। সবাই এটিকে অলৌকিক ঘটনা বলছে। আমরাও এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে বেঁচে আছি।’
পরে বাড়ির এক সদস্য লাল পতাকা উড়িয়ে হেলিকপ্টারে উদ্ধারকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩২ মিনিটে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্তত চারটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়। ত্রিশুলি নদীর ১৬৮ কিলোমিটার নিম্নধারা এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় বন্যা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কেশব প্রসাদ বারাল বলেন, ‘এটা শুধু পানি ছিল না। বিশাল কাদার স্রোত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল।’ তিনি জানান, স্ত্রীকে হাত ধরে বাঁচানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে কাদার স্রোত থেকে রক্ষা করতে পারেননি।



