
অস্ত্র তুললেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হবে না ICE-এর ক্যামেরা!
সরকারি নজরদারি সংস্থার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান, গোপনীয়তার যুক্তি DHS-এর
হোসনেআরা চৌধুরী :
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (ICE) কর্মকর্তাদের শরীরে থাকা ক্যামেরা অস্ত্র বের করা কিংবা পুলিশের গাড়ির সাইরেন চালু করার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গোপনীয়তা ও পরিচালনাগত ঝুঁকির যুক্তি দেখিয়ে এ সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS)।
বুধবার প্রকাশিত সরকারি জবাবদিহি দপ্তরের (GAO) এক প্রতিবেদনে ICE এবং ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP)-এর বডি-ক্যামেরা ব্যবস্থাপনায় অসংগতি ও নীতিগত ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের ক্যামেরা যথাসময়ে চালু রাখা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। বিশেষ করে, কোনো কর্মকর্তা অস্ত্র বের করলে বা জরুরি সাইরেন চালু করলে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়।
GAO-এর মতে, আকস্মিক সংঘর্ষ, বলপ্রয়োগ কিংবা গ্রেপ্তারের সময় ক্যামেরা চালু না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে। এতে কোনো ঘটনার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা, জবাবদিহি এবং জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গোপনীয়তার যুক্তিতে আপত্তি
DHS স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা চালুর সুপারিশে সম্মতি দেয়নি। বিভাগের যুক্তি, এ ধরনের প্রযুক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরা চালু করে দিতে পারে। এতে তথ্যদাতা, অপরাধের শিকার ব্যক্তি কিংবা সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ধারণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি যেসব এলাকায় ক্যামেরা ব্যবহার সীমিত, সেখানে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগকারী সাধারণ মানুষের কর্মকাণ্ডও রেকর্ড হয়ে যেতে পারে।
বিভাগটি অবশ্য GAO-এর সাতটি সুপারিশের মধ্যে ছয়টিতে সম্মতি জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা চালুর বিষয়টিতে তাদের আপত্তি বহাল রয়েছে।
ক্যামেরা ব্যবহারের নিয়মেই বিভ্রান্তি
GAO-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ICE ও CBP—উভয় সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যে কখন বডি-ক্যামেরা চালু করতে হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। গাড়ি তল্লাশি, আটক ব্যক্তিকে পরিবহন কিংবা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রমের সময় ক্যামেরা চালু করা বাধ্যতামূলক কি না, সে বিষয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পর্যালোচনা করা কয়েকটি কার্যালয়ে ক্যামেরা ব্যবহারের নীতিমালা যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না। একটি ICE কার্যালয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পরও নিয়ম সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কারণে ক্যামেরা ব্যবহার শুরু হয়নি বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্যামেরা ব্যবহারে অনিয়মের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি চিহ্নিত করেছে GAO। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি চালুর পর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ICE ক্যামেরা ব্যবহারের নীতি লঙ্ঘনের জন্য কোনো লিখিত তিরস্কার জারি করেনি।
প্রাণঘাতী গুলির ঘটনা বাড়িয়েছে উদ্বেগ
অভিবাসন কর্মকর্তাদের বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার অভিযান এবং গুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ICE-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক বেড়েছে। কয়েকটি প্রাণঘাতী গুলির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শরীরে ক্যামেরা চালু না থাকার বিষয়টি জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সমালোচকদের মতে, বডি-ক্যামেরার ফুটেজ থাকলে অভিযানের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা সহজ হয় এবং কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের প্রমাণ মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, DHS বলছে, ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ICE কর্মকর্তাদের জন্য বডি-ক্যামেরা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ চলছে। তবে ক্যামেরা থাকা এবং প্রতিটি প্রাসঙ্গিক ঘটনার সময় সেটি চালু থাকা—দুটি আলাদা বিষয়।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন বিতর্ক
GAO-এর প্রতিবেদন এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন অভিবাসন আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা, নাগরিক অধিকার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে।
স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা চালুর সুপারিশ প্রত্যাখ্যানের ফলে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের সময় ভিডিও প্রমাণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ICE-এর ক্যামেরা ব্যবহারের নীতিমালা আরও স্পষ্ট করা, নিয়মিত তদারকি এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে সরকারি নজরদারি সংস্থাটি।
মূল প্রশ্ন এখন একটাই—অভিবাসন অভিযানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ক্যামেরা ব্যবহারের নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করবে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ?



