উপন্যাসসাহিত্য

সুন্দরতম সর্বনাশ

দুই.

ক.
বাড়ি থেকে বের হয়ে উত্তর দিকে ধলেশ্বরী নদীর তীর ধরে উজানে হাঁটা শুরু করল ওমর। কোথায় যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, সেই ব্যাপারে কোনো ধারণা তার নেই; সে শুধু ভাবছে বাড়ি থেকে বহুদূরে চলে যেতে হবে, বিদ্যা অর্জন করতে হবে এবং আব্বার মতো হওয়া যাবে না। দুপুরের মধ্যে দুই একটা গ্রাম পেরিয়ে বিকালের আগে আগে আবার ধলেশ্বরীর তীরে গিয়ে উঠলো ওমর; তীরে দাঁড়িয়ে নদীর বিশালতার সামনে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র মনে হলো তার; অথৈ জলরাশির দিকে তাকিয়ে ওমর ঘাবড়ে গেল।

নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যায় না, চারিদিকে শুধু সীমাহীন জল; এতদিন ওমরের কাছে বিশালতার সংগা ছিল তার বাড়ির পিছনের বিল, তবু বিলের এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের গ্রামের গাছ-পালা ঠিকই দেখা যেতো; কিন্তু নদীতে জল ছাড়া আর কিছুই সে দেখতে পেলো না, দু-একটা পাল তোলা নৌকা ছাড়া।

ভয় না পেয়ে নদীর তীর ধরে হাঁটতে লাগল ওমর, এদিকে রোদের তীব্রতা কমতে শুরু করেছে, সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। ছোট্ট ওমরের হাঁটার গতির চাইতে তার হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে লাগল বহু গুণ। তার মাথায় শুধু একটা জিনিসই ঘুরছে—সন্ধার আগে একটা আশ্রয় তাকে পেতেই হবে। কিছু দূরে যাবার পরে একটা বট গাছের তলায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটা দল দেখতে পেয়ে ওমরের মন থেকে ভয় নিমেষে উধাও হয়ে গেল; এই রকম বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দল বাড়িতে বহু দেখেছে সে; এরা খুবই ভদ্র, শান্ত ও অমায়িক। বাড়িতে যখনই এই রকম বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কোনো দল আসতো আম্মা তাদের চাল-ডাল এবং আরও নানান ধরনের খাবার দিতেন। খাবার গ্ৰহণ করে তারা প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিতেন; তাই পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নির্ভয়ে এগিয়ে গিয়ে দলটার সামনে দাঁড়াল ওমর।

মোট আট জনের একটি দল, ওমরের বয়সি চারজন বালক, তিন জন যুবক, এবং একজন মধ্যবয়স্ক; এই মধ্য বয়সি ভিক্ষুই দলের প্রধান পুরুষ; এক নজরে দেখলেও তাই মনে হয়। ওমর মধ্য বয়সি ভিক্ষুকে প্রণাম জানিয়ে জানতে চাইলো—সে তাদের সাথে রাতটুকু থাকতে পারবে কিনা? ভোর হলেই সে চলে যাবে।

—অবশ্যই, থাকতে পারো বালক; কিন্তু সকাল হলে তুমি কোথায় যাবে?
—কোথায় যাব জানি না, তবে বিদ্যা অর্জনের জন্য আমি ঘর ছেড়েছি—এ জন্যো যত দূরে যেতে হয়, আমি যাব।

—ঘর ছেড়েছ এটা তোমার ভুল ধারণা বালক; এখনো তুমি ঘরেই আছো, শুধু ছোট ঘর ছেড়ে বৃহৎ সংসারে প্রবেশ করেছ। এই বিশ্ব প্রভুরই সংসার, আর আমরা সবাই তার সন্তান; তিনি আমাদের আগলে রেখেছেন। তোমার ভয় নেই বালক, তুমি চাইলে যতদিন ইচ্ছা আমাদের সাথে থাকতে পারো। তোমার মনের ইচ্ছা প্রভু অবশ্যই পূরণ করবেন; কিন্তু তোমার নাম তো জানা হলো না—আমার নাম মলয় বর্মন।

—আমার নাম মোহাম্মদ ওমর।

—আমি কি তোমাকে শুধু ওমর বলে ডাকতে পারি।

—আজ্ঞে, গুরুদেব।

গুরুদেবের দার্শনিক কথাবার্তা বলা চলে ওমর কিছুই বোঝেনি, কিন্তু সকলের সাথে থাকার অনুমতি পাওয়াতে এবং সকলের আন্তরিক ব্যবহারে, সর্বোপরি তার নিজের বয়সি কয়েকজন বন্ধু পাওয়াতে—সকাল থেকে তার বুকের উপর চেপে বসা ভীতিকর অনুভূতি নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

সূর্য ডুবে যাবার পরে সন্ধ্যায় সবাই মিলে ধ্যানে বসেছে; ওমর বসে বসে মনোযোগ সহকারে সবার ধ্যান করা দেখতে লাগল। ধ্যান ভাঙার পরে সবাই মিলে রাতের খাবার রান্নার কাজে লেগে গেল; চাল-ডাল এবং কিছু তরকারি, সব এক সাথে এক হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে—সারাদিন গ্ৰামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে যতটুকু ভিক্ষা মিলেছে আজ। কলার পাতার থালায় তৃপ্তি সহকারে আহার গ্রহণ করল সবাই; সারাদিনে পেটে দানাপানি কিছুই পড়েনি ওমরের, তাই সে একটু বেশিই আহার গ্রহণ করল। খাবার পরে গুরুদেবের উপদেশ শোনার জন্য তার চারপাশে সবাই গোল হয়ে বসল।

গুরুদেব ওমরকে উদ্দেশ্য করে বললেন—’ওমর, তোমার কিছু জানার থাকলে প্রশ্ন করতে পারো।

—আপনারা কোথায় যাচ্ছেন, গুরুদেব?

—আমরা প্রভু বুদ্ধের জন্ম স্থানে যাচ্ছি, তীর্থ করতে।

—সেটা কোথায় গুরুদেব?

—হিমালয়ের কোলে, লুম্বিনী নামক স্থানে জন্ম নিয়েছিলেন আমাদের মহাপ্রভু সিদ্ধার্থ গৌতম; আমরা সেখানে যাচ্ছি। যতদিন ইচ্ছা আমরা সেখানে থাকব, তারপর এই বালকরা বোধি প্রাপ্ত হলে (ওমরের বয়সি বালক চারজনের দিকে ইঙ্গিত করে), ওরা আবার বেরিয়ে পড়বে নতুন কোথাও প্রভুর বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে।

—গুরুদেব, আমি জ্ঞান অর্জন করতে চাই; কোথায় গেলে আমার মনের ইচ্ছা পূর্ণ হবে? আমাকে সাহায্য করুন।

—হাঁ, তোমার ব্যাপারটা ভিন্ন—আমাকে ভাবতে দাও।

—আজ্ঞে, গুরুদেব।

গুরুদেব নীরব হয়ে গেলেন, দেখে মনে হচ্ছে তিনি যেন আবার ধ্যানে বসেছেন।

—ওমর, তুমি যে জ্ঞানার্জনের জন্য এই বয়সে ঘর ছেড়েছো, এতেই বোঝা যায় জ্ঞানের প্রতি তোমার আগ্রহ কতটুকু। তোমার উপযুক্ত পাঠশালা হতে পারতো নালন্দা মহা বিদ্যাপীঠ; কিন্তু পরিতাপের বিষয়—মহান সেই জ্ঞানের বাতিঘর আজ পরিত্যক্ত, শুধু একটা ধ্বংসস্তূপ।

সবাই আগ্ৰহভরে সমস্বরে জিজ্ঞাসা করে উঠলো,—’কিন্তু ধ্বংস হলো কীভাবে, গুরুদেব?’

—সে এক দীর্ঘ ও করুণ কাহিনী।

—গুরুদেব, আমরা শুনতে চাই।

—ঠিক আছে, তবে বলছি—একদিন দুই জন ব্রাহ্মণ বালক নালন্দা মহাবিদ্যাপীঠের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের মাথায় নাকি নালন্দার বৌদ্ধ বালকেরা জল ঢেলে দিয়েছিল; এই সামান্য একটি অজুহাতে বৌদ্ধ বিদ্বেষী ধর্মান্ধ ব্রাহ্মণেরা নালন্দায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, এবং সেই সময় বিদ্যাপীঠের অভ্যন্তরে যাকে পেয়েছে তাকেই নির্মমভাবে হত্যা করেছিল; এখানেই শেষ নয়, শত শত বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা বিশাল গ্রন্থাগার তারা আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল; তারপর থেকে নালন্দা এক জনমানবহীন শূন্য বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। অথচ এই নালন্দার সুনাম ছিল সমগ্র এশিয়া জুড়ে, সুদূর চীন থেকেও ছাত্ররা আসতো এখানে লেখাপড়া শিখতে। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং নালন্দায় এসে এখানকার শিক্ষক ও ছাত্রদের ভূয়সি প্রশংসা করেছিলেন। আকারে বড় একটা শহরের মতো ছিল সমগ্ৰ নালন্দা বিদ্যাপিঠের এলাকা; সব মিলিয়ে ছাত্র ছিল প্রায় দশ হাজার, এবং শিক্ষক ছিলেন প্রায় দুই হাজার জন—ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা সহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠ দিতেন শিক্ষকবৃন্দ। এই গৌড় অঞ্চলের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত নালন্দা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল অতিশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।

ওমরের কাছে ব্যাপারটা অবাক লাগল, তাই সে বলল,—’গুরুদেব, এই সামান্য অজুহাতে ব্রাহ্মণরা এতো ভয়ানক কাণ্ড করল?’

—আসলে এটা ছিল একটি অজুহাত—বৌদ্ধ রাজা গোপালের রাজত্বের পর থেকে হিন্দু রাজাদের উত্থান শুরু হয়; আর তখন থেকেই বৌদ্ধদের উপর হিন্দুদের অত্যাচারের শুরু, সেই অত্যাচার চরম আকার ধারণ করেছিল রাজা লক্ষণ সেনের আমলে। তাই তো বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দিল্লির সুলতানের দরবারে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে সশরীরে হাজির হলে—সুলতান তার শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে গৌড়ে পাঠালেন অত্যাচারী রাজা লক্ষণ সেনকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য। অসীম সাহসী বখতিয়ার খিলজি এতো দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে রাজা লক্ষণ সেনের রাজপ্রাসাদে পৌঁছেছিল যে, কেবল মাত্র তার সতেরো জন সহযোদ্ধা তাকে অনুসরণ করতে পেরেছিল; বাকি সবাই পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন। এই খবর রাজা লক্ষণ সেনের কানে পৌঁছাতেই, ভীত-কাপুরুষ রাজা দুপুরের খাবার ফেলে, বিনা যুদ্ধে এক কাপড়ে প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। মুসলমানদের গৌড় বিজয়ের পর থেকে বৌদ্ধদের উপর হিন্দুদের অত্যাচারের মাত্রা কমতে শুরু করে; এখন আমরা নির্ভয়ে, শান্তিতে আমাদের ধর্ম পালন করতে পারছি।

—গুরুদেব, আমার দাদাজান ছিলেন সেই সতেরো জন সৈন্যের মধ্যে একজন; দাদাজানের মুখে এই গল্প অনেক শুনেছি।

—তাই নাকি ওমর! তবে তো তোমাকে সাহায্য করা এখন আমার গুরু দায়িত্ব। আসলে কী জানো—হিংসা ও ঘৃণার মাধ্যমে কোনো কিছু অর্জন, অথবা সৃষ্টি করা যায় না—কেবল মাত্র ধ্বংস ছাড়া। হিংসা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করে; একমাত্র ভালোবাসাই পারে হৃদয়কে নির্মল করতে। অস্ত্র কখনো মানুষের মন জয় করতে পারে না—ভালোবাসার দ্বারাই সেটা সম্ভব। তাই তো প্রভু বুদ্ধ আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।

গুরুদেবের গল্প শুনতে শুনতে অনেক রাত হয়ে গেল, সবাই শুয়ে পড়েছে; আগামীকাল ভোরে আবার যাত্রা শুরু হবে।

সারাদিনের হাঁটার ক্লান্তিতে ওমরের পা দুটো যেন অবশ হয়ে গেছে; তবু দু’চোখে ঘুম নেই তার; হাত দুটো মাথার নিচে দিয়ে চিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে সে। এক দিনেই তার জীবন আমূল বদলে গেছে; আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আম্মার কথা ভাবছে ওমর—আম্মা ছিল, তার জীবনটা ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল; এখন আম্মার সাথে সাথে তার জীবন থেকে ভালোবাসাও হারিয়ে গেছে।

সে এখন একা, এই রাতের নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মতো একা; তবুও বাড়ির দম বন্ধ করা গুমোট আবহাওয়ার চাইতে এই মুক্ত আকাশ অনেক ভালো—এখানে সে তার মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচাতে পারবে, চিন্তা করতে পারবে; আর হয়তোবা জীবনের পাঠশালায় পড়তে পড়তে অনেক কিছু শিখতে পারবে।

ওমর ভাবছে—ভালোবাসাই মনে হয় মানুষের জীবনের চালিকা শক্তি, তাই প্রভু বুদ্ধ মানুষকে ভালোবাসতে বলেছেন। আজ সকাল পর্যন্ত এই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সে চিনতো না, অথচ এখন এরাই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আপন ভাইয়ের মতো। এই সব কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল ওমর।

ভোরে পাখির কলতানে ঘুম ভাঙলো সকলের; ওমরকে স্বাগত জানালো এক নতুন বাস্তবতা, নতুন জীবন; এই জীবনের কোনো জটিলতা নেই; সহজ সরল এক শান্তির জীবন; যেখানে কোনো দুঃখ নেই, বেদনা নেই, স্মৃতির পিছুটান নেই—আছে শুধু আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে প্রকৃত জীবন হিসেবে গড়ে তোলার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। সুবিশাল বটবৃক্ষের ছায়া ভেদ করে যেন ঝরে পড়ছে সকালের নরম আলো, কুয়াশার চাদর সরিয়ে রাঙা রাজকন্যার মতো জেগে উঠছে ধলেশ্বরী নদী। ওমরের জীবনের গতকাল আক্ষরিক অর্থে অতীত—ফেলে আসা মুরাদনগর যেন কোনো এক সুদূর স্বপ্নময় কল্পনা।

খ.
ওমরের সম্মতি নিয়ে তাকে ন্যাড়া করে বালকদের এক জোড়া চীবর দেওয়া হয়েছে। কারণ, এক দল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে সাধারণ সাজ-পোশাকে ওমরকে বেমানান লাগছিল। দলটাকে এখনো বহুদূর যেতে হবে—ভিন্ন পোশাকে ওমরকে নিয়ে পথে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো, তাই ওমরকেও নিজেদের মতো সমগোত্রীয় করে নিয়েছে তারা। নদীতে স্নান সেরে, চীবর পরিধান করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে আরও এক জন বৌদ্ধ হয়ে গেল ওমর। গতকালের ওমরের অস্তিত্ব আজ আর নেই, বিলুপ্ত হয়ে গেছে—তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, সে এখন এক বৌদ্ধ বালক।

স্নান সেরে সবাই ভোরের নরম আলোয় বট বৃক্ষের তলে ধ্যানে বসেছে—পথ চলা, দিনে একবার সন্ধ্যায় আহার গ্ৰহণ, সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত ধ্যান করা, এই সবই এই বৌদ্ধদের দলটির জীবন চক্র। আজ সকলের সাথে ওমরও ধ্যানে বসেছে; বৌদ্ধদের উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ নির্বাণ, কিন্তু ওমর একাগ্ৰচিত্তে তার আম্মার কথা ভাবতে লাগল—বিষণ্নতায় ভরে গেল ওমরের মন। এই ভাবে সূর্যের আলোর তেজ না বাড়া পর্যন্ত সবাই ধ্যান করল; তারপর যাবতীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে গুরুদেবের নেতৃত্বে শুরু হলো আবার পথ চলা।

সারাদিন ঘুরে ঘুরে তিনটি গ্ৰাম হতে দান গ্ৰহণ করে, এক আম বাগানে রাত কাটানোর জন্য আস্থানা গাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন গুরুদেব মলয় বর্মন। এক বেলা যতটুকু আহারের প্রয়োজন, ততটুকু জোগাড় হয়ে গেলে, আর কোনো আহার সংগ্ৰহ করার কোনো প্রয়োজন নেই; বাড়তি সামগ্রী মানে বাড়তি বোঝা, আবার বাড়তি সঞ্চয়ের লোভ আত্মাকে কলুষিত করতে পারে। সারাদিন হাঁটার ক্লান্তির পরে আহার যা-ই হোক না কেন, তা তৃপ্তিদায়ক মনে হয়; তৃপ্তি সহকারে আহার করার পরে ধ্যানে বসেছে সবাই।

এক পর্যায়ে গুরুদেবের ডাকে সবার ধ্যান ভাঙলো,—’আমার শিষ্যগণ, আজ আমি আত্মা ও দেহ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।’
গুরুদেবের অমৃত বচন শোনার জন্য সবাই গুরুদেবের চার পাশে গোল হয়ে বসেছে; গুরুদেব শুরু করলেন,—’শোনো, আত্মা হচ্ছে মূল চালিকা শক্তি, শরীর শুধু একটি বাহন মাত্র—বলা চলে শরীর হচ্ছে কোনো গাড়ির চাকার মতো; শরীরের কাজ হলো আত্মার হুকুম পালন করা।’

—গুরুদেব, আমাদের যদি আরও একটু বিশদ আকারে বুঝিয়ে বলতেন। যুবক তিনজন একসাথে গুরুদেবকে অনুরোধ জানালো।

—ঠিক আছে, বলছি। আমাদের মৃত্যুর পরে কী হয়? শরীরের কি তখন কোনো কার্যক্ষমতা থাকে?

—না, গুরুদেব।

—অর্থাৎ আত্মাবিহীন শরীর একটি জড় পদার্থ ছাড়া আর কিছু নয়; আত্মাই শরীরের অভ্যন্তরে শক্তি উৎপাদন করে, শরীরকে গতিশীল করে; কিন্তু আত্মা যখন শরীর ছেড়ে চলে যায়, তখন শরীরের আর গতি থাকে না; শরীর তখন পরিণত হয় জড় পদার্থে—আমরা যাকে বলি লাশ, অথবা মৃতদেহ। অতএব আত্মাই হচ্ছে সেই শক্তি, যা আমাদের শরীরে গতি সঞ্চার করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তবে আত্মা কিন্তু চিরস্থায়ী বা শাশ্বত নয়; আবার আত্মার শক্তি আমৃত্যু একই থাকলেও, তার স্বরূপ পরিবর্তনশীল।

—যেমন, গুরুদেব?

—দেখ, আমরা যে আত্মা নিয়ে জন্মগ্রহণ করি, মৃত্যুর সময়ও তো সেই একই আত্মার বিনাশ ঘটে; কিন্তু তার রূপ কি একই থাকে? উত্তর হচ্ছে—না। আর মৃত্যুর পরে আত্মার পূণর্জন্মে আমরা বিশ্বাস করি না; এখানেই হিন্দু দর্শনের সাথে বৌদ্ধ দর্শনের বিশাল পার্থক্য। আত্মার শক্তি আবার দুই ধরণের।

—যেমন, গুরুদেব।

—এক ধরনের শক্তি হচ্ছে আবেগ বা অনুভূতি; আর এক প্রকার শক্তি হচ্ছে প্রজ্ঞা অথবা জ্ঞান; এই দুই ধরনের শক্তির দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আমাদের আত্মাকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে; এবং যাবতীয় মানবিক ক্রিয়া-কলাপের উৎস ও উৎপত্তির মূলে এই শক্তি। এদিকে আবেগ ও অনুভূতি হচ্ছে অন্ধ, কিন্তু জ্ঞান বা প্রজ্ঞা চক্ষুষ্মান।

—আমাদের জ্ঞান সামান্য গুরুদেব, আমাদের পথপ্রদর্শন করুন।

গুরুদেবের বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানার জন্য ব্যাকুল যুবকেরা আবার সমস্বরে তাঁকে অনুরোধ জানালো।

—মনে করো, আবেগের তাড়নায় আমরা হিংসা বা ঘৃণার বশবর্তী হয়ে পাপ কাজে লিপ্ত হই, সংসারের লোভ-লালসায় জড়িয়ে পড়ি। আবার আবেগের বিপরীতে জ্ঞান বা প্রজ্ঞা আমাদের শিক্ষা দেয় কোনটা সঠিক আর কোনটা সঠিক নয়; আমাদের কী করা উচিত, আর কোনটা করা অনুচিত। আবেগ যখন আমাদের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন আমরা ভুল পথে পরিচালিত হই; কিন্তু শুধুমাত্র জ্ঞান বা প্রজ্ঞার মাধ্যমে আমরা সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারি। ধ্যানের মাধ্যমে আত্মার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে জ্ঞানের পথে পরিচালিত করা যায়—প্রভু বুদ্ধ আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছেন, আর এজন্যই ধ্যান এতো গুরুত্বপূর্ণ; আশা করি তোমরা বুঝতে পেরেছো?

—আজ্ঞে, গুরুদেব।

ওমর এখানে একজন মনোযোগী শ্রোতা মাত্র। মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে সে অনেক কিছুই শিখেছে; কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে জ্ঞানের কোনো শেষ নেই; অনেক কিছুই এখনো শেখার বাকি আছে। গুরুদেব ওমরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,—’ওমর, তোমাদের নবী মোহাম্মদ তো হেরা পর্বতের গুহায় গভীর ধ্যানের মাধ্যমে নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছিলেন; আল কোরআন তো সর্বপ্রথম হেরা পর্বতের গুহায় নাযিল হয়েছিল, ঠিক নয় কি ওমর?’

—আজ্ঞে, গুরুদেব; আপনি ঠিকই বলেছেন।

—ওমর, তোমাদের নামাজ, আর আমাদের ধ্যান একই; শুধু ভিন্নতা রূপে।

ওমর অবাক হয়ে গেল, গুরুদেব তার ধর্ম সম্পর্কেও অনেক খবরাখবর রাখেন, গুরুদেবের প্রতি ওমরের ভক্তি আরও বেড়ে গেল।

—এই পৃথিবী আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা; এখানে আমরা যে যেমন কাজ করবো, সে ঠিক তেমনি কর্মফল ভোগ করব। পাপের পঙ্কিলতায় ডুবে আমরা এই পৃথিবীকে নরকে পরিণত করতে পারি; আবার আমরাই পারি জ্ঞানের আলো জ্বেলে পৃথিবীকে স্বর্গে রূপান্তর করতে। এখন নিদ্রার সময় হয়েছে, শরীরের সঠিক বিশ্রামের জন্য নিদ্রার প্রয়োজন; আর নিদ্রাও এক ধরনের ধ্যান। নিদ্রার মাধ্যমে শরীরের প্রফুল্লতা অর্জন করা যায়; আগামী দিনের পথ চলার সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করা যায়; অতএব চলো আমরা এখন নিদ্রা যাই।

এই বলে গুরুদেব তার আলোচনা শেষ করলেন। কিন্তু গুরুদেবের প্রতিটি কথাই ওমরের মনে প্রতিধ্বনি তুললো—খুলে দিলো জ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত।

(চলবে)

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension