
সঙ্ঘ বিরোধী নেতাজি, সর্দার প্যাটেলকে কেন আপন করেছে বিজেপি? জানালেন দিলীপ
রূপসী বাংলা কলকাতা ডেস্ক: নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু বা সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল – রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে তাঁরা কেউই সাদা চোখে দেখতেন না৷ নেতাজির বিভিন্ন লেখা থেকেই তাঁর বামপন্থী মনভাবের কথা পরিষ্কার হয়ে যায়৷ ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিষ্ঠাতা নেতাজি তার বেশ কয়েকটি লেখাতেই দেশে হিন্দু মৌলবাদের বিরোধিতা করেছিলেন৷
অন্যদিকে ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল সঙ্ঘকে ভালো চোখে দেখতেন না বলে দাবি করেছে কংগ্রেস৷ কংগ্রেসি নেতারা মহত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর জনসঙ্ঘের প্রণেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সর্দার প্যাটেলের লেখা একটি চিঠি উদ্ধৃত করেছেন৷ সেই চিঠিতে সর্দার প্যাটেল শ্যামাপ্রসাদকে লিখেছিলেন, ‘‘হিন্দু মহাসভার একটি চরমপন্থী অংশ এই ঘটনার (গান্ধী হত্যা) সঙ্গে যুক্ত ছিল৷ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কাজকর্ম সরকার এবং রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক৷’’
সর্দার প্যাটেলই আবার ৬ জানুয়ারি, ১৯৪৮ সালে লক্ষ্নৌতে জনসভায় বলেছিলেন, ‘‘কংগ্রেসের অনেকেই মনে করেন, তাঁরা ক্ষমতায় আছেন বলেই সঙ্ঘকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবেন৷ কিন্তু কোনও সংগঠনকে ডান্ডা পেটা করে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়৷ ডান্ডা চোরেদের জন্য৷ কিন্তু ওরা (সঙ্ঘীরা) দেশভক্ত৷ দেশকে ভালোবাসেন৷ কিন্তু তাঁদের চিন্তাধারা অন্যদিকে বিস্তারিত হয়েছে৷ কংগ্রেসিরা তাঁদের ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিক৷’’
লৌহপুরুষ বল্লবভাই প্যাটেলের ১৪৩ তম জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশ্বের সব থেকে উচু মূর্তি ‘Statue of Unity’ উদ্বোধন করেছেন৷ আবার কিছুদিন আগেই, ২৪ অক্টোবর, লালকেল্লায় প্রথা ভেঙে জাতীয় পতাকা উত্তলোন করে আজাদ হিন্দ সরকারের ৭৫ বর্ষপূর্তি উৎযাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী৷ কিন্তু আপাত দুই সঙ্ঘ বিরোধী নেতাকে কয়েক যুগ পর জাতীয় রাজনীতিতে কেন প্রসঙ্গিক করতে চাইছেন মোদী৷ লোকসভা ভোচমুখী দেশ এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছে৷ রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ বুধবার ছিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন৷
সর্দার প্যাটেল সঙ্ঘকে ভালো চোখে দেখতেন কী? দিলীপ ঘোষের জবাব, ‘‘সর্দার প্যাটেল তো আর সরকার চালাতেন না৷ চালাতেন জওহরলাল নেহরু৷ যদি সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে থাকেন তা সরকারের সিদ্ধান্ত৷ উনি (প্যাটেল) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন৷ সঙ্ঘের সঙ্গে সর্দার প্যাটেল ভালো ব্যবহার না করে থাকলে ছোট হয়ে যাবেন কেন? উনি সঙ্ঘের ব্যাপারে জানতেন৷ সঙ্ঘকে কংগ্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে উনি বলেছিলেন৷
সঙ্ঘ বলেছিল, তাদের কাজ রাজনীতি করা নয়৷ স্বাধীনতা হয়েছে৷ কিন্তু দেশের পুনর্গঠন করতে হবে৷ সর্দার প্যাটেল অনেক কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছেন৷ নয়তো আজাদ কাশ্মীরের (পাক অধিকৃত কাশ্মীর) মতো অনেক রুগ্ন জায়গা এদেশে থাকতো৷ সর্দার প্যাটেলকে যাঁরা ছোট করেছেন, তারা আজ কষ্ট পাচ্ছে৷ কিন্তু আমরা যোগ্য স্বীকৃতি দিচ্ছি৷’’
তিনি আরও জানান, ‘‘সঙ্ঘকে নেহরুর শেষ করে দেওয়ার চক্রান্তের ব্যাপারে প্যাটেলের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল৷ বলা হয়, সঙ্ঘের সংবিধান জমা দিতে হবে৷ সঙ্ঘের সংবিধান নেই৷ কিন্তু সঙ্ঘের কার্যকর্তারা সংবিধান দিয়েছিলেন৷ এটা সরকারি যে পদ্ধতি সে ভাবেই হয়েছিল৷ সেই জন্য কখনও আমরা প্যাটেলের বিরুদ্ধে বলিনি৷ দেশের জন্য প্যাটেলের যোগদান (অবদান) কে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি৷ কংগ্রেস প্যাটেলকে ব্যবহার করেছে, কিন্তু সম্মান দেয়নি৷ সেই সম্মান দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী৷’’
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র এদিন সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুদিনকে ভুলিয়ে দিতে চাইছে মোদী সরকার৷ উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালের দিনেই হত্যা করা হয় ইন্দিরাকে৷ রাজ্য বিজেপির সভাপতির মতে, ‘‘ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে তো এতদিন বাড়াবাড়ি হয়েছেই৷ তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন কংগ্রেস পালন করুক, তাতে আপত্তি নেই৷ মানুষ যদি ভুলে যায়, তবে তো বিজেপিকে দোষ দেওয়া যায় না৷ কিন্তু প্যাটেলের যে অবদান, তা নিয়ে কেন তারা (কংগ্রেস) বাড়াবাড়ি করেন না৷ কেন তাঁকে সম্মান দেওয়া হয়নি৷৷ তাঁর নামে কেন প্রকল্প করা হয়নি৷ আজ ইতিহাস প্রতিশোধ নিচ্ছে৷ মেনে নেওয়া উচিত৷ কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই৷’’
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বিভিন্ন লেখাতেই পরিষ্কার তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল সঙ্ঘের বিপরীতে৷ তিনি বাম মনোভাবাপন্ন ছিলেন৷ বিজেপি তাঁর ভাবসূর্তিকে সামনে আনতে চাইছে কেন? দিলীপের জবাব, ‘‘নেতাজি বা সর্দার প্যাটেল কোনও রাজনৈতিক দলের নয়৷ এরা দেশের৷ কিন্তু এদের অবদান সমাজের সামনে এখনও তুলে ধরা হয়নি৷ যারা তাঁদের ছবি লাগিয়ে রাজনীতি করেছেন, ব্যবসা চালিয়েছে, তাঁরাই করেনি৷ ভারতীয় জনতা পার্টি বা মোদীজি সেই মহাপুরুষদের স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের অবদান সমাজের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন৷ আজ দেশকে Motivate করতে গেলে এই মহান পুরুষদের চরিত্র তুলে ধরার দরকার আছে৷ তাঁদের সব কিছু আমাদের মতের সঙ্গে মেলে না৷ তাঁরাও রাজনীতি করেছেন৷ রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেক কিছু বলতে হয়, করতে হয়, হয়তো সার্বজনীন নয় না৷ তাঁদের ত্যাগ, তপশ্যা, বলিদানকে কেউ খাটো করে দেখতে পারে না৷’’
আর সিপিএম? দিলীপ বলছেন, ‘‘কমিউনিস্টরা দেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছেন৷ ব্যক্তিগতভাবে জ্যোতি বসু বা ইএমএস নম্বুদিরিপাদের সঙ্গে আমাদের কোনও বিরোধ নেই৷ কিন্তু দেশের স্বাধীনতায় এরা বিশ্বাস ঘাতকতা করেছেন৷ পিছন থেকে ছুরি মেরেছেন৷ দেশের সম্মানীয় মহাপুরুষদের সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলেছেন৷ শত্রুদের দের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন৷ সেইজন্য আমরা কমিউনিস্টদেরকে সম্মানের চোখে দেখি না৷’’



