সাঁওতাল মুক্তিযোদ্ধা
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ আমাদের দেশে প্রায় কিংবদন্তিতূল্য হয়ে আছে। এ দেশের সব জনজাগরণ, উত্থান ও বিদ্রোহে সাঁওতালদের বিভিন্ন সময়ের লড়াই এক অনুপম প্রেরণা যোগায়। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার সাঁওতাল পরগনায় ১৮৫৫ সালে এক অসামান্য ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে সেটা মহাজাগরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই বিদ্রোহ পর্বের নেতৃত্বে ছিলেন চার ভ্রাতা-সিদু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব। বিশেষত সিদু-কানু ভাতৃদ্বয় তাদের ত্যাগ, অনমনীয়তা ও অবিচল প্রতিজ্ঞার জন্য বিদ্রোহীদের দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। সরল ও শিক্ষা বঞ্চিত সাঁওতালদের ওপর শোষণ, বঞ্চনা ও পীড়নের ফলশ্রুতিতে সেদিন তারা রুখে দাঁড়িয়েছিল। একই সালের ১০ জুন ৫০ হাজার সাঁওতাল কোলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে। ভূস্বামী, জোতদার, মহাজন ও পুলিশের অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জানাতে সাঁওতালদের এই কোলকাতা যাত্রা। পথিমধ্যে দারোগা-পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বিদ্রোহী সাঁওতালরা দারোগাসহ ১৯ জনকে হত্যা করে। অতঃপর কানু ঘোষণা করেন- ‘হুলহুল দিশমরে ঢারওয়াক দারোগা বানুক কোওয়া, হাকিম বানুক কোওয়া, সরকার বানুগেয়া। নিতক হড় হপন রেয়াক রাজ হেচ সেটের এনা।’ অর্থাৎ- বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। চারদিকে শাল গাছের ডাল পাঠাও। এখন দারোগা নেই, হাকিম নেই, সরকার নেই। এবার সাঁওতালদের রাজত্ব এসেছে।
দেড়শ’ বছর পর এখন সাঁওতাল এলাকায় ৩০ জুন সিদু, কানুকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে সিদু-কানু দিবস পালিত হয়। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর রক্তে-মজ্জায় বিদ্রোহ মিশে আছে। একটি জনপ্রিয় সাঁওতালি গানের শেষের চরন এরকম-
‘নুড়িচ নাঁড়াড় গাই কাডা, নাচেল লাগিৎ, সেদায় লেকা বেতাবেতেৎ, ঞাম রুওয়াড় নাগিও, তবে দো বেনে হুল গেয়াছো।’ এর অর্থ- গো মহিষ, লাঙল, ধন-সম্পত্তির জন্য পূর্বের মতো আবার ফিরে পাবার জন্য আমরা বিদ্রোহ করব।বিশ শতকের প্রথম দিকে দিনাজপুর, রংপুর, এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে (নাচোল) সাঁওতাল কৃষকদের তেজোদীপ্ত বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। তেভাগা আন্দোলন বলে পরিচিত এই লড়াই-এ সাঁওতাল বিদ্রোহীদের যে বল ও বীর্য প্রদর্শিত হয়েছে তা অসাধারণ। মুক্তিযুদ্ধেও এই লড়াকু সম্প্রদায়ের অনন্য অংশগ্রহণ ছিল। তারা যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুক নিয়ে লড়াই-এর সূচনা করে। কিন্তু আধুনিক মারণাস্ত্রের মুখে তীর-ধনুক নিয়ে টিকে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। অতঃপর রণকৌশল বদলে ভারতে পাড়ি জমায়। সাঁওতাল আদিবাসী নেতা সাগরাম মাঝির উদ্যোগে ও তৎপরতায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত সাঁওতাল তরুণরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ভারতের পাতিরাম, মধুপুর, শিলিগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, পানিঘাটা প্রভৃতি এলাকায় অবস্থিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট, রংপুর ও দিনাজপুরের আদিবাসী সাঁওতাল তরুণরা এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেন।
সাঁওতাল মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা তিন শতাধিক।চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় ২৫০ জন সাঁওতাল যোদ্ধা ছিলেন। নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর থানার দহা পাড়া গ্রামের সুরেন চন্দ্র পাহান ডাঙ্গি সীমান্ত হয়ে বালুরঘাট ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছান। তিনি মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে সঙ্গে নেন নিজ পরিবারের গিরিশ চন্দ্র পাহান, পরমেশ্বর চন্দ্র পাহান, ধীরেন চন্দ্র পাহান, ও রবীন চন্দ্র পাহান নামের চার যুবককে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা সাপাহার, পোরশাসহ কয়েকটি এলাকায় হানাদার বাহিনীর ওপর সফল আক্রমণ পরিচালনায় সক্ষম হন। দরিদ্র খেতমজুর সুরেন স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দিয়ে পূর্বের পেশায় নিয়োজিত হন। মাত্র দু’বছরের মাথায় কালা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় অসহায়ভাবে তিনি মারা যান। এই পরিবারের কখনও কেউ খোঁজখবর নেয় নি। কেবল স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীর সময় স্থানীয় থানা পরিষদ সুরেনের মা বৃদ্ধ দিনমজুর লক্ষ্মী রাণী পাহানকে একশ’ টাকার একটি প্রাইজবন্ড দিয়েছিল যা এক ধরনের পরিহাসই বটে। একই জেলার নিয়ামতপুর থানার জাবড়ি গ্রামের পটল সরেন অনেক অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। একটা অপারেশনে তিনি নিজে একজন পাকসেনাকে জীবন্ত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজেদের তাঁবুতে। অনেক অবদান রেখে যুদ্ধে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন রাজশাহী জেলার তাদের থানার আদিবাসী যোদ্ধা চাম্পাই সুরেন। দুই ভাইসহ যুদ্ধে গিয়েছিলেন বিশ্বনাথ মাঝি। গৌড় বাগান ও শিলিগুড়িতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ডেল্টা কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাত নম্বর সাব সেক্টরের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীন চৌধুরীর অধীনে থেকে তিনি যুদ্ধ করেন। একটি যুদ্ধে বিশ্বনাথের দুজন সহযোদ্ধা পাকসেনার নিকট ধরা পড়ে। মোহনপুর থানায় তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে, এই খবর পেয়ে তারা থানা আক্রমণ করেন। আক্রমণে বদ্যিনাথ হাসদা নামে একজন যোদ্ধা পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা বন্দী সহযোদ্ধাদের মুক্ত ও বেশ কিছু অস্ত্র হস্তগত করেন।
আইনজীবী বিশ্বনাথ মাঝি দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে নির্জীব নিস্ক্রীয় হয়ে পড়ে আছেন। অর্থকষ্টে চিকিৎসায় সমর্থ হচ্ছেন না। অই হুলের প্রণোদনায় যুদ্ধ করেছেন শ্রীচরণ উঁরাও মুরল মাহাতো, ভুলু পাহান বধন চন্দ্র সরকার, চান্দু কুজুর, আগাপিত হেমব্রম, লবীন মুণ্ডা, মঙ্গল মারান্ডী, মদি কিসকু, ছোট হাজদা, দুলাল সরদার, হেমন্ত মুরারী মুন্ডাসহ অসংখ্য আদিবাসী যোদ্ধা।চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোদাগাড়ি থানার বীরযোদ্ধা বিশ্বনাথ টুডু ছিলেন একজন প্লাটুন কমান্ডার। চাঁপাই নবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় বেশ ক’টি সংঘর্ষে তিনি সাফল্যের সাথে নেতৃত্ব দেন। একই থানার সুধীর চন্দ্র মাঝি কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অমিত সাহসে লড়াই করেছেন। সম সরেন, চাম্পাই সরেন, ঠাকুর মুরমু, সুশীল সরেন, দাসু মুরমু প্রমুখ আদিবাসী যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে, রক্তে হুল নিয়ে সীমাহীন ত্যাগ ও তেজে লড়াই চালিয়ে গেছেন। নওগাঁর জগদল গ্রামের আদিবাসী তরুণ মাথাই টুডু বিভিন্ন ইয়থ ক্যাম্পে এবং চূড়ান্তভাবে পানিঘাটায় এক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। চকচান্দাড়ু, বদলগাছি ও পাহাড়পুরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন মাথাই টুডু।ফাদার লুকাশ মারান্ডি। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের খ্রিস্ট ধর্মীয় একজন যাজক। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বে শহীদ মানব সেবক এই সাঁওতাল পুরোহিতের বাড়ি নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানার বেনীদুয়ার গ্রামে। এরপর তিনি বিহারের রাঁচি ও কেরালার নেল্লোর সেমিনারিতে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে খ্রিস্টান পুরোহিত হিসেবে কর্মক্ষেত্র শুরু করেন। একাত্তরে তিনি রুহিয়া মিশনে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ ও খাদ্যের যোগান দিয়েছেন গোপনে। ভারতে পলায়নপর শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছেন ও সহায়তা করেছেন। পাকসেনারা এই খবর পেয়ে ২১ এপ্রিল মিশনে গিয়ে ফাদার লুকাশকে হত্যা করে।
মুক্তিযুদ্ধে গারো সম্প্রদায়
বাংলাদেশের আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের বাস প্রধানত ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকার পাহাড়গুলোতে। সাধারণভাবে এগুলোকে বলা হয় গারো পাহাড়। গারো অধ্যুষিত সীমান্ত এলাকায় পাক বাহিনীর কয়েকটি ঘাঁটি ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর পাকসেনারা গাড়ো জনপদে প্রায়শই অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ লুটপাট করেছে। এ কারণে গারো সম্প্রদায়ের একটা বৃহৎ অংশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। মেঘালয়, তুরা, নেলুয়াগিরি ও বিজয়পুর ইত্যাদি জেলার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে অসহায় জীবন যাপন করেছে।
এ সময় গারো তরুণদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। গারোদের এলাকাটি ছিল এগার নম্বর সেক্টরের অধীন। এরা বাঘামারা, তুরা, রংরা, রঙ্গবাগ, তুরাগ এবং ভুটানের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় এক মাস অস্ত্র চালনা ও গেরিলা রণকৌশলের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। অতঃপর ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সাব সেক্টরে যোগ দেন। এসব অঞ্চলে সাব সেক্টর কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার, সেকশন কমান্ডার বা কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন চুন্নু মিয়া, এস. বাউল, যতীন্দ্র সাংমা, সত্যেন্দ্র হাজং, পৃথ্বিরাজ, আলেকজান্ডার ঘাগ্রা, সুবেদার আদম আলী, ফজলুর রহমান আকনজী, ধীরেন্দ্র রিছিল, ইলিয়াস চৌধুরী, এক্সিবিশন বনোয়ারি, দীপক সাংমা, আবদুল গফুর প্রমুখ। ৪ জন কমান্ডারের নামে ৪টি এবং অন্য ২টি মোট ৬টি কোম্পানি (বেশিও হতে পারে) গঠন করা হয়। এগুলো হল, ০১ কোম্পানি, হাফিজ কোম্পানি, দালডা কোম্পানি, ফজলু কোম্পানি, ইলিয়াস কোম্পানি ও দীপক কোম্পানি।
গারো মুক্তিযোদ্ধারা যে এলাকা জুড়ে যুদ্ধ করেছেন, অপারেশন চালিয়েছেন, সেগুলো যথাক্রমে- কলসিন্দুর, দুর্গাপুর, মনসাপাড়া, ধোবাউড়া, জিকুয়া, ফুলপুর, পূর্বধলা, পুরাকান্দুলয়া, গোয়াতলা, বাদামবাড়ি, ফারাংপাড়া, নাজিরপুর, বিজয়পুর, ধবরাম, টাঙ্গাটি, নেলুয়াগিরি, সান্দা, বারমারি, চণ্ডিগড়, বিরিশিরি ও জারিয়া-জাঞ্জাইল।
শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দ্রং একাত্তরের জুন মাসের শেষের দিকে নকলায় একটি ব্রিজ অপারেশনের পর পালাতে গিয়ে রাজাকারদের কাছে ধরা পড়েন। রাজাকাররা তাকে পাক বাহিনীর কাছে তুলে দেয়। পাক সেনারা টানা কয়েকদিন তাকে অমানুষিক নির্যাতন করে। অবশেষে ফুলপুর থানার কংস নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে। মেধাবী ছাত্র পরিমল দ্রং প্রথমে বিড়ইডাকুনী ক্যাথলিক মিশন স্কুলে এবং পরে বিড়ইডাকুনী হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন। একাত্তরে তিনি এসএসসি পরিক্ষার্থী ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ সদস্য কুদরত উল্লাহ মন্ডল এবং বিরইডাকুনী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সাবেক সাংসদ হালুয়াঘাট থানার তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেন। পরিমল দ্রং এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মেঘালয়ের তুরা শহরে এক মাসের প্রশিক্ষণ নেবার পর পরিমল ১১ নম্বর সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত হন। এই সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার আবদুল গফুরের নেতৃত্বে পরিমল বিভিন্ন গেরিলা অ্যাকশনে অংশ নেন। নকলায় একটি সেকি ধ্বংসের পর প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের অভাবে কালিগঞ্জ হয়ে রামনগর গিয়ে পৌঁছলে সেখানে ধৃত হন। হালুয়াঘাট মধ্যবাজারে একটি মার্কেট এবং বিড়ইডাকুনী হাই স্কুলের শহীদ মিনারটি শহীদ পরিমল দ্রং-এর নামে উৎসর্গীত। ময়মনসিংহে ‘শহীদ পরিমল দ্রং টুর্নামেন্ট’ নামে একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয় প্রতি বছর।
১১ নম্বর সেক্টরে দীপক কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার দীপক সাংমাজুলাই মাসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তুরায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দেশে আসার কিছুকাল পর ১০৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে দীপক কোম্পানি। শত্রুসৈন্য বন্দীসহ বেশ ক’টি সফল অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। ১১ জন যোদ্ধার নেতৃত্ব গ্রহণ করে পদাতিক বাহিনীর সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন এক্সিবিশন বনোয়ারি। একাত্তরের ১৫ জুলাই ভোর বেলায় ফারাংপাড়া পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণের মধ্য দিয়ে বনোয়ারির যোদ্ধা জীবনের সূত্রপাত হয়। এরপর নেলুয়াগিরি, টাঙ্গানি, বিজয়পুর, ভবানীপুর, নলুয়াপাড়া, কান্দা, বারমারী, চণ্ডিগড়, দুর্গাপুর প্রভৃতি এলাকায় ২৫টিরও বেশি অপারেশনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
রংনাবাগ ক্যাম্পে ২৯ দিনের প্রশিক্ষণ নেন অরবিন্দ সাংমা। এরপর ফজলু কোম্পানির অধীনে ৩৩ জন গেরিলা যোদ্ধার নেতৃত্ব নিয়ে সহকারি প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছেন। ১১টি অপারেশনের ৮টিতে সাফল্যলাভ করেছেন অরবিন্দ সাংমা। এর মধ্যে ক্যাম্প আক্রমণসহ প্রত্যক্ষ যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। ভরতপুর গ্রামের অনাথ নকরেক আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ইলিয়াস কোম্পানির একজন সাধারণ সৈনিক হয়েও অনাথ কয়েকটি অসাধারণ সফল অপারেশনে অংশ নেন। বারোমারী সীমান্ত সড়কে তিনি সপরিবারে মেঘালয়ের ধাম্বুক শরণার্থী শিবিরে প্রথমে আশ্রয় গ্রহণ করেন। শিবিরে থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের কথা জানতে পারেন এবং তুরায় গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। কলমাকান্দা ও বিজয়পুরে দুটি দুর্ধর্ষ অপারেশন পরিচালনা করে অনাথদের দল। দুটি অপারেশনেই কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়।
প্লাটুন কমান্ডার ধীরেন্দ্র রিছিলের দলে ছিল ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। মে মাসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে এক মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ধীরেন্দ্র রিছিল। জুনের প্রথম সপ্তাহে তার প্রথম অপারেশনের সুযোগ ঘটে। ১২০ জন সহযোদ্ধা নিয়ে তিনি দুর্গাপুর থানার টাঙাটিতে অবস্থিত পাকবাহিনীর এক বড়সড় ক্যাম্পে আক্রমণ করেন। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পেছন থেকে তাদের কাভারিং দিয়ে সহায়তা করে। আক্রমণ পরিচালনার পূর্বেই পাকবাহিনী তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে অতর্কিতে গুলি শুরু করে। অতঃপর উভয় পক্ষের সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে উভয় পক্ষে হতাহত হয়। বাবুল নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও অপর একজন আহত হন। অন্যদিকে ৩৫ জন শত্রুসৈন্য নিহত ও ২৫ জন আহত হয়। নিহত সৈন্যদের লাশ হেলিকপ্টারে ও মহিষের গাড়িতে করে স্থানান্তর করে। মুক্তিযোদ্ধারা ৩টি চায়নিজ রাইফেল ও ২টি স্টেনগান হস্তগত করে। ধীরেন্দ্র ১২টি অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন এবং এর সবগুলোতেই সাফল্য অর্জন করেন।
ভদ্র মারাক সতের বছর বয়সে একাত্তরের এপ্রিল মাসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রথমে নেলুয়াগিরি আশ্রয় শিবিরে ও পরে বাঘমারা, তুরা ও আরেক জায়গায় ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত হন। ১১ জন আদিবাসী যোদ্ধার সেকশনে কমান্ডার হিসেবে ভদ্র মারাক শতাধিক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৮০ ভাগ অপারেশনে জয়লাভ করেন। বাদামবাড়ি সেনাঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করার মাধ্যমে তার যোদ্ধা জীবনের সূত্রপাত হয়। মাত্র ১৪ বছরের বালক পিরিসন রাংসা বাঘমারা আশ্রয় শিবিরে থাকাকালে সারাদেশে পাকবাহিনীর নির্যাতনের খবর জানতে পারেন। অতঃপর ভুটান ও তুরায় এক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন সাধারণ যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ধোবাউড়া, জিকুয়া, পূর্বধলা, ফুলপুর, দুর্গাপুর, কলসিন্দুর, পোড়াকান্দুলিয়া ও গোয়াতলায় ১০টি অপারেশনে সম্পৃক্ত ছিলেন। এগুলোর ৮টিতে পিরিসনদের দল সাফল্যলাভ করেছে। অত্যন্ত দরিদ্র এই যোদ্ধা বর্তমানে দিনমজুরী করেন। মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নকালে উইলিয়াম ম্রং যুদ্ধে যোগ দিয়ে ২৩১ জন যোদ্ধার এক দলের কোম্পানি কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। তেলেখালিতে ৩টি বড় ধরনের অপারেশন এবং বারোমারি ও কাঁটাখালির দুটি সেতু ধ্বংসে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। এক অপারেশনে তিনি সামান্য আহত হয়েছিলেন।
রংনাবাগ ট্রেনিং ক্যাম্পে এক মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের হাফিজ কোম্পানির একজন সদস্য হয়ে যুদ্ধ করেন স্তেফান নকরেক। পরে যোগ দেন পৃথ্বিরাজ কোম্পানিতে। ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুনের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন স্তেফান। এর ৩৩ জন উপজাতীয়। এর মধ্যে স্তেফানের এক ভাগ্নে ফিলিক্স নকরেকও ছিল। নাজিরপুর ও কলমাকান্দার দুটো ভয়াবহ অপারেশনে অংশ নেন স্তেফান। এ দুটি যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর অনেকে হতাহত হয়েছিল।
উল্লেখিতরা ছাড়াও আইনল সাংমা, আইসন মানখিন, খোজন সাংমা, থিওফিল হাজং, পরিমল মারাক, বির্নেস সাংমা, বীরেন্দ্র সাংমা, বেন্সিং নকরেক, যতীন্দ্র সাংমা, রবীন্দ্র হাজং, রিনেন্দ্র হাজং, সুবেন্দ্র সাংমা, স্পেনসন মানখিন, হেনরিত ম্রংসহ প্রায় দুইশত গারো ও হাজং তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
৩ জন শহীদ গারো মুক্তিযোদ্ধার কথা এ যাবৎ জানা গেছে। এরা হলেন- পরিমল দ্রং, আরং রিছিল ও অনিল মান্দা।
প্রবাসী সরকারের একটি চিঠি
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীনতাকামী অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারি পাকিস্তান সরকারের আনুগত্য ত্যাগ করে প্রবাসী সরকারে যোগ দেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা একে একে কোলকাতার থিয়েটার রোডে অবস্থিত প্রবাসী সরকারের দপ্তরে সমবেত হন। প্রবাসী সরকার তাদের দায়িত্ব বন্টন করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োজিত করে।
প্রবাসী সরকারের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন করে আদিবাসী বা উপজাতীয় অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারি প্রবাসী সরকারে যোগ দেন। সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের তৎকালীন সচিব এইচ. টি. ইমামের সাথেও এমন কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন যারা একাত্তরের এপ্রিল-মে মাসে সীমান্ত অতিক্রম করেন। পার্বত্যবাসীদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে পার্বত্য কর্মকর্তাদের সক্রিয় তৎপরতায় নিয়োজনের জন্য প্রবাসী সরকার এক পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়। এই প্রেক্ষিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রীপরিষদ সচিব এইট. টি. ইমাম প্রতিরক্ষা সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। গোপনীয় (Secret) সতর্কতা নির্দেশিত এই চিঠিটি লেখা হয় ২৩ অক্টোবর তারিখে। চিঠির বিরবণ নিম্নরূপ:
October 23, 1971A number of my tribal officers and staff crossed the border with me in the months of April/may, 1971. Since then we have been able to utilize the services of only very few of them. There are quite a few available now whose services can be very well utilized in our war effort.I have always maintained that no move toward Chittagong is possible without the assistance and co-operation of the tribal people Chittagong Hill tracts district. Special effort should, therefore, be made to win the friendship of as hill people as possible and neutralize those who are hostile. Given this background, I very strongly feel that we should direct our propaganda towards the hill tribes also.I came to know the other day that the Ministry of Defence was looking for persons who write scripts in Chakma language. I do not know whether this is in pursuance of the policy recommended by me above. In any case, I would like to emphasise that there are a number of tribal officers and staff who served under me and who can be utilized for this type of work. In case the secretary, Defence, wants their services, they can be engaged.
মনিপুরী মুক্তিযোদ্ধা
বাংলাদেশের তিনটি জেলায় এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী মনিপুরী সম্প্রদায় বাস করেন। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় মনিপুরীদের বসবাস। জানা যায়, দীর্ঘ আড়াইশ’ বছর আগে মনিপুরী সম্প্রদায় এদেশে আসেন এবং বসত গড়ে তোলেন। আত্মমগ্ন ও নির্বিরোধ স্বভাব মনিপুরীদের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ধর্মীয় আচারমন্ডিত সাংস্কৃতিক আবহে মনিপুরীদের জীবনের সমগ্রকাল। ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক কারণে মনিপুরীরা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে পরিগণিত। এসঙ্গে ও সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে এক বিভাজন- বিষ্ণুপুরী ও মনিপুরী। উভয় ভাগই মূলধারার মনিপুরী বলে দাবি করে। এসব কারণে সংখ্যালঘু বিষন্নবোধ মনিপুরীদের আচ্ছন্ন করে রাখে। সংস্কৃতি ও সাহিত্য ক্ষেত্রে মনিপুরী সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। মনিপুরী নৃত্য তো কেবল বাংলাদেশ বা উপমহাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপীই সমাদৃত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা মনিপুরী নৃত্য দেখে এত বিমোহিত হয়েছিলেন যে পরে শান্তিনিকেতনে একজন খ্যাতনামা মনিপুরী নৃত্যশিল্পী রেখে মনিপুরী নৃত্য শেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
রাজনীতি সম্পর্কে বরাবরই নিস্পৃহ মনিপুরীরা। প্রত্যক্ষভাবে কেউ রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় এমন একজনকেও এ যাবৎ দেখা যায় নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বেশ কিছু সংখ্যক মনিপুরী যুবক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। রাজনীতি নির্লিপ্ত এই যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার পেছনে দুটো কার্যকারণ। ১. আপন মাতৃভূমির প্রতি আজন্ম ভালোবাসা। ২. হানাদার বাহিনীর কবল থেকে আত্মরক্ষা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার সাথে সাথে কোনও অঞ্চল থেকে মনিপুরী জনসাধারণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। এমন এলাকার মধ্যে রয়েছে সিলেট শহরের মনিপুরী অধ্যুষিত মহল্লা, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানাধীন বিলগাঁও অঞ্চল, মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল থানাধীন সাতগাঁও অঞ্চল এবং কুলাউড়া থানাধীন বরইতলী অঞ্চল। এছাড়া অবশিষ্ট অন্যান্য অঞ্চলের মনিপুরী জনসাধারণ নামামুখী প্রতিকূলতার মধ্যে দেশেই থেকে যান। আর যারা যোদ্ধা জীবনের পথে পা বাড়ান তারা প্রাত্যহিক শঙ্কা-সঙ্কুলতায় দেশকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞায় রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে ফিরতে লাগলেন। অর্ধাহার-অনাহারে থেকে, জীবনবাজি রেখে হানাদার পাক বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে থাকলেন।
সিলেট শহরের টুকের বাজারের লালা দীঘির পাড়ের নীলমনি সিংহ ননীসহ তাদের দল যে কয়েকটি অপারেশন চালিয়েছিল তা হানাদার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল। ভোলগঞ্জ সাব-সেক্টরের অধীনে ননী আরও কয়েকটি অপারেশনে নৈপূণ্য দেখাতে সমর্থ হন। সিলেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে এখনও সক্রিয় রয়েছেন ননী।কর্নেল সি আর দত্তের ইকো সেক্টর-৪ এর অধীনে কাজ করেছেন কে. দীলিপ সিংহ। সিলেটের শিবগঞ্জের এই যোদ্ধা সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। হবিগঞ্জের গোবরখোলা গ্রামের মনমোহন সিংহ অনেকগুলো অপারেশনে অংশ নেন। কালেঙ্গার ডাকসুন্দর অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩ সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে সেকশন কমান্ডারের দায়িত্বসহ দুধপাতিল ও আরও কয়েকটি প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে অংশ নেন এবং তার নেতৃত্বে চুনারুঘাট থানা মুক্ত হয়। মনিপুরী কবি কারাম নীলবাবু সিংহ এবং নীলচান যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একত্রে থেকেছেন, যুদ্ধও করেছেন। প্রশিক্ষণ সমাপনের পর তারা যুদ্ধে যোগ দেবার সময় ঘোষণা করেছিলেন, অন্তত একজন পাঞ্জাবি সৈন্যকে সরাসরি নিজ হাতে হত্যা না করতে পারা পর্যন্ত ভাতের সাথে তরকারি খাবেন না। বলাবাহুল্য, অচিরেই তাদের প্রতিজ্ঞা পূরণ হয়েছিল। গ্রুপ কমান্ডার এল. হরেন্দ্র সিংহ ডজন খানেক অপারেশনে অংশ নিয়ে একটি যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তখন তিনি কিশোর বয়সি। পড়তেন দশম শ্রেণীতে। অন্যদিকে হবিগঞ্জের থোকতোম ভাতৃদ্বয় ছাড়া আরও অন্তত আটজন মনিপুরী যোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। এরা হলেন- রমন সিংহ, নোংমাইথেম গৌরমোহন সিংহ, খগেন্দ্র সিংহ, থোমদোন সিংহ, কারাম আতেন সিংহ, কুলচন্দ্র সিংহ, এম. নরেন্দ্র সিংহ, গৌরচন্দ্র সিংহ প্রমুখ।
মং যোদ্ধা
পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলা একসময় মং সার্কেলের অধীন একটি দেশীয় স্বশাসিত রাজ্য ছিল। ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার জনগোষ্ঠী বিক্ষোভ-প্রতিবাদ করে। ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলে আন্দোলন। মং সার্কেলের রাজা মপ্রু সেইন এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে রাজা ও মং জনগণের চাপা ক্ষোভ ছিল দুটো কারণে-
১. বিট্রিশ শাসিত ভারতে এই রাজ্যের রাজা বা রাণীর ছিল সর্বময় ক্ষমতা। পাকিস্তানি শাসকরা ক্রমশ তাদের ক্ষমতা রহিত করে।
২. কাপ্তাই বাঁধ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে এই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি কাপ্তাই লেকের জলে তলিয়ে যায়।
পরে এজন্য সরকার উপর্যুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয় নি বা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেরও প্রয়োজন মনে করে নি।এসব কারণে ক্ষুব্ধ পার্বত্যবাসী পাকিস্তানি শাসকদের শাসকদের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমদিকে রাজা মপ্রু’র মানিকছড়িতে অবস্থিত রাজবাড়িটি শহর থেকে পালিয়ে আসা ভীত-সন্ত্রস্ত জনসাধারণের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়। রাজা তার রাজভান্ডারের সব সম্পদ আশ্রিতদের অন্ন সংস্থানের জন্য নিয়োজিত করেন। চিকিৎসা সেবার জন্য একটি হাসপাতালও চালু করেন। পার্বত্য নারীরা মানবতার সেবায় এগিয়ে আসেন। আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি খাগড়ছড়ি পার্বত্য জেলাকে শত্রুমুক্ত রাখার জন্য বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর এবং তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজা গড়ে তোলেন প্রতিরক্ষা বূহ্য। তার নিজের ৩৩টি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র যোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন। নিজের কার ও কয়েকটি জিপ গাড়িও মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট হস্তান্তর করেন। একসময় মানিকছড়ির পতন অত্যাসন্ন হয়ে এলে রাজা তার রাজবাড়ি ও মাতৃভূমি পেছনে ফেলে পরিবার ও দলবল নিয়ে ত্রিপুরার সাবরুম শহরে যান।
সাবরুম সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় নিরাপত্তার অভাব দেখা দিলে রাজা রূপাইছড়ি শরণার্থী শিবিরে গিয়ে সাধারণ শরণার্থী জীবন যাপন শুরু করেন। নিকটবর্তী হরিণা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্যূটার এবং অস্ত্র অস্ত্র প্রশিক্ষণ থাকার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে লেগে গেলেন তিনি। এসময় রাজা মপ্রু’র মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার খবর বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রতিনিধিদের নিকট দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বের সকল বিবেকবান ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য রাজা মপ্রু হয়ে ওঠেন বিপজ্জনক এক ব্যক্তি। তারা রাজাকে হত্যা বা ছিনতাই করার ফন্দি আঁটে। মিজো বিদ্রোহীরা ছিল রাজা-বিরোধী। পাকিস্তানিরা মিজো বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রে কাজে লাগায়।
রাজার অবস্থান বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে সপরিবারে আগরতলায় স্থানান্তরিত করে। কিন্তু না, রাজা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বসে থাকেন নি। তিনি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বেশ কিছু অপারেশনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পর মপ্রু’র আত্মীয় ত্রিপুরার মহারাজা কিরিত বিক্রম তার রাজপ্রাসাদে রাজা মপ্রু’র পরিবারকে আশ্রয় দেন। মুক্তিবাহিনী ও পরে মিত্রবাহিনীর সাথে একত্রে এক সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িত হন। মিত্রবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনারারি কর্নেল রাঙ্ক দিয়ে এক ট্যাঙ্ক বাহিনীর সাথে রাজাকে সম্মুখ সমরে পাঠান। প্রথমে আখাউড়া অপারেশন ও পতন। অতঃপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আশুগঞ্জ ও ভৈরব থেকে রাজা মপ্রু’ মিত্রবাহিনীর সাথে ১৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন।বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের পর আগরতলা গিয়ে পরিবার নিয়ে মানিকছড়ি ফেরেন। তখন রাজবাড়ির সর্বস্ব লুন্ঠিত, বাড়িটিও প্রায় ধ্বংসস্তূপ। ফটিকছড়ি থেকে ভাড়া করা হাঁড়িপাতিল, থালা-বাসনে রাজ পরিবারের লোকজনদের আহারের বন্দোবস্ত হয়েছিল। সর্বস্ব হারিয়ে রাজা মপ্রু এক স্বাধীন দেশের পত্তনে অবদান রাখতে পেরেছেন, এতেই তার সন্তুষ্টি হয়েছিল। রাজা কোনও সরকারের নিকট থেকে কখনও ক্ষতিপূরণ, সহায়তা, এমনি কি স্বীকৃতিও পান নি।
আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা: অতুলনীয় কিছু বৈশিষ্ট্য
ক. একাত্তরে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য দেশপ্রেমের বোধ থেকে দেশের অসংখ্য তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। অনেকে পরিবেশ-পরিস্থিতি অথবা জীবনরক্ষার তাগিদ থেকেও যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। তেমনি মুক্তিযুদ্ধ-উত্তরকালে অনেক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন করে মুক্তিযোদ্ধাই রয়েছেন। আবার অনেকেই একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধা থাকেন নি। অনেকে বলেন, তারা বস্তুত রাজাকারই হয়ে গেছেন। কারণ একাত্তরে রাজাকাররা ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার উপাদান যত্রতত্র প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করেছে। সাম্প্রতিককালে ওই একইভাবে একই উপাদান যে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যবহার করছেন, তারা রাজাকার বৈ কিছু নয়।
আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের একজনকেও এই জঘন্য প্রক্রিয়ায় শামিলরত বলে দেখা যাবে না। তাদের কপটতা নেই, জটিলতা নেই আর তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও নেই। ফলে, এই সকল নোংরা উপাদান ব্যবহারে তারা অজ্ঞাত, অনভ্যস্ত।
খ. মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তি বাহিনী (পিস কমিটি), রাজাকার, আল বদর, আল শামস ইত্যাদি তথাকথিত বাহিনীর উদ্যোক্তা, নেতৃত্ব, সংগঠক ও সদস্য ছিল বাঙালিরা। আদিবাসীদের কেউই এই সকল দেশদ্রোহী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত হয় নি।
গ. মুক্তিযোদ্ধারা স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার বা সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে সনদপত্র গ্রহণ করেছেন। এটাই সবচেয়ে বড় মর্যাদা ও গর্বমন্ডিত স্মৃতি। অনেকে এই সনদ দেখিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আয়ত্ব করেছেন। সনদ বা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের বদৌলতে বৈধ-অবৈধ পন্থায় বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিকানা অর্জন করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা আদৌ সনদ গ্রহণ করেন নি। অনেকে এ সম্পর্কে জানতেনও না। অনেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন। ফলে যারা সনদ গ্রহণ করেছিলেন তাদের অনেকেই তা হারিয়ে বা নষ্ট করে ফেলেছেন।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থানার প্রায় একশ’ আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার বর্তমানে পেশা হল দিনমজুরি। এমনকি পরিবারের স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দিনমজুরি করেছেন বেশির ভাগ। এই এলাকারই একজন মুক্তিযোদ্ধা জীবীকার আর কোনও অবলম্বন না পেয়ে মানুষের দশ দুয়োরে ভিক্ষা করতে শুরু করেন। তিনি কোনও বাড়ির দুয়োরে পৌঁছে খটাস্ করে মিলিটারি কায়দায় স্যালুট দিতেন। একসময় ভিক্ষাবৃত্তি তাকে নিশ্চয়তা দিতে পারে নি বিধায় তিনি দেশান্তর হয়ে চলে গেছেন সেই মেঘালয়ে; যেখানে তিনি একাত্তরে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ওখানে গিয়ে লড়াকু সৈনিকটি কোন্ বৃত্তি গ্রহণ করেছেন তা আর জানা যায় নি। এখন আর কারও জানার দরকারও পড়ে না।
সুজিত মারাঙ আরেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা। হালুয়াঘাট এলাকারই। জীবনধারণের জন্য এদেশ, যে দেশ তিনি যুদ্ধ করে সৃষ্টি করেছিলেন, ত্যাগ করতে হয়েছে। মেঘালয়ের পাহাড় বা জঙ্গলে বসে হয়ত স্মৃতি হাতড়ান, সান্ত্বনা খোঁজেন। হিসাব মেলাতে পারেন না। তবে দেশত্যাগের আগে তার মা’র নিকট পবিত্র আমানত অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সনদটি গচ্ছিত রেখে গেছেন। কেবল সুজিত মারাংই নয়, অনেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাই দেশান্তরিত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা প্রণব রিছিল বর্তমানে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিবিদরা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনীতি রাজনীতি করেন। বাস্তবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছুই করে নাই। বর্তমান পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধারা বড় অসহায় অবস্থায় আছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতেও লজ্জা লাগে।’
পঁচাত্তরে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গারো পাহাড় এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর যে বিদ্রোহ ও সশস্ত্র অভিযান চলেছে তাতে মূলশক্তিই ছিল গারো আদিবাসী। এর কারণ মূলত তাদের হতাশা, বঞ্চনা ও আশাভঙ্গের বেদনা। আলবার্ট মানখিন নামে একজন গারো লেখক এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সীমান্ত এলাকায় যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল তা ‘কাদেরিয়া’ না বলে ‘গারো বিদ্রোহ’ বলা যায়। এই কাদেরিয়া সংগ্রামে শত শত আদিবাসী যুবক অংশগ্রহণ করেছিল জীবনে না-পাওয়ার হতাশাবোধ থেকেই। এদের অনেকেই ১৯৭১ সালে ছিল নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ-পরবর্তীতে তারা কিছুই পায় নি- এতটুকু স্বীকৃতি পর্যন্ত মেলে নি। তাই তাদের অন্তরে ছিল প্রচন্ড আক্রোশ। প্রকৃত অর্থে ওই সময় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ছিল না। রাষ্ট্রীয়ভাবে অস্বীকৃতি ও বঞ্চনাই ছিল মূল ফ্যাক্টর। যে কোনও সচেতন ব্যক্তিই বলবেন যে যুগে যুগে বঞ্চনা অস্বীকৃতি ও শোষণের ফল হিসেবে দেখা দিয়েছে নানা বিদ্রোহ-যুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ- তারপর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সাম্প্রতিককালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িয়াদের সংগ্রাম ও শান্তিচুক্তি- এ সমস্তই বঞ্চনা, শোষণ ও অস্বীকৃতির ইতিহাস, নবপ্রেক্ষাপটের সূচনা।’
মোদ্দাকথা, অসততার পরাকাষ্ঠায় নিজেকে খুইয়েছেন একাত্তরের অনেক মুক্তিযোদ্ধাই। পাকিস্তানি দালাল ও রাজাকারদের দলেও গিয়ে ভিড়েছেন অনেকে। পাকিস্তান-প্রীতির মনোভাবও পোষণ করেন এখন অনেকে। খেতাব ও তকমাধারী মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন এর মধ্যে। অথচ আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের একজনও এমন আত্মবিক্রয়ের বাজারের পণ্যে পরিণত হন নি। নিজেদের অসামান্য অবদানের বিনিময়ে তারা তিল পরিমাণ সুবিধা আদায়ের দৌড়ঝাঁপে মত্ত হন নি। তাদের বোধে এবং সংস্কৃতিতে এই উপাদানগুলোই অনুপস্থিত।
তথ্যসূত্র:
১. মুক্তিযুদ্ধে আমরা, প্রতিবেশী প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯৫
২. বাংলাদেশে বিপন্ন আদিবাসী,সঞ্জীব দ্রং, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা, ২০০১
৩. মং রাজার মুক্তিযুদ্ধ, লে. ক. এসআইএম নূরুন্নবী খান বীরবিক্রম, কলম্বিয়া প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১
৪. Tribal Freedom Fighters Of India ARN Srivastava, Publication Division, MIB, Govt of India, 1999
৫. Santal Rebellion, Tarapada Ray, Subrra yeliha, 1988
৬. মৈরা, এ কে শেরাম সম্পাদিত, ১৯৯৬
৭. স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী উদযাপন স্মরণিকা, ১৯৯৬
৮. আদিম, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, ১৯৯৮
৯. প্রতিবেশী, ২৯ মার্চ ১৯৯৭
১০. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: তৃতীয় ও একাদশ খন্ড
১১. বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপন স্মরণিকা, ১৯৯৯