মুক্তিযুদ্ধ

মিরপুর ১২ ডি ব্লকের মুসলিম বাজার বধ্যভূমি

মিরপুর ১২ নম্বরের ডি ব্লকের যাওয়ার পথেই পড়ে মুসলিম বাজার। পাশেই একটা মসজিদ। ১৯৯৯ সালে মসজিদটা নতুন করে নির্মাণ করতে গিয়ে হঠাৎ করেই এক্সিডেন্টলি শ্রমিকরা আবিষ্কার করে মাটির সামান্য নিচে কংক্রিটের স্লাব দিয়ে মুড়ে দেওয়া একটা কুয়ো। যার মুখটা ভাঙ্গতেই পাওয়া যায় তিনটা খুলি ও বেশ কিছু কাপড়চোপড়। ভয় পেয়ে শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে দেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে সে রাতেই মসজিদ কমিটির সভাপতির হস্তক্ষেপে মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে ট্রাকে করে মাটি ফেলে জায়গাটা সমান করে দেওয়া হয়। কিন্তু সত্য আর কতদিন চাপা থাকে!

জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হান নিজে এসে শনাক্ত করেন তার বাবার পোশাক, হাড়, খুলি, স্লাবটা খোঁড়ার পরেই বেরিয়ে এসেছিল যেগুলো। লেখেন এক অসাধারণ লেখা, “পিতার অস্থির সন্ধানে”। ভোরের কাগজের তৎকালীন রিপোটার জুলফিকার আলী মানিক ভাই খুজে বের করেন ‘৭২ রের ৩০শে জানুয়ারি বিহারী ও পাকিস্তানিদের চালানো সেই ম্যাসাকারে জীবিত একমাত্র সেনা সদস্য আমির হোসেনকে, যিনি সাক্ষ্য দেন, কালো প্যান্ট, সাদা জামা ও হলুদ সোয়েটার পরা যে সাংবাদিক ছিলেন তাদের সাথে, চোখের সামনে তাকে প্রথমে ব্রাশফায়ার ও পরে কোপাতে কোপাতে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যায় বিহারীরা। উন্মোচন হয় ২৭ বছরের পুরোনো রহস্যের।

 

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার জহির রায়হান

প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে আগ্রহ হচ্ছে, মুসলিম বাজার বধ্যভূমির পরে কি হলো? চলুন জেনে আসা যাক। সেই যে রাতারাতি মাটি ফেলে পাকিস্তানী-বিহারী ভাইদের পৈশাচিক গণহত্যার প্রমাণ মুছে ফেলতে চেয়েছিল যে মসজিদ কমিটি, তারা কিন্তু থেমে থাকেনি। ২০০১ সালে জামায়াত ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই পুর্নোদ্যমে তড়িঘড়ি করে বধ্যভূমির পুরো জায়গাটি সমেত মুসলিম বাজারের একটা বিশাল অংশ জুড়ে মসজিদ-মাদ্রাসা বানিয়ে ফেলে তারা। উদ্দেশ্য ধর্মভীরু বাঙ্গালীর ধর্মানূভূতি কাজে লাগিয়ে পূর্বপুরুষের বর্বরতার চিহ্ন মুছে ফেলা।

শহীদদের স্মরণে কোন স্মৃতিস্তম্ভ তো দূরে থাক, তারা যত্নের সাথে পরিষ্কার করে ফেলে সুক্ষাতিসুক্ষ প্রমাণগুলোও। শেষ পর্যন্ত আর কোন উপায়ন্তর না দেখে মসজিদের ভেতরের তিনটা পিলারের রং কালো করে দেওয়া হয় রাজমিস্ত্রিকে ধরে। মজার ব্যাপার হচ্ছে বধ্যভূমির সব নাম-নিশানা মুছে ফেললেও কেউ যেন কিছু না বলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে মসজিদের নাম দেওয়া হয়, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জামে মসজিদ। জামায়াতী বুদ্ধির তারিফ না করে উপায় নাই। আজকে সবাই শুধু জানে এইখানে একটা মসজিদ আছে, কিন্তু এই মসজিদটা যে ২০-২৫ হাজার নিরপরাধ মানুষের বধ্যভূমি, সেটা কেউ জানে না। জানার কোন উপায় নাই। কেউ রাখে নাই।

আর শহীদদের দেহাবশেষে ভরে থাকা মসজিদের পেছনের সেই কূপ আর ডোবার উপর এখন কি আছে জানেন? মসজিদের টয়লেট। হ্যাঁ ঠিক শুনেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ঔপন্যাসিকের দেহাবশেষ যেখানে পড়ে ছিল, সেই জায়গাটার উপর প্রতিদিন মলমূত্র ত্যাগ করে যায় হাজারো আদম সন্তান।

চমৎকার না?

 

রাদ দার পোস্ট থেকে

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension