মুক্তিযুদ্ধ

পথের কাঁটা সরিয়ে দিলেন ভুট্টো

সোহরাব হাসান

 

একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানি অধিনায়ক জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি লিখেছেন, ‘ষড়যন্ত্রে ভুট্টোকে কেউ হারাতে পারেননি।’ ইয়াহিয়া, গুল হাসান প্রমুখের সঙ্গে আঁতাত করে ভুট্টো উনসত্তরে আইউবকে তাড়িয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে একাত্তরে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেছেন। আবার পাকিস্তান ভাঙার জন্য পশ্চিমাংশের সব মানুষ যখন ইয়াহিয়া ও ভুট্টোকে দায়ী করছে, তখনো ভুট্টো সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রেখে নিজের কর্তৃত্ব রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন।

সামি খানের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ভুট্টো গুল হাসানকে পরবর্তী সেনাপ্রধান করার আশ্বাস দেন। বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল রহিমও ছিলেন তাঁর অনুগত। তাঁকে স্বপদে বহাল রাখার কথা বলেন ভুট্টো। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে ইয়াহিয়া খান যখন ওই তিনজনকে চীনে পাঠিয়েছিলেন ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে তাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য। গুল হাসানের পরামর্শেই ভুট্টোকে প্রতিনিধিদলের নেতা করা হয়। চীনা নেতারা পাকিস্তানের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তখনই ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ানোর পরামর্শ দেন। তাঁরা এ-ও বলেন যে যদি যুদ্ধে যেতেই হয়, পাকিস্তান যেন পরবর্তী গ্রীষ্ম মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কেননা, শীতের মৌসুমে হিমালয়ের পাদদেশ বরফাচ্ছাদিত থাকার কারণে চীনের পক্ষে সিকিম সীমান্তে সেনা মোতায়েন করা সম্ভব হবে না।

সেখানেই ‘ত্রয়ী’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেছেন। ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার চিফ অব স্টাফ গুল হাসান বুঝে গেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান’ আর রক্ষা করা যাবে না। যুদ্ধে পরাজয় ছাড়া ইয়াহিয়াকে সরানো কঠিন। তাই তাঁরা সহজ পথ নিলেন চীন সামরিক সমর্থন না দিলেও ডিসেম্বরেই যুদ্ধের সমাপ্তি টানা। এই পরিকল্পনায় পীরজাদা, গুল হাসানসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভুট্টোর পক্ষে কাজ করেছেন।

নিউইয়র্ক থেকে ফিরে ‘বেসামরিক’ ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল আবদুল হামিদ। তিনি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে অফিসারদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালে ব্রিগেডিয়ার ফজলে রাজিক খানের নেতৃত্বে একদল অফিসার তাঁর প্রতি মারমুখী হয়ে ওঠেন। ব্রিগেডিয়ার রাজিক ছিলেন গুল হাসানের খুবই ঘনিষ্ঠ। বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল রহিম ব্যক্তিগতভাবে জঙ্গিবিমান নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য প্রেসিডেন্ট ভবনের ওপর চক্কর দিতে থাকেন।

ভুট্টো জেনারেল হামিদকে সরিয়ে নতুন সেনাপ্রধান করেন ষাটের দশক থেকে তাঁর নীলনকশার সহযোগী গুল হাসানকে। এটি ছিল দালালির পুরস্কার। তবে দুজনের এই সখ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ভুট্টো নাকি একবার ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছেন, একবার যে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সে সব সময়ই বিশ্বাসঘাতক।

২০ ডিসেম্বর রাতে গুল হাসানের বাসভবনে আয়োজিত এক বৈঠকে গুল হাসান, মেজর জেনারেল শওকত রেজা, এয়ার মার্শাল রহিম, শাকিল উল্লাহসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের এক বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত অধিকাংশ কর্মকর্তা বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান আসগর খানকে প্রেসিডেন্ট করার প্রস্তাব দেন। কেউ কেউ প্রধান বিচারপতির কথাও বলেন। কিন্তু গুল হাসান ও রহিম খান সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, ভুট্টোকেই ক্ষমতায় বসানো হবে। আসগর খান বরাবরই সেনাশাসনের বিপক্ষে ছিলেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের প্রতিবাদ জানিয়ে ইয়াহিয়াকে চিঠি লিখেছিলেন।

আইউব খান তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ক্ষমতায় এসে ভুট্টো ইয়াহিয়ার যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করলেন। জেনারেল হাবিবুল্লাহ, জেনারেল শের আলী, ভাইস অ্যাডমিরাল ইউ সাইদ, দুররানি ও আলভী ভ্রাতৃদ্বয়সহ অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেন।

আইউব খান লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া খান আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং অবাধ্য আচরণ করলেও যে পরিস্থিতিতে তাঁকে বিদায় নিতে হলো, তার জন্য দুঃখ হয়।’

এম আসগর খান তাঁর উই হ্যাভ লার্নট নাথিং ফ্রম হিস্ট্রি, পাকিস্তান: পলিটিকস অ্যান্ড মিলিটারি পাওয়ার বইতে লিখেছেন, ভুট্টো ক্ষমতা গ্রহণ করেই সব ক্ষেত্রে দ্রুত নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হলেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার ঘোষণা দিলেন। আসগর খানের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১ হাজার ৪০০। ভুট্টোর পার্টি পিপিপির সঙ্গে যাঁদের দূরত্ব ছিল কিংবা যাঁরা বিরোধিতা করেছেন, তাঁরাই টার্গেট হয়েছেন।

আড়াই মাস না যেতেই ভুট্টো পথের কাঁটা সরিয়ে দিলেন। সেটিও অত্যন্ত নাটকীয় ও অপমানজনকভাবে। ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান গুল হাসান ও বিমানবাহিনীর প্রধান রহিম খানকে প্রেসিডেন্ট ভবনে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করালেন। সেই ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ভুট্টোর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ও পাঞ্জাবের গভর্নর গোলাম মোস্তফা খার ও ভুট্টোর চাচাতো ভাই মমতাজ ভুট্টো। তাঁরা যখন খাচ্ছিলেন, তখনই বেতারে তাঁদের বরখাস্ত করার খবর প্রচারিত হলো। এরপর নিরাপত্তারক্ষীসহ সেখান থেকে তাঁদের পাঠানো হলো রাওয়ালপিন্ডির একটি বাড়িতে, যেখানে তাঁরা দীর্ঘদিন অন্তরীণ ছিলেন। পরবর্তীকালে পর্দার আড়ালে আলোচনা হয় এবং সেনাবাহিনী থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্ন এই দুই কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রদূত করে বিদেশে পাঠানো হয়।

অথচ এ দুই সেনা কর্মকর্তাই ইয়াহিয়ার পদত্যাগ ও ভুট্টোর ক্ষমতারোহণে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। নতুন সেনাপ্রধান হন বাংলাদেশ ও বেলুচিস্তানের কসাই নামে পরিচিত টিক্কা খান। বিমানবাহিনীর প্রধান পদে বসানো হয় এয়ার মার্শাল জাফরকে।

সামি খান প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৭২ সালের ১ এপ্রিল পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগ দেন। তিনি ১৯৭৪ সালে পর্তুগালে পাকিস্তানের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স থাকাকালে ভুট্টোর এককালীন সহযোগী ও স্পেনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত এয়ার মার্শাল রহিম খানের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের জবানিতে শোনা যাবে ষড়যন্ত্রের আরেক কাহিনি।

 

লেখক: কবি, সাংবাদিক।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension