প্রধান খবরবাংলাদেশ

মুক্তিকামীদের ওপর গুলিবর্ষণে ছিলেন জিয়াও: প্রধানমন্ত্রী

রূপসী বাংলা ডেস্ক:১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের আগে চট্টগ্রামে ব্যারিকেড দেয়া বাঙালিদের ওপর যে আক্রমণ হয়েছিল, সেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও ছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুক্রবার বিকালে রাজধানীতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ওপর এক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা এ কথা জানান।

প্রায় ৫০ মিনিটের ভাষণে শেখ হাসিনা মূলত ৭ মার্চের ভাষণের নানা দিক এবং মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করেন। সচরাচর বিভিন্ন আলোচনায় তিনি যেভাবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিক নিয়ে কথা বলেন, আজকে সেটা হয়নি।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা তুলে ধরে তার কন্যা বলেন, ‘ম্যাসেজটা সমগ্র বাংলাদেশে পৌঁছার সাথে সাথে তিনি যে সংগ্রাম পরিষদ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা ব্যারিকেড দিচ্ছিল।’

২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকারী এবং পরে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিহত করতে দেয়া ব্যারিকেড ভাঙতে গুলি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘চিটাগাংয়ে যে ব্যারিকেড দেয়া হয়, সে ব্যারিকেড ভাঙার জন্য যে গুলি চালানো হয়েছিল আর্মির থেকে। ওই ২৫ তারিখ রাত পর্যন্ত, সেখানে কিন্তু জিয়াউর রহমানও একজন ছিল যে এদেরকে গুলি করে।’

‘এখনও চিটাগাং এর বহু নেতারা আছে, তারা ওই ঘটনা জানেন। আন্দোলনরতদের ওপর গুলি চালিয়ে তখন অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুঃখের বিষয়, তখন যদি সাথে সাথে পদক্ষেপ নিত, তাহলে বহু আর্মির সৈনিকদের বাঁচানো যেত। সেখানে মেজর রফিক থেকে শুরু করে অনেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল। বিভিন্ন জায়গায় যে বাঙালি অফিসাররা, তারা কিন্তু তাদের গ্রুপ ছেড়ে বেরিয়ে চলে যান।’

স্বাধীনতার ঘোষণা যেভাবে আসে

শেখ হাসিনা জানান, ২৫ মার্চ দুপুরে একজন অটোরিকশা চালক একটি চিরকুট নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। তিনি সেনানিবাস থেকে আসার সময় একজন বাবুর্চি তার হাতে দিয়েছিলেন। সেখানে বলা ছিল, রাত একটায় আক্রমণ হবে।

এর আগেই বঙ্গবন্ধু দলের নেতাদেরকে নির্দেশনা দিয়ে রাত আটকার মধ্যে কোথায় কোথায় যেতে হবে, সেটা বলে দিয়ে যান। কলকাতায় একটি বাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল তখন। সেই বাড়ির ঠিকানা কারও কাগজে না লিখে দিয়ে সবাইকে মুখস্ত করানো হয়।

রাত ১১টায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করার আগেই সাড়ে ১০টা থেকে পৌনে ১১টার মধ্যে বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে সে সময়ের ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (বর্তমানে বিজিবি) এর চারজন অফিসারকে টেলিফোনে বার্তা দিয়ে দেন। ওই অফিসাররা ইপিআরের ওয়্যারলেসে কাজ করতেন। তাদেরকে বলা হয়, পাকিস্তানিরা আক্রমণ করার আগে বার্তাটা প্রচার না করতে।

‘ওই চার জন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওখানে অপেক্ষা করছিল। যখন পাকিস্তানি হানাদাররা আক্রমণ শুরু করল, তারা সেটা ওয়্যারলেসে ছেড়ে দিল। মগবাজারে যে ওয়্যারলেস তা চলে গেল। সাথে সাথে টেলিগ্রাম এবং টেলিপ্রিন্টের সঙ্গে সারা বাংলাদেশে এই বার্তাটা চলে গেল।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, ইপিআরের ওই চার অফিসারকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নির্যাতন করে হত্যা করে। তাদের একজন ছিলেন শওকত আলী সাহেব। তার মেয়ে এখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।

এর মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িও আক্রমণ করে পকিস্তানি সেনারা। বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘তাদের ওপর নির্দেশ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা।’

‘তারা প্রচণ্ড গুলি করছিল। আব্বা কিন্তু বের হয়ে স্টপ ফায়ারিং বলে চিৎকার দেয়। তখন গুলি বন্ধ হয়ে যায়। তখন কয়েকজন এগিয়ে আসে তাকে মারতে। কিন্তু তাদের যে কমান্ডিং অফিসার ছিল সে যে কোনো কারণেই হোক, থামিয়ে দেয়। তারপর গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। প্রথমে আদমজী স্কুলে নিয়ে বন্দী করে রাখে, তারপর পাকিস্তানে নিয়ে যায়’।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানে গিয়ে ২৬ তারিখে ইয়াহিয়া খান যে ভাষণটা দেন, তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তার সাজা হবে, এই ঘোষণাই কিন্তু ইয়াহিয়া খান দিয়েছিল।’

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনেক অফিসার শুনেছেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের অনেক বই বেরিয়েছে… তারা কিন্তু ঘোষণাটা যে শুনেছে, সেটা তাদের বইয়ে উল্লেখ আছে।’

৬২ সালে আগরতলা গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

ত্রিপুরার আগরতলায় গিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে মামলা করেছিল, সেই অভিযোগ অসত্য ছিল না বলেও জানান শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘৬২ সালে তিনি আগরতলা গিয়েছিলেন, এটা কিন্তু বাস্তবতা। তিনি গিয়েছিলেন একটা প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। কিন্তু সে সময় নেহেরু ক্ষমতায় ছিলেন। তার কাছে সাড়া না পেয়ে ফেরত চলে আসেন।’

‘যেদিন ফেরত আসেন সেদিনই গ্রেপ্তার হন। তার আগে চার-পাঁচ দিন তিনি অনুপস্থিত, পাকিস্তানি গোয়েন্দারা পাগল হয়ে গেছে। তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। আমাদেরকে বারবার জিজ্ঞাসা করা, তারা খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছে। শুধু আমরা, মা এবং আমরা কয় ভাইবোনই জানতাম আর যারা তার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে ওই কয় জন ছাড়া।’

‘ওই সূত্র ধরেই এই মামলাটা তারা দিয়েছিল। কিন্তু তারা কিছু করতে পারেনি, বাংলাদেশের জনগণ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসে।’

বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা নিয়েই বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন করেছিলেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার নকশা এবং জাতীয় সঙ্গীতও আগেই ঠিক করা ছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) সব পরিকল্পনা করে রেখেছিলে, কোথায় প্রশিক্ষণ হবে, কোত্থেকে অস্ত্র আসবে, তার সবই ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি কথাটা বলতেন না।’

‘যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বের হয়ে আসলেন, তিনি বললেন, আমার ছয় দফা মানে একটা আঙ্গুল দেখাতেন। এর বেশি আর কিছু বলতেন না। এটাই ছিল আমাদের জন্য ইশারা। কিন্তু এই কথাটা সেদিন আমাদের বলায় নিষেধাজ্ঞা ছিল।’

৭ মার্চ স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণা ছিল

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন বলেও জানান শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন,‘পাকিস্তানিরা রেডি, তারা হেলিকপ্টারে বোমা নিয়ে রেডি। যে মুহূর্তে ঘোষণা দেবে, তখন তারা ব্রাশ ফায়ার করবে, বোমা মেরে যত পারে, মানুষ হত্যা করবে।’

‘সেটা তিনি জানতেন বলে তিনি ওইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন নাই, আবার বাদও রাখেন নাই। ঠিকই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা না, গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে, প্রতিটি অক্ষর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্যে মধ্য দিয়েই সেই বার্তাটা তিনি পৌঁছে দিয়ে গেছেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) বলেছেন ভাই ভাই হিসেবে থাকার একটা সম্ভাবনা থাকবে। …অর্থাৎ বলেননি আমরা এক হয়ে থাকব। বলেছেন, হয় মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে আর নইলে যদি সমাধান করতে পারি, ভাই ভাই হয়ে থাকার একাট সম্ভাবনা থাকবে। এই কথাটার ভেতরেই কিন্তু চমৎকার একটা নির্দেশনা রয়ে গেছে।’

‘যারা মুক্তিকামী তারা কিন্তু বার্তাটা পেয়ে গেছেন। কিন্তু পাকিস্তানিরা কিন্তু তারা বুঝে উঠতে পারেনি।’

‘অমূল্য সম্পদ আমরা পেয়েছি’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘একজন নেতা তার জীবনের সব কিছু দিয়ে মানুষকে ভালোবেসে, সংগ্রাম করে, জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেও দেশকে স্বাধীন করার জন্য যা যা করণীয়, যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। আমার মনে হয় এর আর কোনো তুলনা কারও সাথে হয় না।’

‘অমূল্য সম্পদ আমরা পেয়েছি। ৭৫ এর পর তো ২১ বছর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। আজকে দেশের মানুষ জানতে পারছে। একটা জেনারেশন কিছুই শুনতে পারেনি, জানতে পারেনি। তারা মনগড়া ইতিহাস শুনেছে।’

‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নয়টা মাস বজ্রকণ্ঠ হিসেবে এই ভাষণ প্রতিদিন বাজানো হতো। মাঠেঘাটে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন উজ্জীবিত হতো, আমরা যারা বন্দীখানায়, আমাদের জন্যও সেটা ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন।’

‘আজকে বাঙালি জাতি গর্বিত, তারা হারানো মানিক আবার ফিরে পেয়েছে। ৭৫ এ হারিয়েছে তারা এই ভাষণ। এই ভাষণ মুছে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। আজকে সেই ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐহিত্যের দলিলে স্থান করে নিয়েছে। কাজেই এটা সারা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় এবং মুক্তিকামী সকল মানুষের জন্য প্রেরণাদায়ক।’ঢাকাটাইমস

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension