আন্তর্জাতিক

যোদ্ধাদের জন্য খাবার না পেয়ে নারীকে ‘হত্যা করে’ তালেবান

তালেবানের যোদ্ধারা যখন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল তখন আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট গ্রামে তিন ছেলে এবং এক কন্যাকে নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন নাজিয়া (ছদ্মনাম)।

নাজিয়ার ২৫ বছর বয়সি কন্যা মানিজা (ছদ্মনাম) বুঝতে পেরেছিলেন এরা কারা। তার মা তাকে বলেছেন, এর আগেও তিনদিন তারা দরজার ধাক্কা দিয়েছিল। তাদের দাবি, ১৫ যোদ্ধার জন্য যেন খাবার রান্না করে দেওয়া হয়।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়, মানিজা বলেন, ‘মা বলেছেন, আমি গরিব, আমি এত জনের জন্য কীভাবে রান্নার আয়োজন করবো? এরপরই তারা মাকে মারধর শুরু করে। আমার মা মাটিতে পড়ে যান। তারা মাকে একে৪৭ বন্দুক দিয়ে আঘাত করে।’

মানিজা জানান, তালেবান যোদ্ধাদের থামাতে চিৎকার করতে থাকেন তিনি। চিৎকার শোনার পর তারা একটু থামে। এর পর তারা পাশের রুমে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়লে পালিয়ে যায়। পরে নির্বিচারে মারধরের শিকার মায়ের মৃত্যু হয়।

১২ জুলাই আফগানিস্তানের ‍উত্তরাঞ্চলের ফারিয়াব প্রদেশে নাজিয়ার ঘরে তালেবান যোদ্ধারা এ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এটি ছিল একটি নমুনামাত্র।

তালেবান কাবুল দখলের পর আফগানিস্তান জুড়ে নারীরা আতঙ্কে দিন পার করছেন।

যদিও তালেবানের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে—নারীদের অধিকার কোনোভাবে হরণ করা হবে না। কিন্তু তালেবানের অতীত ইতিহাসের কারণে নারীরা আশ্বস্ত হতে পারছেন বলে মনে হয় না।

যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের সেনা প্রত্যাহারের সুযোগে মাত্র দশ দিনে তালেবান দেশের রাজধানীসহ দুই তৃতীয়াংশ প্রদেশের রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেয়।

সবখানেই ঘোর অবিশ্বাস
এর আগে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করে তালেবান। সে সময় তারা মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়া নিষিদ্ধ করে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর দেশটিতে নারীদের ওপর বিধিনিষেধ সহজ হয়। যুদ্ধের মধ্যেও নারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দাতাদের সহযোগিতায়।

২০০৯ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ আইনে ধর্ষণ, জোরপূর্বক বিয়েকে অপরাধ এবং নারীদের কাজ করতে নিষেধ করা ও মেয়েদের স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত রাখা অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

তবে বর্তমানে তালেবান একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ইসলামিক সরকার’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও এখন নতুন সরকার কেমন হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়।

সংসদ সদস্য ফারজানা কোচাই বলেন, সামনের দিনগুলো কেমন হবে আমি জানি না। ভবিষ্যত সরকার কেমন হবে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা এখনও মেলেনি।

নারী হিসেবে তার স্বাধীনতা নিয়েও ফারজানা শঙ্কিত।

এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘এই বিষয়টি নিয়েই আমি বেশি উদ্বিগ্ন।’

‘প্রত্যেক নারীই এ বিষয়টি নিয়ে ভয়ের মধ্যে আছে। আমরা শুধু নিশ্চিত হতে চাই— নারীরা কাজ করতে পারবে কি পারবে না’, যোগ করেন ফারজানা।

যদিও ইতোমধ্যে তালেবান জানিয়ে দিয়েছে নারী শিক্ষা বন্ধের কোনো ইচ্ছে তাদের নেই।

সোমবার সংগঠনটির মুখপাত্র সোহাইল শাহীন বলেন, তালেবানের শাসনে মেয়েরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।

সোহাইল বলেন, স্কুল খোলা থাকবে। শিক্ষক হিসেবে এবং ছাত্র হিসেবে মেয়েরা ও নারীরা স্কুলে যাবে।

কিন্তু তালেবানের এ আশ্বাসের পরও নারীরা গোষ্ঠীটিকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কেননা, তাদের অতীত ইতিহাসই নারীদের বর্তমান তালেবানের আশ্বাসকে বিশ্বাস করতে দিচ্ছে না।

জুলাইয়ে আফগানিস্তানের স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছিল, তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে পুরুষ অভিভাবক ছাড়া নারীদের অংশ নিতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় টেলিভিশন। ছাত্র এবং শিক্ষকদের দাঁড়ি রাখা ও পাগড়ি পরার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কমিশন আরও বলছে, বেশ কিছুদিন ধরে ধর্মীয় গুরু, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং নারীরা টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

এর আগে তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল তখন কোনো নারী তাদের আদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই মারধরের শিকার হতেন।

নাজিয়া হত্যা
খাবার রান্না করে না দেওয়ায় ৪৫ বছর বয়সি বিধবা নাজিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তালেবান যোদ্ধারা— এমন দাবি করেছে নাজিয়ার মেয়ে।

তবে ফারিয়াব প্রদেশের ওই নারীকে হত্যার বিষয়টি অস্বীকার করে তালেবান।

কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য তালেবানের কথার বিপরীত।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, ৪৫ বছর বয়সি নিহত নারীর ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল।

নাজিয়ার এক প্রতিবেশী নারী যিনি ওই পুরুষদের থামানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে আফগান সেনাদের বিধবা স্ত্রীদের বসবাস। তারা গবাদি পশুর দুধ বিক্রি করে আয় করেন। কিন্তু তালেবান কোনোভাবেই এটা করতে দিতে রাজি নয়। আমাদের ঘরে পুরুষ নেই। আমরা কি করবো? আমরা স্কুল, ক্লিনিক চাই এবং অন্যান্য মানুষের মতো আমরাও স্বাধীনতা চাই। ’

বেড়েছে বোরকার দাম
তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই দেশটিতে বেড়েছে বোরকার কদর। বাধ্য হয়ে নারীদের কিনতে হচ্ছে বোরকা। এর মধ্যেই দেশটিতে বেড়েছে বোরকার দাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, আমাদের এক বা দুটি বোরকা আছে। এটি আমার মা এবং বোনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে পরতে হয়। যদি আগের মতো বাজে পরিস্থিতি আবারও হয় এবং আমরা বোরকা কিনতে না পারি তবে বিছানার কাপড় বা সে জাতীয় কিছু আমাদের ওড়না বানিয়ে পরিধান করা ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।

নারী শিক্ষা নিয়ে শঙ্কা
শিক্ষা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন আফগান নারীরা।

শিক্ষা ও নারী অধিকার বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা লার্নের নির্বাহী পরিচালক পাশান্থা দুরানি বলেন, আমি প্রচুর কেঁদেছি। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে আফগানিস্তানের পতনের শোক পালন করছি। ফলে আমি খুব একটা ভালো বোধ করছি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি অত্যন্ত হতাশ।

পাশান্থা বলেন, তালেবান নারী শিক্ষার কথা বলছে। কিন্তু এই নারী শিক্ষা কেমন হবে তা তারা পরিষ্কার করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, ইসলামিক শিক্ষাই হয়তো হবে। কিন্তু ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে পড়ার বিষয়ে কি হবে, প্রফেশনাল শিক্ষার বিষয়ে কি হবে— যখন এসব বিষয় নিয়ে ভাবি তখন হতাশ হই। কারণ এসবের কোনো উত্তর নেই।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের সহযোগী পরিচালক প্যাট্রিসিয়া গসম্যান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দাতাদের আফগানিস্তানকে যেন অবজ্ঞা না করা হয় সে বিষয়ে আহ্বান জানান।

ফারিয়াবে নিহত নাজিয়ার বাড়িতে যেভাবে দরজায় ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল তেমনই অন্য বাড়িতেও ধাক্কা দেওয়া হতে পারে— আফগানিস্তানজুড়ে নারীরা এমন আশঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন।

মায়ের মৃত্যুর পর থেকে মানিজা আর ঘরে ফেরেনি। যেখানে রয়েছে সেখান থেকে খুব একটা বাইরে বের হয় না সে।

মানিজা বলেন, তালিবান ঘরের বাইরে পুরুষ অভিভাবক ছাড়া কাউকে বের হতে দেয় না।শুধুমাত্র পুরুষরা ঘরের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পায়। কাজেও যেতে পারে শুধু পুরুষরা। যদি আমার জরুরি কিছু প্রয়োজন হয় তবে আমি সেটা কীভাবে পাব? এটা সরাসরি শাস্তি। এটা ইসলাম নয়। তারা নিজেদের মুসলিম দাবি করে। নারীদের শাস্তি দেওয়ার অধিকার তাদের নেই।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাদেশিক রাজধানী দখলের পর ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ঘিরে ফেলে তালেবান। এরপর রোববার গোষ্ঠীটি কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।এ সময় দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। এখন দেশের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ২০ বছর আগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষমতা হারানো তালেবান।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension