বাংলাদেশযুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের অস্বাভাবিক আচরণ বোধগম্য নয়: শেখ হাসিনা

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে আচরণ করছে, তা বোধগম্য নয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী করার নামে সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দিলে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে হবে। অথচ পাকিস্তানে অঘোষিত সামরিক শাসন চললেও সে বিষয়ে একদম চুপ যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র, সেটিও যে খুব কাজে দিয়েছে তা বলা যায় না। ব্রহ্মা চেলানি এক নিবন্ধে এসব কথা বলেছেন। তিনি ভারতের নিউ দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এমিরেটাস অধ্যাপক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক উপদেষ্টা। গত ১২ জুন টোকিওভিত্তিক বাণিজ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম নিক্কি এশিয়ায় নিবন্ধটি প্রকাশ হয়।

নিবন্ধে ব্রহ্মা চেলানি বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ধর্মনিরপেক্ষ একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দ্রুতগতির অর্থনৈতিক উন্নতির পথে নিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির ফলে দেশটির অর্থ ব্যবস্থা বিরূপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু টানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশ পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছে। পাকিস্তান তো প্রায় দেওলিয়া হওয়ার পথে। অথচ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আহ্বানে আয়োজিত ২০২১ এবং এ বছরের শুরুতে ডেমোক্রেসি সম্মেলনের বাইরে রাখা হয়েছে বাংলাদেশকে। পাকিস্তানকে দুইবারই আমন্ত্রণ জানানো হলো, যদিও তারা তাতে যায়নি।’

ব্রহ্মা চেলানি বলেন, এই পরিস্থিতিকে ঠিক কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন একদিকে গণতন্ত্র সুসংহতকরণ উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশের যেসব কর্মকর্তা সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করবে তাদের ওপর মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা বলছে। অপরদিকে পাকিস্তানে অঘোষিত সামরিক আইন জারি হলেও সে বিষয়ে একদম চুপ থাকে মার্কিন প্রশাসন। অথচ পাকিস্তানে প্রতিনিয়ত গণগ্রেপ্তার, গুম ও নির্যাতন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অধিকার সুসংহতকরণের দীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে এটি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। ভূরাজনৈতিক অবস্থা-পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। গণতন্ত্র সুসংহত করার কথা বলে এমন বহু জায়গায় মার্কিন নীতি নির্ধারকরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

অধ্যাপক ব্রহ্মা চেলানি বলেন, বাইডেন প্রশাসন এই ভিসানীতির মধ্য দিয়ে মনে হয় দুটি জায়গা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে চেয়েছে। একটি হলো দেশটির রাজনীতিবিদদের আত্মীয়স্বজন অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলেই আমেরিকান গ্রিন কার্ডধারী। আর তাছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানির বিরাট অংশ পশ্চিমা দেশগুলোতে যায়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের শীর্ষস্থানীয় একটি গন্তব্য।

‘ওয়াটার: এশিয়াস নিউ ব্যাটেলগ্রাউন্ড’ গ্রন্থের লেখক ব্রহ্ম চেলানি বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতার মেয়ে হাসিনা অবশ্য গত এপ্রিলে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘তারা গণতন্ত্র উৎখাত করতে চায় এবং এমন একটি সরকার বসাতে চায়, যাদের মাঝে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব থাকবে না। এটি অগণতান্ত্রিক একটি কাজ হবে।

চেলানির মতে, মিয়ানমার, ইরান, বেলারুশ ও কিউবায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হয়েছে। বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব যেমন দিন দিন কমছে, তেমনই সব নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও কমে যাচ্ছে। অবশ্য এখনও পশ্চিমা দেশগুলোই বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করছে, পাশাপাশি ডলার এখনও বিশ্বের রিজার্ভের প্রাথমিক মুদ্রা হিসেবেই আছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কাছে আকর্ষণীয় হাতিয়ার।

চেলানি বলছেন, বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ির তেমন কোনো ফল মিলছে না। এশিয়ার নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ তাতে শেখ হাসিনার সরকার বরং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হিসেবে কাজ করতে পারে। অথচ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করতে গত মাসে শেখ হাসিনা যখন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলেন তখন বাইডেন সরকারের কেউ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।

সিঙ্গাপুরে এ মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন বললেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনের ভ্রু কুচকানি বা অঙ্গুলি হেলনের বিপরীতে কিছু করবে না। কিন্তু ঠিকই বাংলাদেশে এমনটি করা হচ্ছে, সে পথেই আগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension