ভারতযুক্তরাষ্ট্র

মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফর হবে ঐতিহাসিক

একসময় নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা আর নেই। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গত ৯ বছরে অন্তত পাঁচ বার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন তিনি। এসব সফর ছিল ‘ওয়ার্কিং ভিজিট’, ‘ফরমাল ওয়ার্কিং ভিজিট’। চলতি সপ্তাহে তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদির এবারের সফর একেবারেই বিশেষ এবং ঐতিহাসিক। কারণ তিনি এবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে (স্টেট ভিজিট) যাচ্ছেন। সফরকালে তিনি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যোগ দেবেন।

জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদি হলেন তৃতীয় কোনো নেতা যিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন। এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইওল বাইডেনের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন। বলা হয়, এই রাষ্ট্রীয় সফর হলো- যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশের নেতাকে দেওয়া সর্বোচ্চ কূটনৈতিক সংবর্ধনা। যে সংবর্ধনা এবার নরেন্দ্র মোদি পাবেন। নরেন্দ্র মোদি ২১ জুন থেকে ২৪ জুন এই সফর করবেন। ২২ জুন তিনি মার্কিন কংগ্রেসের একটি যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। মার্কিন কংগ্রেসে এর আগে ভারতের পাঁচ জন প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানরা বেশির ভাগ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও, কংগ্রেসের যৌথসভায় ভাষণ দেওয়ার জন্য মোদিকে দ্বিদলীয় আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে তারা একত্রিত হন। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, মোদি বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের নেতার চেয়ে মার্কিন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।

বলা হচ্ছে, এই সফর হবে দুই বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অংশীদারিত্বের নতুন যুগের সূচনা হবে। মোদির সফরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হবে, দুই নেতার মধ্যে বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হবে এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির গতিপথ আকৃতি পাবে। মোদির সফরে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১৮০ কোটি ডলারে ১৮টি প্রিডেটর-বি সশস্ত্র ড্রোন কেনার চুক্তি করতে পারে। এই ড্রোন সীমান্ত এবং সামুদ্রিক এলাকায় দীর্ঘ-পাল্লার নির্ভুল হামলা এবং নজরদারি চালাতে সক্ষম। ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি রয়েছে—যা তাদের যৌথভাবে ফাইটার জেট ইঞ্জিন তৈরি করতে সুযোগ করে দেবে।

মোদির সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে—যখন ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে একাধিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগেরও মুখোমুখি। দুই দেশ তাদের মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে কয়েক বছর ধরে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রচার এবং কোভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মতো বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে একে-অপরকে সহযোগিতা করেছে।

নয়াদিল্লিস্থ অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্টাডিজ অ্যান্ড ফরেন পলিসি-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পন্ত ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত ভূ-দৃশ্য খুব নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি উভয়েরই স্বীকৃতি রয়েছে যে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য তাদের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। এই স্পষ্ট কৌশলগত অবস্থানের অর্থ হলো যে, ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমমনা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এক ধরনের কৌশলগত বাধ্যবাধকতা হয়ে উঠেছে।

জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন শ্রীরাম চাউলিয়ার মতে, আমেরিকানরা চীনের পালটা হিসেবে ভারতকে শক্তিশালী করতে চাইছে, তাই তারা ভারতের সামরিক আধুনিকায়নকে সমর্থন করতে চায়। নরেন্দ্র মোদির সফরের ভিত্তি রচিত হয় সাম্প্রতিক উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তাদের ভারত সফরের মাধ্যমে। চলতি মাসের শুরুতে, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লয়েড অস্টিন বলেছিলেন যে, দুই দেশ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার জন্য একটি রোডম্যাপ নির্ধারণ করছে। যা মোদির সফরে অনেকাংশে পূর্ণতা পাবে।

এছাড়া এই সফরটি দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মানুষে-মানুষে সম্পর্কের দিকেও আলোকপাত করবে, বিশেষ করে তরুণ ও ভারতীয় প্রবাসীদের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০ লাখ ভারতীয় আমেরিকান রয়েছে, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাদের মধ্যে নরেন্দ্র মোদির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

টাইম ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদিকে এই সম্মান দেওয়ার পেছনে বাইডেনেরও একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। সেটি হলো-ভারতীয় প্রবাসীদের ভোট। ভারতীয় আমেরিকানরা সাধারণত ডেমোক্র্যাটদেরই ভোট দেয়। গত নির্বাচনে বাইডেনকে ভোট দিয়েছেন প্রায় ৭৪ শতাংশ ভারতীয় আমেরিকান। বাইডেন ইতিমধ্যে ২০২৪ সালের নির্বাচনের জন্য প্রচারণা শুরু করেছেন। মোদিকে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে এটিও একটি কারণ যে, তিনি ভারতীয় আমেরিকানদের সমর্থন ধরে রাখতে চান।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension