
মুক্তমত
নিরোদের বাঁশি বাজানোটাই নিয়ম
মুবিন খান
যখন বনানীর এফ আর টাওয়ারটাতে আগুন লাগল, আমি তখন নিজের ঘরে বসে। ‘৭১-এর রোজকার ঘটনার পাতা ওল্টাচ্ছি আর ভাবছি, সন্ধ্যায় ‘উঠান’ পত্রিকার বছর পূরণ অনুষ্ঠানে যাব কি যাব না। আমি তখনও বনানীর আগুন লাগার খবর জানি না। আমার ভাগ্নীর অফিসও বনানীতে বলে বড় আপা প্রচণ্ডরকম উৎকণ্ঠিত। ভাগ্নীকে ফোন করে জানা গেল এফ আর টাওয়ার নয়, তার দুয়েক ভবন পরেরটাতে ওর অফিস। এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার ফলে ওদের অফিস ছুটি দিয়ে দিয়েছে। এখন পথে। বাড়ি ফিরছে। আমরা চিন্তামুক্ত হলাম। ফেসবুকে একবার ঢুঁ মারতে গিয়ে দেখা গেল সেখানে এলাহি কারবার। ভবন আর আগুন বিশারদদের প্রচণ্ড উত্তাপ। যাওয়া যায় না। উদ্ধার কর্ম বিশারদরাও রয়েছেন।এফ আর টাওয়ারে তখন অনেক লোকজন আটকা পড়েছেন। চারদিকে তাদের বাঁচার আর্তনাদ। অনেকে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। শ্রীলংকান এক নাগরিককে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছে।
কদিন আগে এক প্রাচীন সুহৃদ বলছিলেন ‘উঠান’ একটা পত্রিকাটির কথা। বছর পূরণ অনুষ্ঠানের কথা। তবে সেখানে আনুষ্ঠানিকতা আসলে থাকবে না। আড্ডা থাকবে। আড্ডায় যোগ দিতে বলছিলেন। ‘উঠান’ পত্রিকাটি কিংবা ও পত্রিকার কাউকে আমি জানি-চিনি না। পত্রিকাটি কখনও পড়ি নি। দেখিও নি। আমার ওই সুহৃদটি প্রাচীন বলেই আমার আড্ডাবাজ অংশটাকে খুব করে জানতেন। আমি যেতে চাইলাম। যাওয়ার আগে বিকেলে ফোন করলেন যাচ্ছি কিনা জানতে। তাঁর আন্তরিকতায় আমাকে অসংখ্যবারের মতো আরও একবার মুগ্ধ হতে হলো।
আমরা যখন উঠান আড্ডায় যেতে রিকশা চড়েছি, এফ আর টাওয়ারের একের পর এক তলাগুলোতে তখন আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। আশেপাশের এলাকাগুলোতে তীব্র পানির সঙ্কট চলছিল। হেলিকপ্টার দিয়ে হাতিরঝিল থেকে পানি নেওয়া হচ্ছিল। হেলিকপ্টার দিয়ে নাকি একজনকে উদ্ধারও করা হয়েছে। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু টেলিভিশন খবরে সেটি দেখে নাকি আঁতকে উঠেছিলেন। তারপর তেলে বেগুনে জ্বলতে জ্বলতে লিখেছেন, “উচ্চ বাতাস আগুনকে ছড়িয়ে যেতে সাহায্য করে, এটা কে না জানে। মাত্র একজন মানুষ উদ্ধার করতে গিয়ে কতজনকে তাহলে ‘ইয়েটা’ দেয়া হয়েছে ! উদ্ধার কি শো অফের মতন কোন বিষয় ? নিউজ ভিডিওতে হেলিকপ্টারের রোটর ব্লেডের বাতাসের এফেক্টটা নজর করুন।’
উদ্ধার কর্ম শো অফের মতন কোনও বিষয় কিনা জানি না।তবে মানুষ এটা জানতে চায়। ওই একই চাওয়া নিয়ে আমার বন্ধুটিও টেলিভিশন খুলে সামনে বসেছিলেন বলেই ‘আঁতকে’ ওঠার সুযোগটি পেয়েছেন।
‘রোটর ব্লেড’ জিনিসটা যে কি সেটাও বুঝি নি। উঠানে যাওয়ার পথে রিকশায় সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম হেলিকপ্টারের ওপরে ঘুরতে থাকা ‘পাঙ্খা’-টাকেই রোটর ব্লেড বলে। তারপর রোটর ব্লেডের বাতাসের এফেক্টটা ভাবতে পেরেছিলাম। আমি আমার ওই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটিকে বলতে পারি নি, একজন মানুষের একটা প্রাণ। একটা জীবন। সেটা মাত্র নয়। একমাত্র। আর সকলের মতোই। হয়ত ওভাবে পালা করে এক এক করে বাঁচানোর চেষ্টা চলছিল। কিন্তু আমার সে ভাবনা হাজার হাজার মানুষের ভাবনার মতোই কোনও কাজে লাগে নি। বনানী গিয়ে অগ্নি নির্বাপকদের সহযোগিতা করলে কাজে লাগত।
সন্ধ্যা। আবীরের উদ্বিগ্ন পরিবার আবীরকে খুঁজে পাচ্ছে না। আবীর বনানীর আগুন লাগা এফ আর টাওয়ারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। আবীর আমাদের কেউ নয়। তাই আমরা খুব তড়িঘড়ি ঢাকার যানজট অতিক্রম করে যখন সবান্ধব বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের তিন তলায় উঠানের ভাড়া করা উঠানে পা দিয়েছি, হাতের ঘড়িটা সময় জানাচ্ছে সাতটা। পথে রিকশায় ছয়টার অনুষ্ঠানে সাড়ে ছয়টা বেজে গেল বলে একবার ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। যাই নি। সৌভাগ্য যে যাই নি। আয়োজকরা সমবেতদের জানাচ্ছিলেন, প্রতিষ্ঠানবিরোধী তাঁরা সন্ধ্যা ছয়টার অনুষ্ঠান সাতটাতেই শুরু করেছেন। একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ভেতরে গিয়ে বসে পড়া গেল।
আমাদের ধারণা ছিল সময়ানুবর্তী না হওয়া আমাদের পুরনো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। যেমন যে কোনও অনুষ্ঠানে মঞ্চের চেয়ারটিতে দেশ ও সমাজের একজন বিশিষ্ট নাগরিককে বসানোটাও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। ‘উঠান’ অবশ্য প্রধান অতিথি কিংবা সভাপতির নাম দেয় নি কবি আসাদ চৌধুরীর চেয়ারটিকে। বলেছে ‘আড্ডার কবি।’ ব্যানারে লিখেছেও সেকথা। লোকেরা ব্যানারে কবি আসাদ চৌধুরীর নাম দেখে আকর্ষিত হবেন।
কিন্তু উঠানের আড্ডার অনুষ্ঠানে আসেন নি কবি আসাদ চৌধুরী। ‘উঠান’ তাঁকে আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ করলেও, কবি আসাদ চৌধুরী আসবেন কথা দিলেও, কবি আসাদ চৌধুরী ওই ‘আড্ডার কবি’- এই বিজ্ঞাপনটি প্রচারিত হয়ে যাওয়ার পরেও এলেন না কবি আসাদ চৌধুরী। আগেই বলেছি, আমি উঠানের কেউ নই, উঠানের কেউও আমাকে চেনেন না, তবু আমার খুব মন খারাপ করা রাগ হলো। সঙ্গের সঙ্গীর কানে ফিসফিসিয়ে বলি, ‘আজ যদি এটা কালি ও কলমের কিংবা প্রথম আলোর অনুষ্ঠান হতো তাহলে কি আসাদ ভাই না এসে পারতেন?’
আমার মতো খুব মন খারাপ করা এমন রাগ কি উঠানের লোকেদেরও হয়েছিল? আমি জানি না। তবে আসতে না পারার যে ব্যাখ্যাটা কবি আসাদ চৌধুরী তাঁদেরকে দিয়েছিলেন, তাঁরা সেটি দায়িত্ববান লোকেদের মতোই সকলকে জানিয়ে দিয়েছেন।
আর এদিকে আমরা ভাবছিলাম আমাদের ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আড্ডা নয়। অনুষ্ঠানই। পুরদস্তুর আনুষ্ঠানিকতা। একজন সঞ্চালক অনুষ্ঠান পরিচালন করছেন। তিনি সাহিত্যে ‘উঠান’ পত্রিকাটির পরিচয় আর ভূমিকা সামান্য বর্ণনা করলেন। তারপর বিশেষ-জনদের চেয়ারের একজনকে বললেন বক্তৃতা দিতে। বক্তা খুব গুছিয়ে কথা বলেন। কবিতা পাঠ পরিশীলিত উচ্চারণ। মার্জিত, নরম আর আর মাপা কণ্ঠস্বর। আমরা তাঁকে না চিনলেও আর সকলে তাঁকে চেনেন। সকলের সঙ্গেই তাঁর সদ্ভাব। কৌতুকও করেন। করেন আর সকলেও। হয়ত সেকারণেই তিনি কয়েক মিনিট কথা বলবেন জানাতেই কেউ একজন সশব্দ কৌতুকে বলে উঠেছিলেন, ‘পারবেন তো?’ আর সকলে তখন হেসেছিল। হেসেছিলেন ভদ্রলোক নিজেও। তবে তিনি কয়েক মিনিটে শেষ করেন নি। পারেন নি আসলে। পারবেন কি করে! উঠান পত্রিকা-কবিতা-প্রবন্ধ-সমকালীন সাহিত্য-বিশ্ব সাহিত্য-সাহিত্যে রাজনীতির মতো কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে কত কি যে বললেন তিনি!
যখন উপলব্ধি করছি ওসব আমার আয়ত্বের বাইরে। যখন আবিষ্কার করছি, মূর্খ আমি এক জীবনে অতটা পড়ে উঠতেও পারব না। তখন এফ আর টাওয়ারের আগুনে ওই ভবনটিতেই পুড়ে মরে যাওয়া রুমকি আক্তারের শরীরটা পড়ে রয়েছে ঢাকা মেডিকেলের মেঝেতে। আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মরে যাওয়া রুমকি আক্তারের স্বামী মাকসুদুর রহমানের লাশ রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। রুমকি এফ আর টাওয়ারে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন। তাঁর স্বামীটিও ওখানেই কাজ করতেন। আর ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক সাংবাদিকদের বলছেন, ওভাবে একটা ভবনের সঙ্গে আরেকটা লাগিয়ে যেভাবে ভবন বানানো হয়েছে সেটা নিয়মের বাইরে। তিনি অনিয়ম সহ্য করবেন না। সংসদ সদস্য ঠিকই বলেছেন এমন অনিয়ম সহ্য করা একেবারেই উচিত নয়। ভবনগুলো নিশ্চয়ই রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি গড়ে তোলা হয়েছিল। কেউ দেখে নি। কেউ টেরও পায় নি। গড়ে তোলার পর লুকিয়ে চুরিয়ে রাজ্যর অফিস ভাড়া দিয়ে খুব গোপনে কর্মকান্ড চলছিল।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের তিনতলায় আমরা তখন তন্ময় ‘উঠানে।’ অনুষ্ঠান জমে উঠেছে। সকলে বক্তৃতায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিচ্ছে।
আলোচনায় সুকুমার বৃত্তির চর্চার কথা এসেছে।
সুকুমার বৃত্তির চর্চা চলছে চারপাশে।
আমরা কি তবে সুকুমার বৃত্তির চর্চাই করব?
লেখালেখি করতে গেলে একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার হয়।
সে প্ল্যাটফর্মটা হাতে পেতে লোকেরা সুকুমার বৃত্তির চর্চা করছে।
এটা দোষের কিছু নয়।
উঁহু, এটা দোষেরই। বিরাট দোষের।
এমনি করেই আলোচনা এগিয়ে যেতে লাগল। এক ভদ্রলোক এলেন। তিনি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বঞ্চিত মানুষদের নিয়ে গল্প লিখেছেন। সাইকেল চালিয়ে যে ছেলেটা ঘড়ি মেরামত করে সে তাঁর গল্পের চরিত্র। কিংবা রাস্তায় বসে পাখি দিয়ে যে লোক মানুষের ভাগ্য গোনে, সে লোক তাঁর গল্পের নায়ক। আমরা বুঝলাম ভদ্রলোক সমাজের অনেক অনেক উঁচু জায়গার মানুষ হয়েও একেবারে নিচুতে বসবাস করা মানুষদেরকে নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করেন। তাদেরকে নিয়ে লেখেন। তিনি নিজেও বললেন সে কথা। সাহিত্যের রথি মহারথীদেরও অনেক খবরাখবর রাখেন। তার থেকে কিছু আমাদের শোনালেনও। আমরা কৃতজ্ঞ হলাম।
খবরে তখন জানাচ্ছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এফ আর টাওয়ারের নকশা অনুমোদন এবং নির্মাণ সংক্রান্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি তদন্তে ৬ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ক্রিকেটার মাশরাফি এফ আর টাওয়ারের কাছে না যেতে লোকেদের অনুরোধ করছেন। এবং শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন মিডিয়া জগতের সেলিব্রিটিরা। তাঁরা ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে চলেছেন।
স্বৈরাচার এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকবার সময়টাতে দেশ ছিল প্রচণ্ড উত্তাল। সকল শ্রেণির মানুষেরা এরশাদের পতন চাইত। সে চাওয়াটা কেবল মনের গহীনে ‘আকাঙ্ক্ষা’ সেজে বসে থাকে নি। থাকে নি বলেই সকলে রাজাপথে নেমেছিলেন আন্দোলনে। তবুও; তখনও সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো থেমে থাকে নি। থামে নি সাহিত্যর চর্চাও। সে কারণেই জামাতের সঙ্গে এরশাদের গলাগলি নিয়ে ক্যারিকেচার আঁকা হয়েছে, কাব্য রচিত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে পোস্টার ছাপানো হয়েছে, দেয়ালে চিকা মারা হয়েছে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের তখনকার একতলা ভবনে সাহিত্য আড্ডাও হয়েছে।
এই যেমন তিরিশ বছর পরে বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনে মানুষ পুড়ছে, আর ওই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রেই এখনকার তিনতলায় মুন্সী প্রেমচন্দের মূল হিন্দী থেকে অনুবাদ নিয়ে কথাবার্তা চলেছে। আমরা থেমে যাই নি।
বনানীর বাতাসে মানুষ পোড়া গন্ধ ভাসছে বলে আমরা কেউ বলি নি, চলুন, সবাই মিলে বনানী যাই। স্বেচ্ছাসেবক হই। স্বেচ্ছাসেবকের কাজটা কঠিন। বললেই করা যায় না। কিন্তু যে কাজটা সহজ, সেই সহজ কাজটাও তো করি নি। আমরা কেউ বলি নি, আজকের অনুষ্ঠানটা মুলতুবি থাকুক। বনানী যে জ্বলে পুড়ে খাক হচ্ছে, এই কথাটিই কেউ উচ্চারণ করে নি। সকলে আপনাপন সুরে বাঁশি বাজিয়ে গেছেন। নিরোর মতোই।
মানবতার বিপর্যয়ে নিরোদের বাঁশি বাজানোটাই নিয়ম।



