
আহমদ ছফাকে নিয়ে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া গল্পের প্রতিক্রিয়া
আহমদ ছফার ওপর খেপে গিয়ে শোধ নেয়ার জন্য শেখ মুজিব আবুল ফজলকে শিক্ষা উপদেষ্টা বানালেন। আসলে কি বঙ্গবন্ধু আবুল ফজলকে শিক্ষা উপদেষ্টা করেছিলেন? আবুল ফজলকে শিক্ষা উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান নয়।
গ্রামীণ একটা প্রবাদ আছে, ‘আধা সের চালের পিঠা, যার কথা শুনি তার কথা মিঠা।’ বর্তমানে এমন একটি সময় যাচ্ছে, আহমদ ছফার ব্যাপারে যে যা বলে মিঠাই লাগে।
গত কদিন আগে আমি ফেসবুকে একটি কথা বলেছিলাম। লিখেছিলাম, ‘মানুষ মারা গেলে তার সম্পর্কে মিথ্যা বলা খুব সহজ, যেটি আহমদ ছফার বেলায় ঘটে চলেছে।’ কথাগুলো পড়ে অনেকে নানা মন্তব্য করেছিলেন। কেউ কেউ জানতে চেয়েছিলেন, কারা এসব ঙ্করছে? অনেকে গালমন্দও করেছেন। আমি কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। ফেসবুকে একটা কথা বললে হাজারটা কথার জবাব দিতে হয়। এটা অনেক সময় মন থেকে সায় দেয় না।
বেশ কয়েক বছর ধরে ফেসবুকে আহমদ ছফাকে নিয়ে কিছু গল্প ভাইরাল হতে দেখি। গল্পগুলোর সঙ্গে সত্যের কোনও রেশ নেই জেনেও কোনও রকম প্রতিবাদ করি নি। আমার ধারণা ছিল, এসব গল্প কিছুদিন ঘোরাফেরা করার পর আপনাআপনি চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু আমার ধারণা সত্য প্রমাণিত না হয়ে আরও বেশী ভাইরাল হতে থাকল।
আহমদ ছফা একটি কথা বলতেন, আমি মারা গেলে আমাকে নিয়ে নানা গল্প তৈরি হবে। আরও একটি কথা বলতেন, আমি মারা গেলে চর দখলের মতো অবস্থা তৈরি হবে, সেখানে আমার কাছের মানুষ ঘেঁষতে পারবে না। কথাগুলোর মধ্যে যে বাস্তবতা ছিল তার কিছুটা হলেও আমরা বর্তমানে অনুধাবন করতে পারছি।

যে কথাগুলো প্রতিনিয়ত ফেসবুকে ভেসে চলেছে সেইসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমার কাছে অনেকে জানতে চেয়েছেন। আমি কাউকে কাউকে ভাসা ভাসা জবাব দিয়েছি, অনেকের বেলায় বিরক্ত হয়ে চেপে গিয়েছি। সম্প্রতি দাদাগিরি নামে একটি ব্লগে ওই গল্পগুলোর রেশ ধরে আহমদ ছফাকে নানাধরনের ভয়ানকভাবে তিরস্কার করা হয়েছে। সেই লেখাটিও একজন আমার ইনবক্সে পাঠিয়েছেন। এ লেখাটি যারা লিখেছেন আমি তাদের দোষ দেই না। যেসব গল্পগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে, যে কারও মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, আহমদ ছফার মতো একজন মানুষ নানাধরনের দায়িত্বহীন কথাবার্তা কিভাবে বলেন!
এখন আসল কথায় এসে আমি একে একে বিষয়গুলো খোলাসা করার চেষ্টা করছি।
১. প্রথম বিষয়টা হলো বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আহমদ ছফার ফোনে কথা হয়েছিল। খালেদা জিয়া সৌজন্যের খাতিরে আহমদ ছফাকে দাওয়াত করেছিলেন। আহমদ ছফা বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁকে রান্না করে খাইয়েছিলেন, আপনাকেও রান্না করে খাওয়াতে হবে। এ বিষয়টি আমি আমার ‘ছফামৃত’ বইয়ে লিখেছিলাম। এখন প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনা কি আদৌ আহমদ ছফাকে রান্না করে খাইয়েছিলেন?
আহমদ ছফা শেখ হাসিনার এমন কে যে তাঁকে রান্না করে খাওয়াতে হবে! আর খালেদা জিয়া কি সত্যি সত্যি আহমদ ছফাকে রান্না করে খাওয়ানোর মতো অবস্থা রাখেন? পুরো ব্যাপারটি ছিল একটা ফান। আহমদ ছফা কথায় কথায় ফান করতেন। খালেদা জিয়া আহমদ ছফার জন্য রান্না করবেন এটা অসম্ভব ব্যাপার। আহমদ ছফার পক্ষে ওখানে যাওয়া হয়ত সম্ভব নয়, তা এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে তিনি এ অসম্ভব আবদারটি করেছিলেন। পাঠকেরা যদি এতটুকু বোঝার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে তো মুশকিল।
২. হুমায়ূন আহমেদ, আনিস সাবেত, আহমদ ছফা কাছের বন্ধু ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর লেখায় লিখেছেন, তাঁরা তিনজনে শপথ করেছিলেন কোনদিন বিয়ে করবেন না। তিনি শপথ ভেঙে বিয়ে করেছেন, আনিস সাবেত মারা গেছেন এবং আহমদ ছফা কথা রেখে বিয়ে করেন নি।
আহমদ ছফা ব্যাপারটি শোনার পর ক্ষেপে গিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে তিনি বলেছেন, এ ব্যাপারে হুমায়ূনের সঙ্গে আমি কোনও কথা বলি নি। আমি তো যেকোন সময়ে বিয়ে করতে পারি। সে লেখক, গল্প বানাবার অধিকার তার আছে। আমি এও জানি সে আমাকে নিয়ে অনেক গল্প লিখে ফেলেছে। আমি মারা গেলে সেগুলো ছাপবে।
এ নিয়ে তিনি আরও অনেক কথা বলেছেন সাক্ষাৎকারে। তাহলে এত রঙ দিয়ে কথাগুলো কিভাবে প্রকাশ পেল।
৩. শেখ মুজিবুর রহমান লাল টেলিফোনে ফোন করে আহমদ ছফাকে শিক্ষা উপদেষ্টা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু আহমদ ছফা তাঁকে কোনও পাত্তাই দেন নি। তখন শেখ মুজিব খেপে গিয়ে সেই দায়িত্ব দিলেন সাহিত্যিক আবুল ফজলকে।
শেখ মুজিব যখন ক্ষমতায় আহমদ ছফার বয়স কতো, বড়জোর ত্রিশ বছর? আহমদ ছফার মেধা ছিল, প্রতিভা ছিল ঠিক আছে, কিন্তু শেখ মুজিবকে কেন আহমদ ছফাকে শিক্ষা উপদেষ্টা বানাতে হবে? আওয়ামী লীগে কি আর কোনও যোগ্য লোক ছিল না? তাও আবার নিজে ফোন করেছেন আহমদ ছফাকে। মজার বিষয় হলো আহমদ ছফা ওই সময় কোনও ফোনই ব্যবহার করতেন না।
আহমদ ছফার ওপর খেপে গিয়ে শোধ নেয়ার জন্য শেখ মুজিব আবুল ফজলকে শিক্ষা উপদেষ্টা বানালেন। আসলে কি বঙ্গবন্ধু আবুল ফজলকে শিক্ষা উপদেষ্টা করেছিলেন? আবুল ফজলকে শিক্ষা উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান নয়।
৪. আহমদ ছফা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বলতেন না। বিষয়টি ঠিক। তিনি মনে করতেন বঙ্গবন্ধু বললে তাঁকে ছোট করা হয়। তিনি মনে করতেন, এ শব্দটি চিত্তরঞ্জন দাসকে দেয়া উপাধি ‘দেশবন্ধু’র মতো ধার করা একটি শব্দ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে তিনি বঙ্গপল্টু বলেছেন এটাকে কি আমাদের সত্য বলে ধরে নিতে হবে! আহমদ ছফা ছিলেন অসম্ভব রকম বিনয়ী একজন মানুষ।
আহমদ ছফা শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা সম্বোধন করতেন না, লিখতেন বাংলাদেশের স্থপতি। এটারও ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন। শেখ মুজিবকে নিয়ে সবচে’ মূল্যায়নধর্মী ভালো লেখা তিনিই লিখেছেন। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘গত তিন হাজার বছরে বাংলার ইতিহাসে শেখ মুজিবের মতো মানুষ একজনও জন্মায়নি।’
৫. ডেইলি স্টারের একটি ভিডিওতে উল্লেখ করেছে, আহমদ ছফা বাস কন্ডাক্টরের কাজ দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। এটা মোটেই সত্য নয়। আমি জানি না, তারা এসব তথ্য কোথায় পান।
৬. আহমদ ছফাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যান, এটাও সত্য নয়। আহমদ ছফা মারা গিয়েছিলেন বাংলামোটরের বাড়িতে আমার হাতে মাথা রেখে। তারপরেও আমরা ক’জনে মিলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম যদি বেঁচে থাকেন সেই ভরসায়।
এরকম আরও অনেক গল্প আহমদ ছফাকে নিয়ে পাওয়া যাবে। কারা এ গল্পগুলোর জন্ম দিচ্ছে? বাংলাদেশে মোহাম্মদ আমীন নামের একজন খ্যাতিমান লেখক রয়েছেন, যিনি কাটিং-পেস্টিং লেখক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি ছিলেন সরকারি আমলা, উপসচিব। দুর্নীতির দায়ে জেলফেরত। বর্তমানে চাকরিচ্যুত হয়ে জবরদস্ত লেখক। আহমদ ছফার বাসায় তার যাতায়াত ছিল, কিন্তু তার নানা অপকর্মের কারণে আহমদ ছফা তাকে পছন্দ করতেন না। বাসা থেকে একবার তাকে বেরও করে দিয়েছিলেন।

আহমদ ছফা মারা যাবার পরের বছর তিনি ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ নামে একটি বই লিখে ফেলেন। পুরো বইটি বিতর্কিত গল্পে ঠাসা। লিখেছেন উত্তমপুরুষে। তিনি উল্লেখ করেছেন, আহমদ ছফা বইয়ের সব কথা তাকে বলেছেন। বইটি পড়লে মনে হবে আহমদ ছফা একজন বাচাল এবং গিবতকারী। ক্ষেত্র বিশেষে মনে হবে তিনি একটা অমানুষ।
এখন কথা হলো, আহমদ ছফা তাকে এসব কথা না বলে থাকলে মোহাম্মদ আমীন এসব গল্প কোথা থেকে বানালেন?
আহমদ ছফা মারা যাবার পর পত্রপত্রিকায় এত লেখা প্রকাশিত হয়, মোহাম্মদ আমীন তখন জসীম নামের একটি ছেলেকে দিয়ে সব লেখা সংগ্রহ করেছিলেন। সেইসব লেখা থেকে নানা গল্প সংগ্রহ করে তাতে রঙ লাগিয়ে তিনি নিজের নামে চালিয়ে দেন। ওই বইতে তিনি উল্লেখ করেছেন, আহমদ ছফা তাকে সব কথা বলেছেন। কিন্তু লোকটির বোধশক্তি এত নিচু, মিথ্যাকে সত্য বানাত গিয়ে আরও হাজার মিথ্যার জন্ম দিয়েছেন।
এখন আপনারা বলতে পারেন বইটি নিয়ে আপনি এতদিন প্রতিবাদ করেন নি কেন? প্রথমে আমি বইটি নিয়ে কোনও রকম ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাই নি। পায়খানা নাড়াচাড়া করলে গন্ধ বেশী ছড়ায়। আমি পায়খানাকে পায়খানার জায়গায় রাখতে চেয়েছিলাম। বছর দুয়েক আগে আমার অফিসের সামনে ড. সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন তাঁর সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়েছিল। ওই সময় তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, আহমদ ছফার জন্মদিনকে সামনে রেখে তাঁর ‘অর্থ’ পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশ করবেন। তিনি আমাকে একটি লেখা দিতে বললেন। আমার যত বড় লেখাই হোক তিনি ছাপবেন। আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম। আমি একটা লেখা লিখেছিলাম, যার দৈর্ঘ্য কুড়ি পৃষ্ঠার অধিক, ইচ্ছে করলে ছোট একটা বই করা যায়। এই লেখাটি লিখেছিলাম মোহাম্মদ আমীনের সেই বইটির সমালোচনা করে। আমি পুরো বইটির একটি জবাব দাঁড় করিয়েছিলাম এবং লেখাটি ড. খানকে পাঠিয়েছিলাম। অনেকদিন পর খান সাহেব প্রীত হয়ে জানালেন, এ লেখা ছাপা যাবে না, তিনি আমীনকে গুরুত্ব দিতে চান না।
আমিও অনেক বছর তাকে গুরুত্ব দেই নি। খান সাহেবও যখন গুরুত্ব দিতে চান না আমার আর কি করার থাকে। কিন্তু তিনি হয়ত জানতেন না, বড় ইঁদুর যেমন গোলার ধান খেয়ে ফেলে, ছোট ইঁদুরও কিন্তু কম যায় না।
এই লেখার ২,৩ এবং ৪ নম্বর গল্পত্রয় মোহাম্মদ আমীনের সেই বইয়েরই অংশ বিশেষ। পাঠকের বারবার তাগাদা থেকে আমাকে এ লেখাটি লিখতে হলো।❐
লেখক: লেখক, গবেষক, আহমদ ছফার ভাইপো ও জীবনী গ্রন্থকার



